২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হত্যাকারীদের গ্রেফতারে সিসি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে

  • গুলশানে ইতালীয় নাগরিক খুন

গাফফার খান চৌধুরী ॥ সোমবার রাতে গুলশানে ইতালীয় নাগরিক হত্যার পেছনে দেশকে কূটনৈতিকভাবে বেকায়দায় রাখার কোন গভীর ষড়যন্ত্র আছে কিনা সে বিষয়ে গভীর তদন্ত চলছে। পাশাপাশি আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত জটিলতা ও এনজিওটির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়াদিও তদন্তে প্রাধান্য পাচ্ছে। এসব বিষয়কে সামনে রেখেই মামলাটির তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। হত্যাকারীদের গ্রেফতারে আশপাশের ভবনের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। গুলশানজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। মরদেহ ইতালীতে পরিবারের কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। যদিও মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। হত্যাকা-ের ঘটনায় আইসিসিও’র বাংলাদেশ দেশীয় প্রতিনিধি হেলেন ভান ডার বেক বাদী হয়ে গুলশান মডেল থানায় অজ্ঞাত খুনীদের আসামি করে মামলা করেছেন।

এদিকে সন্ত্রাসীদের গুলিতে ইতালির নাগরিকের মৃত্যু বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। যদিও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ভারপ্রাপ্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোখলেছুর রহমান বলেছিলেন, হত্যাকা-টি পরিকল্পিত।

সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টার দিকে গুলশান-২ নম্বরের ৯০ নম্বর সড়কে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমানের সরকারী বাসভবনের দেয়ালের দক্ষিণ পাশে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন আইসিসিও কো-অপারেশন বাংলাদেশের প্রকল্প ব্যবস্থাপক সিজার তাভেলা (৫০)। তিনি নেদারল্যান্ডসভিত্তিক এনজিও আইসিসিও কো-অপারেশনের ‘প্রফিটেবল অপরচ্যুনিটিজ ফর ফুড সিকিউরিটি’ কর্মসূচীর প্রকল্প ব্যবস্থাপক ছিলেন। এনজিওটি বাংলাদেশে পানি, স্যানিটেশন, রিফিউজি সমস্যা ও পুনর্বাসনসহ সমাজসেবামূলক নানা কাজ করে থাকে।

তদন্তকারী সংস্থার উর্ধতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনকণ্ঠকে জানান, সিজারের বাড়ি ইতালির মিলান শহরে। তার পাসপোর্ট নম্বর ওয়াইএ০৪৩৮২৪১। পাসপোর্টটি ২০১০ সালের ২৯ নবেম্বর ইস্যু করা। যা ২০২০ সালের ২৮ নবেম্বর উত্তীর্ণ হওয়ার কথা। সিজারের জন্ম ১৯৬৪ সালের ১৩ মে।

ইতালিতে সিজারের ১৬ বছর বয়সী এক কন্যাসন্তান রয়েছে। প্রায় ২ বছর আগে স্ত্রীর সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে যায়। নার্জার নামে তার এক বিদেশী বান্ধবী রয়েছে। ওই বান্ধবী বর্তমানে তুর্কমেনিস্তানে অবস্থান করছেন। চলতি বছরের জুন মাসে ২ সপ্তাহের জন্য ওই বান্ধবী বাংলাদেশে এসেছিলেন। বান্ধবীকে নিয়ে বসবাস করছিলেন গুলশান-২ নম্বরের ৫৪ নম্বর সড়কের ১১/বি নম্বর বাড়ির ৫/২ ফ্ল্যাটে। ফ্ল্যাটটি মাসিক এক লাখ টাকা ভাড়ায় বসবাস করছিলেন নিহত সিজার। ওই ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে সন্দেহজনক বা আপত্তিকর তেমন কিছুই পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা। বান্ধবী চলে যাওয়ার পর থেকে তিনি একাই ওই ফ্ল্যাটে বাস করছিলেন।

জানা গেছে, এনজিওটি ২০১২ সালে গুলশান-১ নম্বরের ৩০ নম্বর সড়কের শেষ মাথায় গুলশান লেক লাগোয়া সমুদ্র নামের একটি ৬ তলা রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ির তৃতীয় তলায় কার্যক্রম শুরু করে। বাড়িটির মালিক রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ও সঙ্গীতশিল্পী আসিফ আলতাফ। মাসিক ৮০ হাজার টাকা ভাড়া এবং অন্যান্য খরচসহ প্রায় একলাখ টাকায় বাড়িটি ভাড়া নিয়ে প্রথম এনজিওটি কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে বাড়িটির ওই ফ্ল্যাটের ভাড়া প্রায় সোয়া লাখ টাকা।

এ বাড়িতে দাফতরিক কার্যক্রম চালানোর আগে বাংলাদেশে কোথায় এনজিওটি কার্যক্রম পরিচালনা করত, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি।

বাড়িটিতে গিয়ে দেখা গেছে, বাড়ির ভেতর-বাইরে নিরাপত্তা প্রহরী ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনে ঠাসা। দুপুরে বাংলাদেশস্থ ইতালিয়ান দূতাবাসের দুই কর্মকর্তা অফিসে যান। তারা সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কোন কথা বলতে রাজি হননি। এনজিওটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সিজারের জন্য দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। এনজিওটির অফিসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ব্যতীত কাউকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। বাড়িটির সামনে বা রাস্তায় এনজিওটির কোন সাইনবোর্ড দেখা যায়নি। শুধু যে ফ্লাটে এনজিওটি কার্যক্রম চালায়, সেখানে সাইনবোর্ড রয়েছে।

২০১৩ সালে এনজিওটি বাংলাদেশের এনজিও ব্যুরোর তালিকাভুক্ত হয়। এনজিওটিতে বর্তমানে দেশী-বিদেশী মিলিয়ে মোট ৮০ জন কর্মরত। নিহত সিজার চলতি বছরের ১৫ মে বাংলাদেশে যোগদান করেন। তিনি ১০ হাজার ইউরো যা বাংলাদেশী প্রায় ৯ লাখ টাকা বেতনে কর্মরত ছিলেন। তিনি আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সদস্য ছিলেন। স্কুলটির সুইমিং পুলে প্রতিদিন সাঁতার কাটতেন। প্রায় প্রতিদিন সাঁতার কাটতেন। ঘটনার দিন তিনি অফিস থেকে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বের হন। ঘটনার আগে তিনি সুইমিং পুল সাঁতর সেরে বাসায় ফিরছিলেন। তার পরণে ট্রাউজার ও গেঞ্জি ছিল।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনকণ্ঠকে আরও জানান, একটি মোটরসাইকেলযোগে ৩ যুবক ঘটনাস্থলের পাশে ৮৩ নম্বর সড়কে অবস্থান নেয়। সেখানে জার্মান ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের গাড়ি পার্কিংয়ের সামনের একটি মেহগিনি গাছের নিচে মোটরসাইকেলটি রাখে। মোটরসাইকেলটি ৮৩ নম্বর সড়কের দিকে মুখ করে রাখা হয়। মোটরসাইকেলে একজন বসে থাকে। দুইজন নেমে যায়। সিজার গবর্র্নরের বাড়ির সম্মুখ দিক থেকে দক্ষিণ দিকের প্রাচীর ঘেষে ফুটপাথ ধরে বাড়ি ফিরছিলেন। দেয়ালের মাঝামাঝি জায়গায় মেহগিনি গাছের নিচে দুই হত্যাকারী সিজারকে ডাক দেয়। সিজার দাঁড়ালে তার বুক লক্ষ্য করে পর পর ৩টি গুলি চালায়। সিজার অনেক লম্বা হওয়ায় এবং হত্যাকারীরা তুলনামূলক খাটো হওয়ায় হত্যাকারীরা সিজারের মাথায় গুলি করতে পারেনি। হত্যাকারীরা এজন্য সিজারের বাম পাঁজরে গুলি চালায়।

গুলিবিদ্ধ সিজার আবার গবর্নর হাউসের সম্মুখ দিকে দৌড়াতে থাকেন। আর হত্যাকারীরা পেছনে রাখা মোটরসাইকেলে করে ৮৩ নম্বর সড়ক ধরে সোজা উত্তর দিকে চলে যায়। ঘটনাস্থল থেকে সেভেন পয়েন্ট সিক্স ফাইভ বোরের আগ্নেয়াস্ত্রের ৩টি বুলেটের খোসা উদ্ধার হয়েছে। বুলেটের খোসা ছাড়াও রক্তমাখা জামা কাপড় হত্যার আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। হত্যাকা-টি পরিকল্পিত। তাতে কোন সন্দেহ নেই। বুলেটগুলো সিজারের বুকের ভেতরে মারাত্মক ক্ষতের সৃষ্টি করে। ২টি বুলেট শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায়। ভেতরে প্রচুর রক্তক্ষরণের ফলে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায়ই ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সিজারের মৃত্যু হয়। সিজারের সঙ্গে থাকা কোন কিছুই হত্যাকারীরা নেয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, দেশকে কূটনৈতিকভাবে বেকায়দায় রাখার পাশাপাশি এনজিওর টাকার লেনদেন, অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা এনজিও কোন কর্মকর্তার সঙ্গে ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে।

এদিকে সিজার হত্যাকাণ্ডে এনজিওটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি হেলেন ভান ডার বেক বাদী হয়ে গত সোমবার রাতে গুলশান মডেল থানায় অজ্ঞাত খুনীদের আসামি করে মামলা দায়ের করেন। মামলাটি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করছে বলে জনকণ্ঠকে জানান ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার মুনতাসিরুল ইসলাম।

এদিকে ইউনাইটেড হাসপাতাল মর্গ থেকে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সিজারের মরদেহ মঙ্গলবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে নেয়া হয়। দুপুরে সিজারের ময়নাতদন্ত শেষ করেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান ডাঃ কাজী মোহাম্মদ আবু সামা।

পরে তিনি সাংবাদিকদের জানান, সিজারের শরীরে তিনটি গুলির চিহ্ন আছে। দুটি গুলি শরীর ভেদ করে বের হয়ে যায়। একটি গুলি শরীরে পাওয়া গেছে। খুব কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলিগুলো করা হয়। এর আগে গুলশান থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোঃ সাব্বির রহমান কর্তৃক তৈরি রিপোর্টে বলা হয়, সিজারের ডান হাঁটুর ওপর এবং ডান হাতের কনুইতে থেঁতলানো জখমের চিহ্ন আছে। এ ছাড়া বাম হাতের পেছনে ও ভেতরের দিকে একটি, বাম বগলের নিচে, পিঠের বামপাশে ঘাড় বরাবর একটি এবং ঘাড়ের দুই ইঞ্চি নিচে গুলির ছিদ্রের চিহ্ন আছে। লাশ ঢামেক মর্গে রাখা হয়েছে। পরে উর্ধতন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপক আলো রানী ঢালী টেলিফোনে জনকণ্ঠকে বলেন, নিহত সিজার অত্যন্ত ভাল মনের মানুষ ছিলেন। বাংলাদেশের কারও সঙ্গে বা অফিসে কোন প্রজেক্টের লেনদেন সংক্রান্ত বিষয়া নিয়ে কোন ঝামেলা নেই।

হত্যাকা-ের বিষয়ে মামলার বাদী এনজিওটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি হেলেন ভান ডার বেকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, সিজারের এমন মৃত্যুতে আমরা সত্যিই খুবই মর্মাহত। এনজিওটির আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত কোন জটিলতা বা অভ্যন্তরীণ কোন কোন্দল নেই। হত্যাকা-ের ঘটনাটির তদন্ত চলছে। তদন্তাধীন বিষয়ে আমি কোন মন্তব্য করতে চাই না। বা মন্তব্য করার মতো অবস্থাও এখন নয়। তদন্তে হত্যাকা-ের প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসবে বলে আমি আশা করি।

এদিকে মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, সিজারের হত্যাকা-ের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের নিরাপত্তার বিষয়টি কোনভাবেই সম্পর্কিত নয়। সিজারের হত্যাকা-টি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তারপরও হত্যাকা-ের সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রসঙ্গত, সিজারের হত্যার পর রাতে ‘সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ’ নামের জঙ্গী হুমকি পর্যবেক্ষণকারী একটি ওয়েবসাইটে বলা হয়, ইসলামিক স্টেট (আইএস) গুলশানের ওই হত্যাকা-ের দায় স্বীকার করেছে। এ বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সতি সত্যিই আইএস দায় স্বীকার করেছে নাকি, আইএসের নামে ভুয়া আইডির মাধ্যমে কেউ দায় স্বীকার করেছে, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে। বাংলাদেশে আইএসের কোন তৎপরতা নেই।

মন্ত্রী বলেন, এনজিওটির কোন কর্মকর্তার সঙ্গে সিজারের ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গোয়েন্দা পুলিশের চারটি দলসহ অন্যান্য সংস্থা হত্যা রহস্য উদঘাটনে কাজ করছে। কূটনৈতিকপাড়া কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে রাখা হয়েছে।