১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভারতের কাছ থেকে মাসুলের অঙ্ক নির্ধারণে ধীরগতি

  • চট্টগ্রাম ও মংলাবন্দর ব্যবহার

তৌহিদুর রহমান ॥ চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের বিনিময়ে ভারতের কাছ থেকে মাশুল নির্ধারণে ধীর গতিতে এগোচ্ছে ঢাকা। দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই মাশুল নির্ধারণ করতে চাইছে সরকার। তাই তাড়াহুড়ো করে কোন মাশুল নির্ধারণ করা হবে না। এছাড়া মাশুল নির্ধারণে বিভিন্ন সংস্থার প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র এসব তথ্য জানায়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকার সফরকালে যেসব সমঝোতা স্মারক সই হয় তার মধ্যে অন্যতম ছিল চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার। এই সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী দুই আন্তর্জাতিক নৌবন্দর দিয়ে ভারত তিনটি রুটে পণ্য আনা-নেয়া করতে পারবে। দুই বন্দর ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে। অনুমোদিত রুটে ভারত পণ্য আনা নেয়ার জন্য জলপথ, রেলপথ ও স্থলপথ ব্যবহার করতে পারবে।

চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য দুই দেশের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হলেও সমঝোতায় মাশুল নির্ধারণ হয়নি। দুই দেশের প্রতিনিধিরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে মাশুল নির্ধারণ করবে। তবে মাশুল নির্ধারণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার থেকে একটি জয়েন্ট টেকনিক্যাল কমিটি (জেটিসি) গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি ইতোমধ্যেই দুইবার বৈঠক করেছে। বৈঠকে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা থেকে মাশুল নির্ধারণের জন্য পৃথক পৃথক প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। তবে সরকার থেকে এখনও মাশুল নির্ধারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।

বাংলাদেশের দুই আন্তর্জাতিক নৌবন্দর ব্যবহার করে ভারত পণ্য পরিবহন করলে মাশুল নির্ধারণের লক্ষ্যে মতামতের জন্য বিভিন্ন সংস্থার কাছে প্রস্তাব আহ্বান করেছে জেটিসি। ইতোমধ্যেই কয়েকটি সংস্থা থেকে প্রস্তাব পেশও করা হয়েছে। সড়ক বিভাগ এক প্রস্তাবে সড়ক পথে পণ্য পরিবহনের জন্য এক কিলোমিটার দূরত্বের জন্য টনপ্রতি ১ দশমিক ২৪ পয়সা দাবি করেছে। এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রস্তাবে পণ্য পরিবহনের জন্য টনপ্রতি ১৩০ টাকা মাশুল দাবি করা হয়েছে। আর পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে যদি প্রহরীর প্রয়োজন হয়, তাহলে সুবিধাভোগীকে আরও টনপ্রতি ৫০ টাকা করে দিতে হবে। প্রহরীসহ পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে টনপ্রতি মাশুল হবে ১৮০ টাকা। এছাড়া ব্যাংক মাশুলের ব্যাংক গ্যারান্টিও দাবি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। তবে বিভিন্ন সংস্থার প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে টনপ্রতি চূড়ান্ত মাশুল নির্ধারণ করবে সরকার। আর বাংলাদেশের সকল সংস্থা মাশুলের বিষয়ে ঐকমত্য হলে ভারতের সঙ্গে আলোচনায় বসবে সরকার। দেশটির সঙ্গে আলোচনার পরে মাশুল চূড়ান্ত করা হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে জানান, মাশুল নির্ধারণের জন্য বিভিন্ন পক্ষের মতামত নিয়ে তা চূড়ান্ত করা হবে। এ বিষয়ে আমরা তাড়াহুড়ো করতে চাই না। কেননা মাশুল নির্ধারণের বিষয়টি দেশের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। তাই অনেক কিছু বিবেচনায় নিয়ে মাশুল নির্ধারণ করতে চাইছে সরকার।

মাশুল নির্ধারণের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়ালিউর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, ভারতকে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার করতে দিলে বাংলাদেশের প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে। তবে মাশুল নির্ধারণ করতে হবে অনেক ভেবে-চিন্তে। দুই পক্ষেরই যেন লাভ হয়, সেভাবেই মাশুল নির্ধারণ করতে হবে। তিনি জানান, মাশুল নির্ধারণের জন্য আন্তর্জাতিক অনেক নিয়ম রয়েছে। এছাড়া মাশুল নির্ধারণের জন্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থারও একটি নিয়ম রয়েছে। সেটাও অনুসরণ করা যেতে পারে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর থেকে ভারত ত্রিপুরার আগরতলা, মেঘালয়ের ডাউকি ও অসমের সুতারকান্দি সীমান্ত দিয়ে পণ্য আনা-নেয়া করতে পারবে। এছাড়া দুই বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে এসব রুটে পণ্য আনা-নেয়ার জন্য জলপথ, রেলপথ ও স্থলপথ ব্যবহার করতে পারবে। ঢাকায় মোদির সফরকালে এই সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশের পক্ষে নৌসচিব শফিক আলম মেহেদী ও ভারতের পক্ষে দেশটির পররাষ্ট্র সচিব জয়শঙ্কর সই করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের দিল্লী সফরকালে ভারতকে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার করতে দেয়ার বিষয়ে সম্মত হন। সে সফরেই তিনি ভারতের ভূখ- ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার আগ্রহের কথা ভারতকে জানান। সে সময় চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের বিষয়েও আলোচনা হয়। তার এক বছর পরে মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের সম্মতিপত্র স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় না আসায় সে সময়ে ওই চুক্তিটি হয়নি।

চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের সঙ্গে ভারতের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে বেশ কয়েকটি প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে। ত্রিপুরার সাব্রুমের সঙ্গে বাংলাদেশের রামগড়ের যোগাযোগ স্থাপনে ভারত ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে ফেনী নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করছে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মাত্র ৭২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করলেই ত্রিপুরার সাব্রুমে প্রবেশ করতে পারবে ভারতীয় পণ্য। এছাড়া আখাউড়া থেকে আগরতলা পর্যন্ত রেলসংযোগ স্থাপন করা হচ্ছে। এটি নির্মিত হলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মালবাহী ওয়াগন আখাউড়া হয়ে সরাসরি ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় চলে যেতে পারবে।