২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হবিগঞ্জের ৩ রাজাকারের বিরুদ্ধে চার অভিযোগ গঠন

  • যুদ্ধাপরাধী বিচার

স্টাফ রিপোর্টার ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে হবিগঞ্জের দুই সহোদর ও তাদের চাচাত ভাই মহিবুর রহমান ওরফে বড় মিয়া,মজিবুর রহমান ওরফে আঙ্গুর মিয়া ও আব্দুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে হত্যা, অপহরণ, আটক, নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণের মতো চারটি অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। এই অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে তিন রাজাকারের বিচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো। একই সঙ্গে প্রসিকিউশন পক্ষে সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ২১ অক্টোবর পরবর্তী দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মঙ্গলবার এই আদেশ প্রদান করেছে। ট্রাইব্যুনালে অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মোঃ শাহিনুর ইসলাম ও বিচারপতি মোহাম্মদ সোহরাওয়ার্দী। প্রসিকিউটর রেজিয়া সুলতানা চমন, প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তাপস কান্তি বল ও আসামিপক্ষের আইনজীবী মাসুদ রানা এ সময় ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন। অভিযোগ গঠনের পূর্বে ট্রাইব্যুনাল আসামিদের কাছে জানতে চায় আপনারা দোষী নাকি নির্দোষ। ট্রাইব্যুনালের জবাবে তিন আসামি নিজেদের নির্দোষ দাবি করে আদালতের কাছে ন্যায় বিচার দাবি করেন।

আসামি মহিবুর রহমান ওরফে বড় মিয়া ও মজিবুর রহমান ওরফে আঙ্গুর মিয়া ও আব্দুর রাজ্জাককে মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তাদের উপস্থিতিতেই ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠন করেছে। আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ অক্টোবর সকাল আনুমানিক ১০টার সময় আসামি মহিবুর রহমান ওরফে বড় মিয়া ও মজিবুর রহমান ওরফে আঙ্গুর মিয়াসহ তাদের সঙ্গীয় রাজাকার বাহিনী ও ১০/১৫ পাকিস্তানী আর্মি তিনটি নৌকাযোগে হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং থানার মুক্তিযুদ্ধের উপ-সর্বাধিনায়ক মেজর জেনারেল (অব) এমএ রবের খাগাউড়া গ্রামের বাড়িতে হামলা চালায়। আসামিদ্বয় ঐ বাড়িতে আগুন দিয়ে পাঁচটি বড় টিনের ঘর পুড়িয়ে দেয়। একই দিন রাজাকাররা হিন্দুপাড়ায় বাড়িঘরে লুটপাট চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই ঘটনার পর অধিকাংশ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন প্রাণ ভয়ে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

১৯৭১ সালের ১১ নবেম্বর মুক্তিযোদ্ধা আকল আলীর বাড়ি ঘেরাও করে। এ সময় আকল আলী ও রজব আলী ঘরে বসে গল্প করছিল। মহিবুর রহমান ওরফে বড় মিয়া তার হাতে থাকা রাইফেল দিয়ে গুলি করে রজব আলীকে হত্যা করে। এর পর রাজাকার দুই সহদর মুক্তিযোদ্ধা আকল আলীকে চোখ বেঁধে টেনেহিঁচড়ে আখাউড়া রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে মহিবুর রহমান ওরফে বড় মিয়া ও মজিবুর রহমান ওরফে আঙ্গুর মিয়া মুক্তিযোদ্ধা আকল আলীকে অজ্ঞাতস্থানে নিয়ে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলে। আসামি বড় মিয়া ও আঙ্গুর মিয়া একাত্তরের ২৬ অক্টোবর বানিয়াচং থানার খাড়াউড়া বেরিপাড় সাকিনে অভিযান চালায়। এ সময় পাকিস্তানী আর্মি আফতাব মিয়ার যুবতী কন্যা এবং একই গ্রামের মৃত মঞ্জুর উল্লাহর স্ত্রীকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে।

১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন আসামি ১) মহিবুর রহমান ওরফে বড় মিয়া ও মজিবুর রহমান ওরফে আঙ্গুর মিয়া পিতা-মৃত দরছ উদ্দিন, সাং-কুমুরসানা, থানা-বানিয়াচং, জেলা-হবিগঞ্জ রাজাকার বাহিনীতে ভর্তি হয়ে স্বাধীনতা বিরোধী কর্মকা-ে লিপ্ত হয়ে মানবতা বিরোধী অপরাধ সংঘটিত করে। ১৯৭১ সালের ৩০ এপ্রিল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী হবিগঞ্জ সদরে প্রবেশ করে। তখন সৈয়দ কামরুল আহসান ছিলেন হবিগঞ্জ জেলার নেজামে ইসলামের নেতা। তিনি তার সহযোগীদের নিয়ে পাকিস্তানী আর্মিদের স্বাগত জানিয়ে হবিগঞ্জ মহকুমার বানিয়াচং সিও অফিসে তাদের ক্যাম্প করে দেয়। ১৯৭১ সালের মে মাসের যে কোন দিন নেজামে ইসলামের নেতা সৈয়দ কামরুল আহসানের নেতৃত্বে সৈয়দ ফজলুল হক থানা শান্তি কমিটির আহ্বায়ক এবং সাহাবুদ্দিন মোক্তার শান্তি কমিটির থানা সভাপতি করে বানিয়াচং থানা শান্তি কমিটি ও পরবর্তীতে রাজাকার বাহিনী গঠন করে। বানিয়াচং থানার খাগাউড়া গ্রামে অবস্থিত সৈয়দ কামরুল আহসানের বাড়িতে ছিল বানিয়াচং থানার প্রধান রাজাকার ক্যাম্প। এই ক্যাম্পের রাজাকার কমান্ডার ছিল আসামি মহিবুর রহমান ওরফে বড় মিয়ার ভাই মোস্তাফা (মৃত) এবং বড় ভাই কলমধর (মৃত) ছিল ৮ নং খাগাউড়া ইউনিয়নের শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান।

আসামিদের মধ্যে মহিবুর রহমান ওরফে বড় মিয়া (৬৫) হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলাধীন খাগাউড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। তার ভাই মজিবুর রহমান আঙ্গুর মিয়া (৬০) বর্তমান চেয়ারম্যান। দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তদন্ত শুরু হয়ে এ বছরের ২৮ এপ্রিল শেষ হয়। তদন্তের সময় ২১ জনের বক্তব্য শোনেন তদন্ত কর্মকর্তা। গত ১০ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ প্রসিকিউশনের এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। ট্রাইব্যুনালের আদেশের পর ওই দিন রাতেই বানিয়াচং থেকে তাদের গ্রেফতার করে স্থানীয় পুলিশ। ১২ ফেব্রুয়ারি তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। অন্যদিকে গত ১৭ মে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির দুইদিন পর ১৯ মে মহিবুর-মজিবুরের চাচাত ভাই রাজ্জাককে মৌলভীবাজারের আথানগিরি পাহাড় থেকে গ্রেফতার করা হয়। একইদিন ট্রাইব্যুনালে তিনজনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় প্রসিকিউশন।