২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অনলাইন নিরাপত্তায় হেল্পলাইন

  • কাশিফ আলী খান

পরিবর্তনশীল এই বিশ্বে বাংলাদেশ এখন আর পিছিয়ে নেই কোন অংশে। প্রতিনিয়ত এখানে চলছে উদ্ভাবনের খেলা, নতুনত্বের আধিপত্য এবং প্রযুক্তির জয়জয়কার। পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এদেশের তরুণ মেধাবী জনগোষ্ঠী। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে তাদের কর্মতৎপরতা এবং ইন্টারনেটে নিজস্ব স্বকীয়তা। বাংলাদেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়ন ঘটেছে গত ১০ বছরে, কম্পিউটার ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে আনুপাতিক হারে এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার দরুন এর ব্যবহারও বৃদ্ধি পেয়েছে প্রচুর। বাংলাদেশে সাইবার জগতের ক্রমবর্ধমান বিকাশই আমাদের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রতুল ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা দেয়। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্যানুযায়ী, জুলাই ২০১৫ পর্যন্ত প্রায় ৫ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে। বিটিআরসির আরও একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, এই সকল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর প্রায় শতকরা ৮০ ভাগই সামাজিক গণমাধ্যম ব্যবহার করেন এবং প্রত্যেকের নিজস্ব এ্যাকাউন্টও রয়েছে। যার দরুন আজ বাংলাদেশে ঘরে বসেও সারাবিশ্বের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা হয়ে উঠছে আরও সহজতর। ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবাদে আমাদের দেশের শহরের বাসিন্দারাই কেবল লাভবান হচ্ছেন তা কিন্তু নয়, প্রত্যন্ত এলাকার বাসিন্দারাও আজকাল মোবাইল ইন্টারনেটের মাধ্যমে লাভবান হচ্ছেন। এদের অনেকেই ইন্টারনেট ব্যবহার করে আর্থিকভাবে উপার্জনক্ষম হয়েছেন, এমনকি পাশাপাশি অনেককে উপার্জনে উদ্বুদ্ধ করছেন। এই ধরনের উদ্যোক্তাদের আমরা ফ্রিল্যান্সার নামে চিনে থাকি।

বাংলাদেশ সরকারের অনেক প্রকল্পই রয়েছে ফ্রিল্যান্সারদের বিশ্বমানের ট্রেনিং প্রদানের মাধ্যমে উপার্জনক্ষম করে তোলার জন্য। কিন্তু শুধু সরকারী প্রচেষ্টায় নয়, বেসরকারীভাবেও এই সকল উন্নয়নের জন্য পদক্ষেপ নেয়া যখন অত্যন্ত জরুরী, ঠিক তখনই দেখা দিয়েছে সাইবার অপরাধ নামক একটি চরম ব্যাধি। যার প্রকোপ বিগত কয়েক বছরে বৃদ্ধি পেয়েছে বহুল পরিমাণে। পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, বাংলাদেশে প্রতি ২০ সেকেন্ডে একটি করে সাইবার অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে এবং সেই সঙ্গে প্রতি বারো সেকেন্ডে একটি ফেসবুক এ্যাকাউন্ট তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে। ফেসবুক বলছে এখন তাদের নিয়মিত ব্যবহারকারীদের সংখ্যা হচ্ছে ১.৪৪ বিলিয়ন, যা বিগত বছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি। সারা দুনিয়ায় প্রতিদিন ফেসবুক ব্যবহার করছে ৯৩৬ মিলিয়ন মানুষ। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকেও প্রতিনিয়ত এই ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে। এই ক্রমবর্ধমান ফেসবুক ব্যবহারকারীর মধ্যে সাইবার অপরাধের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে যে ধরনের সাইবার অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, তার মধ্যে খুব বেশি পরিমাণে অপরাধ সংঘটন হচ্ছে অসচেতনতার দরুন এবং এর ৭০% ভুক্তভোগী হচ্ছেন নারী। বর্তমান জীবনযাপনের সারাদিনের কার্যকলাপ যদি একটি ফ্রেমে আটকে রেখে দেখি, তবে সেখানে আমরা খাওয়া, ঘুম, বাদ দিলে দিনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় নিজেদের সামাজিক গণমাধ্যমের মাঝে নিজেকে জড়িয়ে থাকতে দেখব। যার দরুন কিছুটা অসচেতনতার বশেও আমরা অনেক সময় সাইবার অপরাধীদের সাহায্য করে বসি তাদের অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে। এই অপরাধ প্রতিরোধের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ইনসাইট বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের (আইবিএফ) যৌথ উদ্যোগে ২০১৪ সালের মার্চ মাসে শুরু হয় সাইবার নিরাপত্তা নামক একটি সচেতনতামূলক কর্মসূচী। এই কর্মসূচীর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল দেশের জনগোষ্ঠীকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতন এবং নিরাপত্তাজনিত নিয়ম-নীতিসমূহের ব্যাপারে আরও সজাগ করে তোলা, পাশাপাশি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ (সংশোধনী ২০১৩) সম্পর্কেও সকলকে সচেতন করা।

বর্তমানে বাংলাদেশের একটি মাত্র সাইবার নিরাপত্তাজনিত হেল্পলাইন চালু রয়েছে, যা ০১৭৬৬৬৭৮৮৮৮। এই নম্বরে ডায়াল করে যে কেউ সাইবার অপরাধসংক্রান্ত সমস্যার জন্য সাহায্য চাইতে পারেন। আপনাদের সহযোগিতার জন্য এখানে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ছাড়াও, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন বিশেষজ্ঞরা। ইনসাইট বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের কর্তৃপক্ষ এবং তাদের আইন বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী গত দেড় বছরে ১২ হাজারেরও বেশি অভিযোগ এসেছে তাদের হেল্পলাইনের মাধ্যমে। যার মধ্যে ভুয়া ফেসবুক আইডি এবং হ্যাকড আইডিসংক্রান্ত অভিযোগের সংখ্যা সিংহভাগ। এছাড়াও এখানে অনলাইনের মাধ্যমে অর্থ জালিয়াতি, হ্যাকড ই-মেইল রিকোভারি, ফেসবুক রিকোভারিসহ অনলাইনের মাধ্যমে সংঘটিত সাইবার অপরাধের অভিযোগ গ্রহণ করা হয়। আরও জানা যায়, নারী ভুক্তভোগীদের পাশাপাশি পুরুষ ভুক্তভোগীদের সংখ্যাও কম নয়। নারীরা শুধু অভিযোগের ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে পুরুষদের তুলনায়। আইবিএফ আর আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যখনই কেউ সাইবার অপরাধে ভুক্তভোগী হবে প্রথমেই তাদের একটি সাধারণ ডায়েরি করতে হবে নিকটস্থ থানায় এবং সেই সাধারণ ডায়েরি প্রেরণ করতে হবে তাদের কাছে ই-মেইলের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ঘটনার বিবরণ সহকারে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন মনে করলে মামলা করায় সহায়তা প্রদান করে থাকেন। এছাড়াও তারা অন্যান্য আইনী সহায়তাও প্রদান করে থাকেন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীরা সহজে থানায় গিয়ে জিডি করতে চান না কেননা ভুক্তভোগীদের মতে, থানায় তাদের বিভিন্নভাবে বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। জিডি না করার দরুন অপরাধীরা তাদের অপরাধের মাত্রা আরও বৃদ্ধি করে।

লক্ষণীয় যে, দেশের সরকারী অনলাইন ওয়েবসাইটগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য অর্থনৈতিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট দুর্বল। যার ফলে তাদের ই-মেইল জালিয়াতি অথবা ই-মেইল হ্যাকের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের টাকার লোকসান দিতে হয় প্রায়ই। এজন্য অর্থনৈতিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের লেনদেন ব্যবস্থা তথা ওয়েবসাইটের দুই স্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা উচিত এবং মনিটরিং টিম গঠন করা উচিত। এই অপরাধ প্রতিরোধের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার, বিটিআরসি, আইবিএফসহ অন্য বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করে যাচ্ছে। সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার উদ্যোগ নিয়েছে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব গঠন করার। উল্লেখ্য, বিটিআরসি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পর্যবেক্ষণের জন্যে ইতোমধ্যে একটি মনিটরিং সেল গঠন করেছে।

পাশাপাশি একটি কার্যনির্বাহী দল তারা গঠন করেছে, যাদের ওপর শুধু সাইবার সিকিউরিটি কিভাবে বৃদ্ধিকরণ সম্ভব, তা নিয়েই পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়। ইনসাইট বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনও নিজ উদ্যোগে সাইবার নিরাপত্তা বৃদ্ধিকরণে অনেক কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছে এমন এ্যাসোসিয়েশন, ফোরাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি এরা নিজ উদ্যোগে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাইবার নিরাপত্তাজনিত ট্রেনিং দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই ট্রেনিং আগামী বছরের প্রথম থেকে শুরু করার কথা রয়েছে। উল্লেখ্য, সাইবার অপরাধ অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কিত একটি অপরাধ, যেখানে অপরাধী প্রযুক্তির ব্যাপারে প্রচুর জ্ঞান রাখে। তাই আমাদেরও এই অপরাধীদের মোকাবেলা করার জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে সময় লাগছে। তবে দেশের সামাজিক গণমাধ্যম ব্যতিরেকেও সবচাইতে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ। বাংলাদেশে এখনও ইন্টারনেট ব্যাংকিং খুব বেশি জনপ্রিয়তা পায়নি। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে ইন্টারনেট ব্যাংকিং শুরু করা হলে এর ওপরে হামলা করতে পারে সাইবার অপরাধীরা। বাংলাদেশ সরকার তার কিছু নীতিমালাতেও পরিবর্তন আনা শুরু করেছে। সেক্ষেত্রে সাইবার অপরাধীদের প্রতিহত করার মতো যে কোন পদক্ষেপ অতি দ্রুত নেয়া সম্ভব হবে বলে আশা পোষণ করা যায়।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক

ইনসাইট বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন