২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বেগম জিয়া সহসা দেশে ফিরবেন কি?

  • আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

ছোটবেলায় এক কালের বিখ্যাত ছড়া লেখক সুনির্মল বসুর একটি ছড়া পড়েছিলাম। সেকালের গ্রামের জমিদার বাড়ির সামিয়ানা নিয়ে ছড়াটি লেখা। হঠাৎ একদিন গ্রামের লোক দেখল জমিদার বাড়ির প্রাঙ্গণে বিশাল সামিয়ানা টানানো হয়েছে। খবরটা সহসা চতুর্দিকে ছড়িয়ে গেল। দলে দলে লোক এসে জড়ো হতে লাগল জমিদার বাড়ির প্রাঙ্গণে। এখন পূজা পার্বণের মরশুম নয়। তাহলে হঠাৎ জমিদার বাড়িতে সামিয়ানা খাটানো হলো কেন? সাধারণত পূজা পার্বণ বা কোন উৎসব উপলক্ষেই এই সামিয়ানা খাটানো হয়।

চারদিকে গুজব ছড়িয়ে পড়ল। কেউ বলল, জমিদার বাবুর ছোট মেয়ের বিয়ে। তাই উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। প্রচুর খানাপিনা হবে। গ্রামবাসীকে ভূরিভোজন করানো হবে। আবার কেউ কেউ বললেন, আরে না, না, বিয়ে টিয়ে নয়। জমিদার-গিন্নি কি একটা ব্রত পালন শেষ করেছেন। সেই উপলক্ষে উৎসব হবে। চল্লিশটা পাঁঠা বলি দিয়ে গ্রামবাসীকে খাওয়ানো হবে। মিষ্টান্নের অর্ডার দেয়া হয়েছে কয়েক মণ। কলকাতা থেকে নর্তকী ও বাইজিরা আসবে। ওই সামিয়ানার নিচে আসর বসবে। সারারাত নাচগান হবে।

চারদিকে এই গুজব ডালাপালা ছড়াচ্ছে আর জমিদার বাড়িতে জনতার ভিড় বাড়ছে। সকলের চোখে মুখেই নানা ধরনের প্রশ্ন ও প্রত্যাশা। এ সময় জমিদার বাড়ির প্রধান গোমস্তা নায়েব মশাই বাইরে বেরিয়ে এলেন। সকলেই তাকে ছেঁকে ধরলেন, নায়েব মশাই, কী হচ্ছে জমিদার বাড়িতে? বড় কোন উৎসব? নায়েব মশাই এক গাল হেসে বললেন, আরে উৎসব টুতসব কেন হবে? সামিয়ানাটায় উই-পোকা ধরেছে। তাই উই দূর করার জন্য ওটা বাইরে রোদে মেলে দেয়া হয়েছে। বলেই আরেক গাল হেসে তিনি কাচারিঘরে ঢুকে গেলেন। জনতা হতভম্ব এবং ছত্রভঙ্গ।

বর্তমানে লন্ডন সফররত বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে নিয়ে ঢাকায় এবং লন্ডনেও গুজবের ছড়াছড়ি। কেউ বলছেন, তিনি চোখ আর পায়ের চিকিৎসার জন্য লন্ডনে এসেছেন। কেউ বলছেন তিনি দীর্ঘকাল পর ছেলে তারেক রহমান এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে পারিবারিক মিলন এবং ঈদ কাটানোর জন্য লন্ডনে এসেছেন। কেউ বলছেন, না, না, এটা রাজনৈতিক সফর। দু’দুটো আন্দোলনের ব্যর্থতার পর বিএনপির এখন যা দুরবস্থা, সে অবস্থা সামাল দেয়ার উদ্দেশ্যে পুত্র তারেক রহমান এবং দলের আরও কিছু সিনিয়র সদস্যের (যারা বিদেশে আছেন) সঙ্গে শলাপরামর্শ করার জন্য তিনি লন্ডনে এসেছেন। কেউ কেউ আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপি নেত্রীর গোপন আলোচনারও গুজব ছড়াচ্ছেন। বলছেন, লন্ডনে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে তার বৈঠক হয়েছে। যদিও উভয় দলের নেতারাই তা অস্বীকার করেছেন।

এসব গুজবের ডালপালা ছাঁটকাট করলে হয়তো একটা সত্যই জমিদার বাড়ির সামিয়ানা রোদে মেলে দেয়ার মতো বেরিয়ে আসবে যে, বেগম জিয়া বিএনপিকে ভরাডুবি থেকে বাঁচানোর জন্য পুত্র তারেক রহমানের সঙ্গে শলাপরামর্শের জন্যই লন্ডনে এসেছেন। সেই সঙ্গে চোখের চিকিৎসা ও পারিবারিক মিলনটাও হয়ে যাবে। বিএনপি নেত্রীর লন্ডন সফরের এই বাস্তবতাকে সামনে রাখলে বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয় যে, তার এই বিলম্বিত বিদেশ সফর একেবারেই অরাজনৈতিক নয়। এর আগে তার সৌদি আরবে যাওয়ার কথা উঠেছিল। তিনি যাননি। তার লন্ডনে আসার দিন- তারিখও নির্ধারিত হয়েছিল। তিনি আসেননি। তারপর অনেকটা হঠাৎই তিনি এসেছেন। এবং নানা গুজবের জন্ম দিয়েছেন।

এই ব্যাপারে একটা বিষয় লক্ষ্য করার রয়েছে। জিয়া অরফানেজ সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় বেগম জিয়া অভিযুক্ত এবং এই মামলার রায় হওয়ার দিন ঘনিয়ে আসছে। এই রায় কী হবে তা কেউ জানে না। কিন্তু বিএনপি মহলে শঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে, এই মামলাসহ অন্যান্য মামলায় বেগম জিয়ার কারাদ- হতে পারে। যদি হয় তাহলে তার অনুপস্থিতিতে দলের হাল কে ধরবেন, সে প্রশ্নও এত দিন পর দলের মধ্যেই উঠেছে। বিএনপির প্রবীণ শুভাকাক্সক্ষী ডা. জাফরুল্লাহ ইতিমধ্যেই বেগম জিয়া কারাগারে গেলে দল কে চালাবেন, তা নির্ধারণের জন্য দলকে প্রকাশ্যে উপদেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে বলেছেন, তারেক রহমান লন্ডনে বসে দল পরিচালনা করুন তাও তিনি চান না। তিনি হয়তো বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর মনের কথাই এভাবে ব্যক্ত করেছেন। বেগম জিয়া ও তারেক রহমান এই বাস্তব পরিস্থিতির কথা ভেবে দেখছেন না তা হতে পারে না। নিজেদের এবং দলের ভবিষ্যত সম্পর্কে একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ তাই তাদের জন্য জরুরী। সুতরাং লন্ডনের এই বিলম্বিত মিলনমেলায় মাতা-পুত্রের মধ্যে তা নিয়ে আলোচনা হওয়াও স্বাভাবিক। লন্ডনে দলের এক শ্রেণীর নেতার সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেছেন, “এখন কোন আন্দোলন নয়, দল গোছানোর পরই আন্দোলনে যাবে বিএনপি।” তার এই উক্তি থেকে মনে হয় দেশে অবিলম্বে কোন আন্দোলন (সন্ত্রাস) শুরু করার পরিকল্পনা নিয়ে পুত্রের সঙ্গে আলোচনার জন্য তিনি লন্ডনে আসেননি। এসেছেন দলের বেহাল অবস্থা সামাল দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে তারেকের সঙ্গে আলোচনার জন্য।

প্রশ্ন, চরিত্র ও নীতির দিক থেকে সম্পূর্ণ বিতর্কিত তারেক রহমানকে দলের নেতৃত্বে রেখে বা বসিয়ে বেগম জিয়া দল গোছাতে পারবেন কিনা? সাবেক প্রবীণ নেতাদের দলে ফিরিয়ে এনে তিনি যদি আবার ব্রডবেইজড বিএনপি গড়ে তুলতে চান, তারেক রহমানের অতীত ও বর্তমান ভূমিকার জন্য তা সম্ভব হবে কিনা? দলের অনেক শুভাকাক্সক্ষীই আশঙ্কা করছেন, বেগম জিয়ার অনুপস্থিতিতে (দুর্নীতির মামলায় তার জেল হলে) দলের ভেতরে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই বিদ্রোহ হবে এবং দল বিভক্ত হয়ে যাবে। জেনারেল এরশাদের মতো অনুপস্থিত অবস্থাতেও তিনি দল চালাতে পারেন, যদি এরশাদের মতোই দলের কোন সিনিয়র নেতাকে দল পরিচালনার জন্য মনোনয়ন দেন। তারেক রহমানকে দলের মাথায় চাপাতে গেলেই বিপত্তি ঘটবে।

এজন্যেই দল গোছাবার আগে বেগম জিয়া হয়তো দলের নেতৃত্বে দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত থাকতে চাইবেন না। দুর্নীতির মামলায় তার জেল গমন যদি আসন্ন ও অনিবার্য হয়, তাহলে তিনি তা এই মুহূর্তে এড়াতে চাইবেন। সম্ভবত ভেবেচিন্তেই এবং আদালতে তার বিরুদ্ধে আনীত মামলার গতিপ্রকৃতি অনুধাবন করেই তিনি একটু বিলম্বে বিদেশে এসেছেন এবং প্রয়োজন হলে বিদেশে তার অবস্থান দীর্ঘায়িত করবেন। বলা হবে, তিনি ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ সফরে যাবেন এবং বিদেশের নেতাদের কাছে বিএনপি’র গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করবেন। এজন্য তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন একটু বিলম্বিত হবে।

এসবই গুজব এবং বাজারের জল্পনা-কল্পনা। কোনটি সঠিক এবং কোনটি সঠিক নয়, তা এ মুহূর্তে নির্ণয় করা কঠিন। তবে লন্ডনের বিএনপি’র একটি মহলের ধারণা, বেগম জিয়া সহসা দেশে ফিরছেন না। যদি তিনি দেখেন তার বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতির মামলার রায়গুলো সহসাই হয়ে যাচ্ছে এবং সেই রায় তার অনুকূলে হবে না, তাহলে তিনি বিদেশে অবস্থান দীর্ঘায়িত করতে পারেন। শুধু বিদেশে নিজের পক্ষে জনমত গঠন নয়, বিদেশী নেতৃবৃন্দের দ্বারা হাসিনা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এক ধরনের একটা বোঝাপড়ার চেষ্টাও করতে পারেন। সেজন্যই সম্ভবত আগেভাগেই সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে তার বৈঠকের গুজব প্রচার করা হচ্ছে।

বেগম জিয়া এবং বিএনপির জন্য এটা একটা ক্রুসিয়াল সময়। তার এবারের ল-ন সফর রাজনৈতিক অথবা ব্যক্তিগত যা-ই হোক, এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লন্ডনে বসে পুত্র তারেক রহমানের সঙ্গে শলাপরামর্শ করে তিনি দল গোছানোর জন্য যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তার ওপর বিএনপির ভবিষ্যত নির্ভর করে। তিনি যদি রাজনীতিতে অন্ধ পুত্র স্নেহের মোহ থেকে মুক্ত হতে পারেন, জামায়াতের অপ্রকাশ্য সংশ্রবও ত্যাগ করতে পারেন, দলে সাবেক নেতাদের ফিরিয়ে এনে এবং মডারেটদের কাছে টেনে নিয়ে দলটির গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি খাড়া করতে পারেন, তাহলে বিএনপি অবশ্যই আবার ঘুরে দাঁড়াবে।

কারণ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি’র স্থানটি ডান অথবা বাম অন্য কোন দল এখন পর্যন্ত দখল করতে পারেনি। অদূর ভবিষ্যতে কেউ তা পারবে, তা মনে হয় না। দল পুনর্গঠনের পথে এগোলে বেগম জিয়া কিছুকাল দলের নেতৃত্বে অনুপস্থিত থাকলেও কোন ক্ষতি হবে না। কেবল তারেক রহমানের উপদ্রব থেকে দলটিকে মুক্ত রাখার ব্যবস্থা করে গেলে বিএনপি বাঁচবে। ভারতে ইন্দিরা গান্ধী একবার নির্বাচনে জনতা দলের হাতে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিলেন। নির্বাচনের আগে সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ ইন্দিরা গান্ধীকে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘আপনি দলের ভেতরে ছেলে সঞ্জয় গান্ধীর উপদ্রব দূর করুন, তাহলে কংগ্রেস বাঁচবে।’ বাংলাদেশে বেগম জিয়াকেও আমার মতো ক্ষুদ্র ব্যক্তির একটি সৎ পরামর্শÑ ‘তারেকের উপদ্রব থেকে দলকে বাঁচান। বিএনপি বাঁচবে।’

লন্ডনে বেগম জিয়া পুত্র তারেক রহমানের বাসায় অবস্থান করছেন। এখানেই ভয়, অন্ধ পুত্র স্নেহে প্রভাবিত হয়ে তিনি দল পুনর্গঠনে কোন সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন কিনা! যদি এই সঠিক সিদ্ধান্ত না নিয়ে তিনি বিদেশনির্ভর নতুন চক্রান্তের রাজনীতিতে জড়িত হন, তাহলে তা দেশ এবং তার দলের জন্যও শুভ হবে না। বিএনপি নেত্রী কোন্ পথে এগোবেন তা জানার জন্য আমাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। যদি তিনি নির্ধারিত সময়েই দেশে ফিরে যান তাহলে বুঝতে হবে, মামলার রায় এড়ানোর জন্য তার বিদেশ বাস দীর্ঘ করার গুজবটি অসত্য। আর যদি তিনি কোন না কোন অজুহাতে সহসা দেশে না ফেরেন, তাহলে বুঝতে হবে, গুজবটাই সত্য। তিনি দ্রুত দেশে ফিরে কোন অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে চান না। যদি তা হয়, তাহলেও দলের ভেতরে তার এবং তারেক রহমানের নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে পারে। দল ভাগ হয়ে যেতে পারে।

আমার প্রত্যাশা, বেগম জিয়া নির্ধারিত সময়েই স্বদেশে ফিরে যাবেন এবং দলকে পুনর্গঠনের সঠিক পন্থা গ্রহণ করবেন। তাহলে দেশ বাঁচবে এবং তার দলও বাঁচবে।

লন্ডন ২৯ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার ২০১৫