২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গুলশানে গুলিতে ইতালীয় নিহত ॥ আইএসের দায় স্বীকার

গুলশানে গুলিতে ইতালীয় নিহত ॥ আইএসের দায় স্বীকার

স্টাফ রিপোর্টার ॥ রাজধানীর গুলশানে কূটনীতিক পাড়ায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে তাভেলা সিজার (৫০) নামে এক ইতালীয় নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। হত্যাকা-টি পরিকল্পিত বলে দাবি করেছেন ভারপ্রাপ্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোখলেছুর রহমান। এদিকে জঙ্গী হুমকি পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ‘সাইট ইন্টিলিজেন্স গ্রুপ প্রচারিত এক খবরে বলা হয়েছে সিরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গী সংগঠন আইএস (ইসলামিক স্টেট) হত্যার দায় স্বীকার করেছে।

নিহত তাভেলা ঢাকায় নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আইসিসিও কো-অপারেশন নামে একটি সংস্থার প্রুফ (প্রফিটেবল অপরচ্যুনিটিজ ফর ফুড সিকিউরিটি) কর্মসূচীর প্রকল্প ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশস্থ আমেরিকান স্কুলের সদস্য ছিলেন।

সৌদি কূটনৈতিক মোহাম্মদ খালাফের পর আবার বিদেশী খুনের ঘটনায় বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সরকার বিদেশীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। হত্যাকারীদের গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান চলছে। ঢাকায় অবস্থিত যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে সেদেশটির সরকার। এদিকে বাংলাদেশে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদেরও সতর্ক থাকার অনুরূপ বার্তা দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন ওয়েবসাইট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এদিকে ঢাকার ইতালীয় নাগরিককে খুনের দায় ইসলামিক স্টেট (আইএস) স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে জঙ্গী হুমকি পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ‘সাইট ইন্টিলিজেন্স গ্রুপ। হত্যাকা-ের কয়েক ঘণ্টা পরই এমন দায় স্বীকার করে বিবৃতি আসে। এদিকে বাংলাদেশে ভ্রমণের বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ার ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন এ্যাফেয়ার্স এ্যান্ড ট্রেডের (ডিএফএটি) সতর্কতা জারির পর যুক্তরাজ্য তাদের নাগরিকদের চলাফেরা সীমিত করে আনার পরামর্শ দিয়েছে। দেশটি বলছে, তাদের কাছে তথ্য রয়েছে বাংলাদেশে জঙ্গীরা পশ্চিমা স্বার্থের ওপর আঘাত হানতে পারে। সোমবার হালনাগাদ করা সতর্ক বার্তায় নিজের দেশের নাগরিকদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া সীমিত করে আনারও পরামর্শ দেয়া হয়। জঙ্গীদের কাছ থেকে হুমকি রয়েছে। সেপ্টেম্বরের শেষদিকে বাংলাদেশে পশ্চিমা স্বার্থের ওপর জঙ্গীদের আঘাত হানার পরিকল্পনার নির্ভরযোগ্য তথ্য রয়েছে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার পক্ষ থেকে বাংলাদেশে তাদের সফর পেছানোর ঘোষণার একদিন পর যুক্তরাজ্য নিজের দেশের নাগরিকদের জন্য এই হালনাগাদ সতর্কবার্তা প্রকাশ করল।

সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে গুলশান-২ নম্বরের ৯০ নম্বর সড়কে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমানের সরকারী বাসভবনের প্রাচীর দেয়ালের দক্ষিণ পাশে হত্যাকা-ের ঘটনাটি ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শী সেনা কল্যাণ সংস্থার সাবেক কর্মচারী জয়নাল খান (৫০) বলেন, গত ১০ বছর ধরে তিনি গবর্নরের বাড়ির পাশে রিক্সা-ভ্যান মেরামতের কাজ করছেন। ঘটনার কয়েক মিনিট আগে একটি মোটরসাইকেলযোগে ৩ যুবক তার দোকানের কাছে অবস্থিত জার্মান ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের গাড়ি পার্কিংয়ের সামনের একটি গাছের ছায়ার আবছা অন্ধকারে এসে দাঁড়ায়। মোটরসাইকেলটি ৮৩ নম্বর সড়কের দিকে মুখ করে রাখা হয়। সেখানে একজন বসে থাকে। দুইজন নেমে যায়। এর কয়েক মিনিট পরই গুলির শব্দ শোনা যায়। দুই যুবক দৌড়ে মোটরসাইকেলে চড়ে। এরপর মোটরসাইকেলটি সোজা ৮৩ নম্বর সড়ক দিয়ে দ্রুত চলে যায়।

গবর্নর ভবনের মূল ফটকে দায়িত্বরত আনসার সদস্য সুধানন্দ বলেন, যথারীতি দায়িত্ব পালন করছিলাম। এ সময় পর পর ৩টি শব্দ হয়। রাস্তায় প্রচুর গাড়ি চলে। গাড়ির শব্দে প্রথম দুটি অন্যরকম শব্দ মনে হল। কিন্তু তৃতীয়টি গুলির শব্দ তা স্পষ্টই বোঝা গেল। আবছা অন্ধকারে একটি লোক দৌড়ে এসে গবর্নর হাউজের দক্ষিণ কোনায় গাছের নিচে চিৎকার দিয়ে পড়ে গেল। আমিও গেলাম। সেখানে স্থানীয় লোকজন জমা হয়। পরে সবাই মিলে বিদেশীকে ধরে একটি সিএনজিতে তুলে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। তিনি স্থানীয়দের বরাত দিয়ে আরও জানান, গবর্নর হাউজের দক্ষিণ দেয়ালের মাঝামাঝি গাছের নিচে অন্ধকারে গুলি করা হয়। বিদেশী প্রাণ বাঁচাতে মূল সড়কের দিকে দৌড়ে এসে পড়ে যান।

গবর্নর ভবনের চারদিকে অরনেট নামের একটি সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠানের ১৫ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও সশস্ত্র আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করে। ৮ ফুট দেয়ালের ওপর ২ ফুট কাঁটাতারের বেড়ার চারদিকে কোথাও কোন সিসি ক্যামেরা নেই। এমনিক প্রাচীর দেয়ালে থাকা সার্চ লাইটগুলোও অকেজো। এছাড়া চারজন আনসার সদস্য সশস্ত্র পাহারায় থাকেন।

প্রত্যক্ষদর্শী পঙ্গু ভিক্ষুক সেতারা বেগম জানান, টিশার্ট ও থ্রিকোয়ার্টার প্যান্ট পরা ওই বিদেশী ৯০ নম্বর সড়ক দিয়ে যাচ্ছিলেন। দুই ব্যক্তি ওই বিদেশীকে গুলি করে। পরপর তিনটি গুলির শব্দ আমি শুনেছি। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। রাস্তার বাতি না থাকায় স্থানটি অন্ধকার ছিল।

গুলশান ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করার পর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় তার মৃত্যু হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, নিহতের বাম পাজরে ২টি ও কনুইয়ে একটি গুলি বিদ্ধ হয়। নিহত বিদেশী একাই গুলশান ১ নম্বরের ৩০ নম্বর সড়কের ১৬ নম্বর বাড়িতে বসবাস করতেন। তার অফিসটি গুলশানের ৫৪ নম্বর সড়কের ১১/বি নম্বর বাড়ির ৫/২ নম্বর ফ্ল্যাটে অবস্থিত। প্রতিষ্ঠানটি পানি, খাদ্য, স্যানিটেশন, নিউট্রিশন, রিভিউজি ও তাদের পুনর্বাসসহ নানা সমাজসেবামূলক কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপক আলো রানী ঢালী হাসপাতালে সাংবাদিকদের বলেন, তিনি বাংলাদেশে কাজ করছিলেন। বাংলাদেশের কারও সঙ্গে বা অফিসে কোন প্রজেক্টের লেনদেন সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে কোন ঝামেলা নেই। তাকে হত্যার বিষয়টি সত্যিই হতবাক করার মতো ব্যাপার।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন ভারপ্রাপ্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোখলেসুর রহমান ও ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার পদস্থ কর্মকর্তারা। সিআইডির ক্রাইস সিন ইউনিট ও ডিবি ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে। অন্তত ২শ’ ফুট জায়গা ঘেরাও করে দেয়া হয়েছে। হত্যাকারীদের গ্রেফতারে গুলশানসহ আশপাশের এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহন ও সন্দেহভাজনদের তল্লাশি চলছে। র‌্যাব, ডিবিসহ পুলিশের বিভিন্ন সংস্থা অভিযান শুরু করেছে। নিহতের কাছে থাকা কিছুই খোয়া যায়নি। সঙ্গে থাকা মালামাল আলামত হিসেবে জব্দ করেছে পুলিশ। রাত ১২টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মরদেহ হাসপাতালেই ছিল। এদিকে বিদেশী খুনের পর হাসপাতালে ছুটে যান বাংলাদেশস্থ বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের কর্মকর্তারা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের কর্মকর্তারাও সেখানে যান। তবে কেউই কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। পরে সাংবাদিকদের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক হাসপাতালের সাংবাদিকদের বলেন, হত্যাকা-টি পরিকল্পিত। তবে কি কারণে হত্যাকা-টি পরিকল্পিত সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট করে কোন তথ্য দেননি।