১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি মহেশখালী ও সোনাদিয়া কাছে টানে পর্যটকদের

  • পরিবেশ রক্ষায় সরকারের নানা উদ্যোগ

শাহীন রহমান, সোনাদিয়া-মহেশখালী থেকে ফিরে ॥ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব লীলাভূমি যেন সোনাদিয়া-মহেশখালী দ্বীপ। মূল ভূখ- থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও এ দ্বীপ সাধারণ মানুষ ও পর্যটকদের কাছে সব সময় আকর্ষণীয় বিষয়। সারি সারি নয়নাভিরাম প্যারাবন আর এর পাশ ঘিরে অসংখ্য ছোট বড় খাল জালের মতো বিছিয়ে রয়েছে। সোনাদিয়া দ্বীপে সমুদ্রের পাশ ঘেঁষে গড়ে ওঠা সুউচ্চ বালিয়ারীর তুলনা দেশে দ্বিতীয়টি নেই। দ্বীপের সমুদ্র সৈকতের বেলাভূমিতে পানির কিনার ঘেঁষে লাল কাঁকড়া, সবুজ বনানী ও জীববৈচিত্র্যে ভরা এ দ্বীপটি যেন দেশী-বিদেশী পর্যটকদের কাছে টানে। এছাড়াও সুবিশাল প্যারাবন ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ পাহাড়ী বনাঞ্চল পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত করেছে।

তবে সোনাদিয়া দ্বীপকে পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষার জন্য ইতোমধ্যে ১৯৯৯ সালে ইকোলজিক্যাল ক্রিটিক্র্যাল এরিয়া হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ দ্বীপের পরিবেশের মান উন্নয়নে ইতোমধ্যে পরিবেশ অধিদফতরের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে বনায়ন কার্যক্রম।

অধিদফতরের চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মোঃ মকবুল হোসেন বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ সালের ৪নং বিধান অনুযায়ী সোনাদিয়া দ্বীপ ও পার্শ্ববর্তী ঘটিভাঙ্গা মৌজার আংশিক এলাকা নিয়ে ইসিএ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে ক্লাইমেট রিজিলিয়েন্ট পার্টিসিপেটরি এফরেস্টেশন এ্যান্ড রিফরেস্টশন প্রকল্পের মাধ্যমে সোনাদিয়া দ্বীপের বনায়ন কার্যক্রম চালু আছে। এছাড়াও জলপাই রঙের সামুদ্রিক কাছিম ও পরিযায়ী পাখি সংরক্ষণের জন্য প্রকল্প নেয়া হয়েছে। কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ সোনাদিয়া দ্বীপের মোট আয়তন ৭ বর্গকিলোমিটার। জেলা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে কুতুবজোম ইউনিয়নে এর অবস্থান। এ দ্বীপের দুটি গ্রামে বর্তমানে প্রায় ১৭শ’ লোকের বসবাস। বাঁকখালী নদীর মোহনায় মহেশখালী পয়েন্ট থেকে স্পিডবোটে মাত্র ১৫ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত সোনাদিয়া দ্বীপ। অসংখ্য খাল ও প্যারাবনের সারি গিয়ে মিলেছে দ্বীপের মূল ভূখ-ে। যাওয়ার পথে নদী ঢেউ আর প্যারাবনের বাতাসের দোল খাওয়ার দৃশ্য যে কারও মন কেড়ে নেবে। একবার গেলে বারবার যেতে ইচ্ছে হবে এ দ্বীপে।

উপকূলীয় বনবিভাগের কর্মকর্তা আরএসএম মুনিরুল ইসলাম বলেন, দেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় প্যারাবনের একটি বিরাট অংশ সোনাদিয়া দ্বীপে দেখা যায়। সোনাদিয়ার প্যারাবন বাইন বৃক্ষসমৃদ্ধ। দেশে বিদ্যমান ৩ প্রজাতির বাইন গাছই এখানে পাওয়া যায়। এছাড়া প্যারাবনে গেওয়া হরিগোজা, নুনিয়া, ঝাউ ইত্যাদি ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদও রয়েছে। প্যারাবনের ভেতরে সুন্দরবনের মতো ছোট ছোট নদীর দু’পাশে নয়নাভিরাম দৃশ্যও চোখে পড়ে। সোনাদিয়ার প্যারাবন চর, খাল ও মোহনা নানা প্রজাতির মাছ ও অমেরুদ-ী প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। দ্বীপটির প্যারাবনসংলগ্ন খালে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ যেমন- বাটা, কোরাল, তাইল্যা, দাতিনা, কাউন ও পোয়া পাওয়া যায়।

সোনাদিয়া দ্বীপ ভ্রমণে প্রায় ১৪ কিলোমিটার প্রশস্ত সৈকত, সৈকত ঘেঁষে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা সুবিশাল ঝাউবন, সুউচ্চ বালিয়ারী, জালের মতো ছোট-বড় অসংখ্য খালবেষ্টিত ম্যানগ্রোভ বন, বিস্তীর্ণ ল্যাগুন্যাল ম্যাডফ্লাট, কেয়া নিসিন্দার ঝোপ, বিচিত্র প্রজাতির জলচর পাখি চোখে পড়বে। সমুদ্রের পাশ ঘেঁষে অবস্থিত সুউচ্চ বালিয়ারীর তুলনা যেন দেশে দ্বিতীয়টি নেই। সমুদ্র ও সৈকত থেকে ঝাউবনের দৃশ্য অপূর্ব শোভাবর্ধন করে। সৈকত এবং বালিয়ারীর বিপন্ন জলপাই বর্ণের সামুদ্রিক কাছিমের ডিম পাড়ারও উপযোগী স্থান এটি। স্থানীয়রা জানান, এখানে সামুদ্রিক সবুজ কাছিমও ডিম পাড়তে আসে। সমুদ্র সৈকতের বেলাভূমিতে পানির কিনার ঘেঁষে বিচরণ করতে দেখা যায় লাল কাঁকড়া। স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, শীতকালে সোনাদিয়া দ্বীপে নানা ধরনের স্থানীয় ও জলচর পাখির আগমন ঘটে। চর এবং খালের ধারে জলচর পাখির বেশি সমাগম ঘটে। এখানে ৭০ প্রজাতির জলচর পাখির দেখা মেলে। ডিসেম্বর থেকে ফেরুয়ারি পর্যন্ত সময়ে সোনাদিয়ায় জলচর পাখি বিশেষত দেশী-বিদেশী কাদাখোচা পাখির মেলা বসে এখানে। বনবিভাগ জানায়, সম্প্রতি সোনাদিয়ায় বৈশ্বিকভাবে বিপন্ন তিন প্রজাতির কাদাখোচা পাখি স্পুনবিল্ড স্যান্ডপাইপার, এশিয়ান ডোউইচার এবং নর্ডম্যান্স গ্রীনশ্যাংক দেখা গেছে। বুনোহাঁসের মধ্যে রাজহাঁস, চকাচকি এবং খান্তেমুখাও এখানে বিচরণ করতে দেখা যায়।

মহেশখালী দ্বীপ ॥ সোনাদিয়ার পাশে প্যারাবন ও পাহাড়ী বনাঞ্চলসমৃদ্ধ আরেক দ্বীপের নাম মহেশখালী দ্বীপ। নানা বর্ণে ও বৈচিত্র্যে ভরপুর দ্বীপটি। এ দ্বীপ ভ্রমণে সুবিশাল প্যারাবন ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ পাহাড়ী বনাঞ্চল যেন চোখ জুড়িয়ে দেয়। জেলা শহর থেকে স্পিডবোটে মাত্র ১৫ মিনিটেই এখানে পৌঁছা যায়। প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক এখানে ভিড় করছে বলে বনবিভাগ জানিয়েছে। দ্বীপটির উত্তর-পূর্বে রয়েছে কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলা, দক্ষিণ-পূর্বে কক্সবাজার সদর, দক্ষিণ-পশ্চিমে বিপুল জলরাশির বঙ্গোপসাগর। আর উত্তর-পশ্চিমে কুতুবদিয়া উপজেলা অবস্থিত। মহেশখালীর আয়তন ৩শ’ ৮৮.৫০ বর্গকিলোমিটার।

বনবিভাগ জানিয়েছে, ১৯৬৮-৬৯ সাল হতে বর্তমান পর্যন্ত এ দ্বীপে উপকূলীয় অঞ্চলে ২১ হাজার ৯৫৪ একর নতুন প্যারাবন সৃষ্টি করা হয়েছে। এছাড়া মহেশখালীর পাহাড়ী বনাঞ্চলে ১৯৯২-৯৩ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত ৮ হাজার ৬৯.০৭ একর বনায়ন করা হয়েছে।

বর্তমান মহেশখালী দ্বীপে ১৬ হাজার নিবিড় প্যারাবন ও ১৮ হাজার ২৮৬.৪০ একর জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ পাহাড়ী বনাঞ্চল বিদ্যমান। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আরএসএম মনিরুল ইসলাম জানান, মহেশখালীর প্যারাবনে বাইন গাছই প্রধান। এ বনে অন্য উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে কেওড়া, নুনিয়া, ঝাউ হারগোজা। পাহাড়ী বনাঞ্চলের মধ্যে গর্জন, সেগুন, চাপালিশ চম্পা, চিকরাশি আকাশমণি ঢাকিজাম ও জাম রয়েছে। তিনি জানান, মহেশখালী দ্বীপের প্যারাবন ও পাহাড়ী বনাঞ্চলের মধ্যে রয়েছে বানর, কচ্ছপ, কাঁকড়া ও বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, গুঁইসাপ। পাহাড়ী বনাঞ্চলে বানর, হরিণ, সজারু, শিয়াল, মথুরা, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, গুঁইসাপ ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দেখতে পাওয়া যায়। ২০১৪ সালে মহেশখালী দ্বীপের ১২ হাজার ১৪৪.৪৯ একর প্যারাবনসমৃদ্ধ বনাঞ্চল সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমানে ক্লাইমেট রিজিলিয়েন্ট ফান্ড পার্টিসিপেটরি এফরেস্টেশন প্রকল্পের মাধ্যমে মহেশখালী দ্বীপের বনায়ন কার্যক্রম চালু রয়েছে।