২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইউরোপের সমকালীন শরণার্থী সমস্যা

  • ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর

১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক পৃথিবীব্যাপী বলবৎ করণীয় যে মানব অধিকার ঘোষণা করা হয়েছিল, সেখানে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, শাসিতের সম্মতি ছাড়া কোন দেশেই শাসন প্রতিষ্ঠিত বা পরিচালিত করা যাবে না। গতকালের পর আজ পড়ুন শেষাংশ...

পূর্ব ইউরোপীয় দেশসমূহ অভিবাসন বান্ধব বলে নিজেদের প্রতিভাত করতে পারেনি। সুইডেনের রাষ্ট্রপতি তার নিজের সরকারী বাসস্থান প্রশংসনীয়ভাবে শরণার্থীদের আশ্রয়ের জন্য খুলে দিয়েছেন। তার বিপরীতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কেন্দ্রস্থল বেলজিয়ামের তরফ থেকে তেমন কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। স্পেন, পর্তুগাল ও সুইজারল্যান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে তেমন কোন সাড়া দেয়নি। পোপ ফ্রান্সিস সকল ইউরোপীয় দেশকে শরণার্থীদের জন্য সীমান্ত খুলে রেখে যথা প্রয়োজন সহায়তা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এই আহ্বানে খুব একটা সাড়া পাওয়া গেছে বলা চলে না। যুক্তরাজ্য এ সময়কার মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত ১৫০০০ শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়ার ঘোষণা করে প্রয়োজনের নিরীখে তাদের ক্ষুদ্র চেষ্টাই প্রতিভাত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণা যে, সে দেশ মাত্র ১০০০০ এরূপ শরণার্থীকে আশ্রয় দেবে তা সেদেশে লালিত ও প্রচারিত মানবতাবোধকে পূর্ণাঙ্গ মাত্রায় প্রতিফলিত করেনি। গণবিপ্লবের সূতিকাগার ফ্রান্স তেমন কোন সাড়া দেয়নি বলেই দেখা গেছে। তবে আশার কথা, প্রায় সকল ইউরোপীয় দেশেই তাৎপর্যমূলক সংখ্যা শরণার্থীদের আশ্রয় বা অধিকরণ সহায়তা দেয়ার দাবিতে গণমোর্চা বা মার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সমকালীন শরণার্থীদের সমস্যা সমাধানে মোটা দাগে ৪টি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে প্রতিভাত হচ্ছে। প্রথমত, যেসব দেশ থেকে শরণার্থীরা অত্যাচার, বৈষম্য, গৃহযুদ্ধ এড়াতে বেড়িয়ে যাচ্ছেন, সেসব দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক পৃথিবীব্যাপী বলবৎ করণীয় যে মানব অধিকার ঘোষণা করা হয়েছিল, সেখানে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, শাসিতের সম্মতি ছাড়া কোন দেশেই শাসন প্রতিষ্ঠিত বা পরিচালিত করা যাবে না। এই ঘোষণায় আরও বলা হয়েছিল, গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার, আইনের শাসন এবং সামাজিক সমতা ও নিরাপত্তা সকল মানুষের জন্য সকল রাষ্ট্র কর্তৃক নিশ্চিত করণীয়। এই প্রেক্ষিতে ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, সুদান, ইরিত্রীয়া, কেনিয়া, সোমালিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং জাতিসংঘের দাবি ও তত্ত্বাবধান অনুযায়ী যদি গৃহযুদ্ধ রহিত, সন্ত্রাস দমিত এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে সংশ্লিষ্ট সকল মানুষের উন্নয়ন ও কল্যাণে রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক প্রচেষ্টা নিয়োজিত হবে এবং ফলত এসব দেশের জনগণের দেশত্যাগের প্রয়োজন ও প্রবণতা কমে আসবে। সমকালে যে শরণার্থী সমস্যা ইউরোপে দৃষ্ট হচ্ছে, তার স্থায়ী সমাধান পেতে হলে এদিকে বিশ্ববাসীর সুতীক্ষè ও কার্যকর দৃষ্টি দিতে হবে। সকলের জন্য স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হলে এবং এর প্রতিকূলে ভূমিকারত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে জাতি হত্যা বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত করে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারে সোপর্দ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পৃথিবীব্যাপী সকল দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও ফলপ্রসূ মাত্রায় ব্রতী হতে হবে। সকল দেশ মোটামুটি একই স্তরের উন্নয়নের পর্যায়ে উন্নীত না হলে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশ থেকে বিত্তশালী দেশে যাওয়ার আকর্ষণ সবসময়ই থাকবে। সাম্প্রতিককালে লাতিন আমেরিকা ও মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার প্রবণতা এরই উদাহরণ। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর অপেক্ষাকৃত অনুন্নত দেশের উন্নয়নের জন্য জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংক এবং তারও পরে আঞ্চলিক উন্নয়ন ব্যাংক ও সংস্থাসমূহ এ লক্ষ্যে যে কাজ করছে বা সফলতা দেখিয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অকিঞ্চিতকর। উন্নত দেশসমূহ হতে অনুন্নত দেশসমূহের অনুকূল উন্নয়ন সহায়তা ১৯৭০ সালে গৃহীত জাতিসংঘের গৃহীত সূত্র অনুগামী (উন্নত দেশের জাতীয় আয়ের .০৭%) ২০০৩ সালে সর্বশেষ জোহানেসবার্গ ঘোষণ অনুযায়ী দ্রুত বাড়িয়ে এবং সকল উন্নয়ন ব্যাংকসমূহের ভূমিকা বিস্তৃত করে এ ক্ষেত্রে উন্নয়নকে বিস্তৃত ও সর্বজনীন করার পদক্ষেপ নেয়া জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ৩টি দেশ ব্যতীত উন্নত দেশসমূহ জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত ওই সূত্র অনুযায়ী এখনও অনুন্নত দেশসমূহের অনুকূলে তাদের আনুষ্ঠানিক সহায়তা বাড়ায়নি। ইউরোপের অন্যান্য দেশ ওই পরিমাণে সহায়তা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু এখনও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। তৃতীয়ত, আন্তঃদেশ শ্রমিক গতায়াতের পরিধি বিস্তৃত করতে হবে। যে অঞ্চলে বা যেখানে শ্রম অপ্রতুল, সেখানে শ্রমপ্রতুল এলাকা থেকে শ্রমিকের গতায়ন থাকলে অগম পথে শরণার্থী হওয়ার প্রবণতা তাৎপর্যমূলক সংখ্যায় কমে যাবে। ইউরোপে সম্প্রতি দৃষ্ট শরণার্থী সমস্যার প্রেক্ষিতে জার্মানির শিল্প উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপনার তরফ থেকে বিদেশী শ্রমিক আনয়ন তথা বিদেশীদের জার্মানিতে অভিবাসনকে স্বাগত জানানো এ ক্ষেত্রে দৃষ্ট ইতিবাচক পদক্ষেপ। তেমনি হাঙ্গেরি ও ক্রোয়েশিয়া থেকে সাধারণভাবে অভিবাসন বিরোধিতা কোন মানদ-েই ইতিবাচক বা সংবেদনশীল কার্যক্রম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। বলা প্রয়োজন যে, ইউরোপের যে সব দেশ অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে অনুন্নত বিশ্বে উপনিবেশ স্থাপন করেছিল, তারা সেসব দেশে তাদের শক্তি ও প্রযুক্তি নিয়ে নির্বিঘেœ প্রবেশ, বাস ও সমৃদ্ধি অর্জন করতে সমর্থ হয়েছিল। তারা যদি এ করে সফল হয়ে থাকেন, তাহলে আজকের এরা যারা বিত্তশালী মানব উপযোগী জীবনের অন্বেষণে আছেন, তারা কেন বিত্তশালী দেশে যেতে এবং থাকতে পারবেন না, তা যুক্তিতে টেকে না। শরণার্থী সমস্যা চিরতরে নির্মূল করতে হলে সমঅধিকার সম্পন্ন বিশ্বসমাজ গড়ে তোলার দিকে বিশ্বের চিন্তা নায়কদের আজ না হলে কাল নজর দিতেই হবে।

চতুর্থত, অভিবাসন সম্পর্কিত জাতিসংঘের সংস্থাসমূহকে, বিশেষত, অভিবাসনবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা (ওঙগ) জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারকে (টঘঐঈজ) অধিকতর শক্তিশালী এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থয়িত করতে হবে। অর্থায়নের লক্ষ্যে বিত্তশালী ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা থেকে সহায়তার পরিমাণ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের তেল-ধনী দেশসমূহকে তাদের ঈপ্সিত মানবাধিকারধর্মী ভূমিকা বাড়াতে আহ্বান জানাতে হবে।

লেখক : রাজনীতিবিদ ও সাবেকমন্ত্রী