১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বেদখলে বন বিভাগের বিপুল জমি ॥ কমছে বনভূমি

বেদখলে বন বিভাগের বিপুল জমি ॥ কমছে বনভূমি
  • শুধু সরকারী কিছু সংস্থার দখলেই ৩ লাখ হেক্টর জমি ;###;মাত্র ১০ শতাংশের বেশি প্রাকৃতিক বন নেই এখন

এমদাদুল হক তুহিন ॥ বনের ওপর মানুষের আগ্রাসন থেমে নেই। দেশের সর্বত্র চলছে বনভূমি লোপাট। বৃক্ষ নিধনসহ বনজ সম্পদ ধ্বংসের মহাযজ্ঞ থামছে না কিছুতেই। সুযোগ সন্ধানী ভূমি খেকোরাও বসে নেই, বনভূমির জমিতে গড়ে তুলছে ইমারত। শুধুমাত্র মানুষের কারণে নয়, প্রাকৃতিক কারণেও ধ্বংস হচ্ছে বন। শুধুমাত্র ভাঙ্গনের কারণেই প্রতিবছর ৬ বর্গকিলোমিটার করে ধ্বংস হচ্ছে সুন্দরবন। ’৭৩ সালের পর মাত্র ৩৭ বছরে সুন্দরবনের আয়তন হ্রাস পেয়েছে ১৪৪ বর্গকিলোমিটার। লবণাক্ততার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সুন্দরবনের অন্যতম বৃক্ষ সুন্দরী। এছাড়া নদীতে বাঁধ নির্মাণের কারণেও বনভূমিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জানা গেছে, সারাদেশের প্রতিটি বনের অভ্যন্তরে কমে যাচ্ছে গাছের সংখ্যা। গাছ কর্তন ছাড়াও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মৃত গাছের স্থানে নতুন গাছ জন্ম না নেয়ার হুমকির মুখে বনাঞ্চল। এমনকি জলবায়ুর পরিবর্তনসহ নানা কারণে বিলুপ্তির তালিকায় রয়েছে কয়েক প্রজাতির উদ্ভিদ। বন অধিদফতরের তথ্যমতে, দেশের মোট বনভূমির পরিমাণ অপরিবর্তনীয় দাবি করা হলেও পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা তা মানতে নারাজ। তাদের মতে, কোনক্রমেই দেশে ১৭ দশমিক ৬২ শতাংশ বনভূমি নেই। আবার কেউ কেউ বলছেন, বনভূমি কমলেও দেশে সবুজায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে। আচ্ছাদিত বনভূমির পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। সামাজিক বনায়নসহ বন ব্যবস্থায় সহ-ব্যবস্থাপনা প্রবর্তনের ফলে সারাদেশে মোট বৃক্ষের সংখ্যা বেড়েছে বলে মনে করেন একাধিক উদ্ভিদবিদ।

বন অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্যানুসারে, দেশে মোট বনভূমির পরিমাণ প্রায় ২৬ লাখ হেক্টর। যা দেশের মোট আয়তনের ১৭ দশমিক ৬২ শতাংশ। আর বন অধিদফতর নিয়ন্ত্রিত বনভূমির পরিমাণ ১৬ লাখ হেক্টর, যা দেশের মোট আয়তনের প্রায় ১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ। শীর্ষ এক কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, কেবল সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক বনভূমির ৩ লাখ হেক্টর জমি জবরদখল রয়েছে। তবে সব মিলিয়ে বনভূমির ঠিক কি পরিমাণ জমি দখল হয়ে গেছে সে হিসাব নেই অধিদফতরের হাতে। বন অধিদতরের শীর্ষ কর্মকর্তারা বনভূমি হ্রাসের কথাটি প্রকারান্তরে অস্বীকার করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবতায় ক্রমেই কমছে বনভূমি। কর্মকর্তাদের যোগসাজশ, লোকবল সঙ্কট, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, মান্ধাতা আমলের জরিপ ব্যবস্থাসহ অনৈতিক কর্মকা- চলতে থাকায় সমালোচনার মুখে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে প্রতিষ্ঠানের দাবি কলঙ্কতিলক অঙ্কিত থাকায় সামাজিক বনায়নের মতো একাধিক জনহিতকর প্রকল্পের সুবিধাও অজানা থাকছে সাধারণ মানুষের।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিদ্যা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. খালেদ মিসবাহুজ্জামান জনকণ্ঠকে বলেন, বনবিভাগের আওতায় ১৭ দশমিক ৬২ শতাংশ বনভূমি থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবতায় শতাংশিক হিসাবে এ পরিমাণ অনেক কম হবে। বন বিভাগের জমি নানা স্থানে বেদখল হয়ে যাচ্ছে, গাজীপুর ও টাঙ্গাইল এলাকায় বনভূমির জমিতে গড়ে উঠছে শিল্পকারখানা। মূলত বন বিভাগের ব্যর্থতা প্রতিফলিত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় বেদখল হয়ে যাওয়া জমি সম্পর্কে তারা সঠিক তথ্য প্রকাশ করে অপ্রস্তুত। এছাড়া বন বিভাগের জনবল সঙ্কট তো রয়েছেই। এসব কারণে সঠিকভাবে বনভূমির পরিমাণ বলা অনেকটা কষ্টসাধ্য ব্যাপার।

বনভূমির পরিমাণ কমে যাওয়া প্রসঙ্গে নিসর্গবিদ ও লেখক দ্বিজেন শর্মা জনকণ্ঠকে বলেন, দেশে ৭ থেকে ১০ শতাংশের বেশি প্রাকৃতিক বন নেই। যে কোন দেশের জন্যে ২৫ শতাংশ বনভূমির প্রয়োজন রয়েছে। বাস্তবতায় আমাদের দেশে ঠিক সে পরিমাণ বনভূমি নেই। পৃথিবীজুড়ে বনভূমি ধ্বংস চলছে। আমাদের দেশেও সর্বত্র এ প্রবণতা রয়েছে। অন্যদিকে বন অধিদফতর কর্তৃক শতাংশিক হিসাবে বনভূমির পরিমাণ স্থির থাকার বিষয়টি প্রশ্ন সাপেক্ষ বলে মনে করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউট বিভাগের প্রফেসর ড. মোঃ জসিমউদ্দিন। তিনি এক প্রশ্নের জবাবে জনকণ্ঠকে বলেন, বনভূমির পরিমাণ স্থির বলা হলেও বনভূমিতে বন আছে কিনা তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

আবাসস্থল, পশু শিকার, সন্ত্রাসী কর্মকা-সহ একাধিক কারণে ব্যবহৃত হচ্ছে বন। গহীন অরণ্যে গাছ নিধন এখনও অহরহ ঘটনা। ফলে সারাদেশে বাড়ছে উষ্ণতা, পরিবর্তিত হচ্ছে ঋতু বৈচিত্র্য। এমনকি ক্রমান্বয়ে জলাবদ্ধতা বৃদ্ধিসহ বাড়ছে মরুময়তা। বন হ্রাসের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের ১৮ শতাংশ সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। অথচ সারা বিশ্বে বনভূমির পরিমাণ ৩১ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা মাত্র ১৭ দশমিক ৬২ শতাংশ। পরিবেশবাদীদের মতে, যে কোন মূল্যে রক্ষা করতে হবে দেশের প্রাকৃতিক বনভূমি। গাছ নিধনসহ বনজ সম্পদ রক্ষা সরকারের অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ বলেও মনে করেন কেউ কেউ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, লবণাক্ততার প্রভাবে হুমকির মধ্যে পড়েছে উপকূলীয় অঞ্চলের চাষাবাদ। জলোচ্ছ্বাসের কারণে সমুদ্রের লবণ পানি উঁচু ভূমিতে উঠে আসার পর তা নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় ক্রমশ ক্ষতির মাত্রা বাড়ছে। এছাড়া রয়েছে পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাব। একাধিক ব্যক্তিবর্গের মতে, জলবায়ুর পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে হুমকির মধ্যে রয়েছে সুন্দরবনসহ দেশের অধিকাংশ বনাঞ্চল। তাদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ভরা কাটালের সময় পানির স্তরের উচ্চতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে লবণাক্ততা মাটিতে স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। মৌসুমী বায়ুর ধরন পরিবর্তন ও গ্রীষ্মকালের দূরত্ব বৃদ্ধির কারণে শস্যতে কীট-পতঙ্গের আক্রমণও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি রয়েছে। স্থায়ীভাবে লোনা পানি প্রবেশের ফলে হুমকির মুখে রয়েছে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা। এসব কারণে বনের ওপর মানুষের নির্ভরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভবিষ্যতে বনভূমির ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ (সুন্দরবন) ॥ জলাবায়ুর পরিবর্তনসহ একাধিক কারণে ক্রমাগত ছোট হয়ে আসছে সুন্দরবন। শুধুমাত্র ভাঙ্গনের কারণেই প্রতিবছর ৬ বর্গকিলোমিটার করে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার পর মাত্র ৩৭ বছরে সুন্দরবনের পরিমাণ কমেছে ১৪৪ বর্গকিলোমিটার। এক তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, গত চার দশকে ২৩৩ কিলোমিটার বন ধ্বংস হলেও পলি জেগে গড়ে ওঠা বনের পরিমাণ মাত্র ১০৪ বর্গকিলোমিটার, যা ধ্বংসপ্রাপ্ত বনের অর্ধেকেরও কম! বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে বাংলাদেশ অংশে সুন্দরবনের পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ১ হাজার ৭০০ হেক্টর, যা দেশের মোট আয়তনের প্রায় ৪ দশমিক ০৭ শতাংশ।

বাংলাদেশ স্পেস রিসার্চ এ্যান্ড রিমোট সেনসিং অর্গানাইজেশন (স্পারসো) কর্তৃক ‘টাইম সিরিজ এ্যানালাইসিস অব কোস্টাল ইরোশন ইন দ্য সুন্দরবনস ম্যানগ্রোভ’ শীর্ষক এক গবেষণার তথ্য থেকে জানা যায়, ১৯৭৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ৩৭ বছরে এ বনের পরিমাণ কমেছে ১৪৪ বর্গকিলোমিটার। তাদের ধারণামতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদী ভাঙ্গন, অবৈধভাবে বসতি স্থাপনসহ অনিয়ন্ত্রিত গাছ কাটার কারণে কমছে বনের পরিমাণ।

লবণাক্ততার প্রভাবে হুমকির মধ্যে রয়েছে সুন্দরবন। উজানের পানির গতি পরিবর্তন হওয়ায় সুন্দরবন অংশের নদ-নদীতে লবণাক্ততা মাত্রাতিরিক্তভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে উদ্ভিদের শ্বাসমূলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এছাড়া স্বাভাবিক শ্বসন প্রক্রিয়া ব্যাঘাত ঘটায় সুন্দরীসহ বৈচিত্র্যময় গাছগুলো আগামরা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। শুধুমাত্র গাছপালা নয়, নানা প্রজাতির পশুপাখিও লবণাক্ততার প্রভাবে ধ্বংসের মুখে। বনের মাটিতে গর্ত করে এক ধরনের পাখি বাস করত, জোয়ারের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে যা বিলুপ্তপ্রায়। এমনকি নদীতে বাঁধ নির্মাণের ফলেও বনভূমিতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে মনে করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. খালেদ মিসবাহুজ্জামান। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সুন্দরবনের লবণাক্ততার প্রভাব নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমের তুলনায় বর্ষা মৌসুমে এ অঞ্চলে লবণাক্ততার প্রভাব কম। ফ্রেশ ওয়াটার ফ্লো (সাধারণ পানি প্রবাহ) বৃদ্ধি পেলে নোনা জল ঢুকতে পারে না, তবে শীতকালে এটা কম হয়। লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেলে সুন্দরবনের সকল প্রজাতির উদ্ভিদ রক্ষা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তবে ভাঙ্গা গড়া নিয়ে তেমন শঙ্কার কিছু নেই, প্রাকৃতিকভাবে এ বদ্বীপে ভাঙ্গা গড়া চলতেই থাকবে। কিন্তু নদীতে বাঁধ নির্মাণের কারণেও লবণাক্ততা বাড়ছে, এ বিষয়ে সতর্ক হতে হবে।

পাহাড়ী বন ॥ গাছ কর্তন ও বাসস্থান তৈরিসহ একাধিক কারণে কমছে পাহাড়ী বন। আয়তনে কমে যাওয়া নয়, বনের ভেতরেও কমছে গাছের সংখ্যা। গাছ কমে যাওয়ায় কোথাও কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে সবুজের সমারোহ। বন অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশে পাহাড়ী বনের আয়তন ১৩ লাখ ৭৭ হাজার হেক্টর, যা দেশের মোট আয়তনের ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ। জানা গেছে, চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কক্সবাজার, সিলেট, মৌলভীবাজার এবং হবিগঞ্জের পাহাড়ী এলাকা নিয়ে গঠিত পাহাড়ী অঞ্চলের কোথাও কোথাও ক্রমেই কমে যাচ্ছে গাছের সংখ্যা। বেদখল হয়ে যাচ্ছে সরকারী জমি। পাহাড়ী বনে গাছ কর্তন চললেও দূর থেকে তা নির্ণয় করা কঠিন। পরিবেশবাদীদের মতে, সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে শুধুমাত্র ঢাকাকেন্দ্রিক নয়, ঢাকার বাইরের বন রক্ষায় সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

শালবন ॥ শালের জন্য বিখ্যাত গাজীপুর, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও শেরপুর জেলার বনভূমিতে চলছে গাছ কর্তন। ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা আসার পথে রেললাইনের দুপাশে বনবিভাগের বহুজমি দখল হয়ে যেতে দেখা যায়। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ মহাসড়কে পাশের বনেও একই অবস্থা। বনভূমির জায়গা দখল করে শিল্পকারখানা ও বসতি নির্মাণ থেমে নেই। অধিদফতরের তথ্যমতে এ বনের আয়তন ১ লাখ ২০ হাজার হেক্টর, যা দেশের মোট আয়তনের মাত্র শূন্য দশমিক ৮১ শতাংশ। তবে ক্রমইে কমে আসছে এ বনের আয়তন। জানা গেছে, জমি লিজ নিয়ে বা ব্যক্তিমালিকানায় জমি ক্রয়ের পর বনবিভাগরে জমি দখল করে নেয়া এ এলাকায় নিত্যনৈমিত্তিক!

জলাভূমির বন ॥ সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার হাওড় ও বিলজুড়ে বিস্তৃত এ বনেও চলছে মানুষের আগ্রাসন। বনের আয়তন ২৩ হাজার হেক্টর হলেও বাস্তবতায় তা নেই। এ অঞ্চলেও হাওড় ও বিল দখলসহ বনভূমির জায়গায় স্থাপনা গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে।

সৃজিত উপকূলীয় বন : নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় এ এলাকার বনেও আগ্রাসন থেমে নেই। উপকূলীয় অঞ্চলের গাছগুলো বড় না হওয়ায় তা কেটে নিলেও তেমনভাবে বুঝা যায় না বলেও জানান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক। প্রায় ২ লাখ হেক্টর বনভূমির আয়তনও অন্যান্য বনের মতোই কমছে।

সামাজিক বনায়ন ॥ সামাজিক বনায়ন বন বিভাগের অন্যতম এক সাফল্য। এ কার্যক্রমের মাধ্যমে সারাদেশে সবুজায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় দরিদ্র জনগণকে উপকারভোগী হিসেবে সম্পৃক্ত করার কারণে ভূমিহীন দরিদ্র, বিধবা ও দুর্দশাগ্রস্ত গ্রামীণ জনগণের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রান্তিক ও পতিত ভূমিতে বৃক্ষরোপণ অভিযান অব্যাহত থাকায় বনজ সম্পদ সৃষ্টি, মরুময়তারোধ, ক্ষয়িষ্ণু বনাঞ্চল রক্ষা ও উৎপাদন বৃদ্ধি, পরিবেশ উন্নয়ন ও জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে বলে মনে করে বন অধিদফতর। জানা গেছে, সামাজিক বনায়নের আওতায় ২০০১ থেকে ২০১৫ মাত্র ১৪ বছরের ব্যবধানে ৯ কোটি ৬১ লাখ ৫৭ হাজার ৭০০ চারা উত্তোলনপূর্বক বিক্রয় ও বিতরণ হয়েছে। তবে বন বিভাগরে প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি না হওয়ায় এসব কার্যক্রম পরিচালনায় তাদের বেগ পোহাতে হয়েছে। আর বনের অভ্যন্তরে অবৈধভাবে গাছ কর্তন চললেও দেশে মোট বৃৃক্ষের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউট বিভাগের প্রফেসর ড. মোঃ জসিমউদ্দিন। তিনি বলেন, সামাজিক বনায়নসহ বন ব্যবস্থায় সরকারীসহ ব্যবস্থাপনার কারণে তুলনামূলকভাবে দেশে বৃক্ষের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বনভূমিতে আচ্ছাদিত বনের পরিমাণ বাড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বিলুপ্তপ্রায় গাছ রক্ষার্থে গবেষণাও চলছে। সরকারী ও বেসরকারীভবে বনায়নের কারণে দেশে সবুজায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে। সামাজিক বনায়নকে বন অধিদফতরের অন্যতম সাফল্য বলে মনে করেন বন অধিদফতরের সহকারী বন সংরক্ষক আবু নাসের খানও।

সামগ্রিক প্রসঙ্গে নিসর্গবিদ ও লেখক দ্বিজেন শর্মা জনকণ্ঠকে বলেন, প্রাকৃতিক কারণে বন ধ্বংসের অবস্থা এখনও তৈরি হয়নি। মানুষের কারণেই বন ধ্বংস হচ্ছে। সুন্দরবনে লবণাক্ততার কারণে সুন্দরী গাছ মারা যাচ্ছে। পৃৃথিবীজুড়ে লবণাক্ততার প্রভাব রয়েছে। এছাড়া বনের ওপর মানুষের আগ্রাসন চলছে। বনদস্যু কর্তৃক বন কেটে নেয়াসহ সর্বত্র বন লোপাট চলছে। আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. খালেদ মিসবাহুজ্জামান মনে করেন, সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে বনের ওপর মানুষের আগ্রাসন হ্রাস করা যেতে পারে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকরী বাহিনীসহ সকলের তদারকি বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে। বনের পার্শ্ববর্তী প্রতিটি এলাকায় সামাজিক সচেতন মানুষ রয়েছে উল্লেখ করে তাদের আরও বেশি সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এ শিক্ষক।

অবৈধ গাছ কর্তন ও বনবিভাগের জমি বেদখল হয়ে যাওয়ার সামগ্রিক প্রসঙ্গে বন অধিদফতরের প্রধান বন সংরক্ষক মোঃ ইউনুছ আলী জনকণ্ঠকে বলেন, সরকারীভাবে সারাদেশে ২০০ অভিযান পরিচালিত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবতায় তার চেয়ে বেশি হচ্ছে। তারপরও বনের ওপর আগ্রাসন থেমে নেই। তবে আমাদের সব রকমের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া জনবল সঙ্কট দীর্ঘদিনের অন্যতম একটি সমস্যা।