১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাইবারে অনিরাপদ নারী

  • আইরিন সুলতানা

প্রযুক্তি হয়ে উঠছে উন্নয়ন যাত্রার মেরুদণ্ড। তাই বাংলাদেশের সাফল্যের রোডম্যাপ চিত্রিত হয় ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপে। নাগরিক সেবা অথবা তথ্য, এমনকি গণতন্ত্রও এখন অনলাইনে। সরকার ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়াতে উদ্যোগী। বিটিআরসির পরিসংখ্যান মতে বাংলাদেশে সচল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫ কোটি ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে শতকরা ৯৭ জন মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। ইন্টারনেটে ইমেইল বিনিময়, অনলাইন পত্রিকা পাঠ ছাড়াও সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলোর ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ফেসবুক, ইউটিউব, বিভিন্ন বাংলা ব্লগ এসব মাধ্যমে অনলাইন ইউজারদের রয়েছে নিয়মিত আনাগোনা ও অংশগ্রহণ। বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা অবিশ্বাস্য গতিতে বেড়ে ৩ কোটি ছুঁয়েছে। এদেশে জন্মহারকে ছাপিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা। বলা হয়ে থাকে প্রতি ১২ সেকেন্ডে জন্মাচ্ছে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী।

স্বভাবতই ফেসবুকে ব্যবহারকারী হিসেবে পুরুষের প্রাধান্য রয়েছে। গত বছর ২২ লাখ নারী ফেসবুক ব্যবহারকারীর পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে পত্রিকাগুলোতে। এ বছর এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে বিপুলভাবে। কিন্তু কে নারী, কে পুরুষ এ নির্ণয় সব সময় কি সহজ হয় ফেসবুকে? বস্তুত ফেসবুক এ্যাকাউন্ট তৈরি করা সম্ভব বলে নারী পরিচয়ে থাকা পুরুষটি দিব্যি দিনের পর দিন ফেসবুকে মজা নিতে, কিংবা অসৎ উদ্দেশ্যে ঘুরে বেড়াতে পারেন। ভুয়া এ্যাকাউন্ট তৈরি ফেসবুক নীতিমালার পরিপন্থী। ক্যালিফোর্নিয়ায় আইন করে অন্যের নামে ভুয়া ফেসবুক এ্যাকাউন্ট তৈরি এবং ভুয়া এ্যাকাউন্ট থেকে কোন ব্যক্তি হয়রানিমূলক আচরণকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ব্যক্তি হয়রানি একটি আমলযোগ্য অপরাধ হতে পারে, যদি এর মাধ্যমে লিঙ্গবৈষম্য, ব্ল্যাকমেইলিং, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন ঘটে থাকে। আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারী আজকে যতই অগ্রসর হোক না কেন, সমাজের চারপাশে নারী যেমন আক্রমণের সহজ শিকার, সাইবার জগতেও তাই। অনলাইনে জনপ্রিয় মাধ্যম ফেসবুকে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া মেয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়গামী তরুণী থেকে শুরু করে গৃহিণী, পেশাজীবী নারীও রয়েছে। রয়েছে সোশ্যাল এ্যাকটিভিস্ট, সাংবাদিক, লেখক, ব্যবসায়ী এবং সেলেব্রিটি নারীও। নারীরা ফেসবুকে, অনলাইনে, ব্লগে নিজের চিন্তা, অভিরুচি, পছন্দ-অপছন্দ, পরিকল্পনা জানান দিচ্ছে। সমস্যা হলো, সমাজ যেখানে পশ্চাদমুখী, সেখানে ফেসবুকের চেহারা যতই আধুনিক হোক না কেন, সমাজের সেই সংকীর্ণমনা মানুষগুলোই তো বিচরণ করে ফেসবুকে। স্বনামে ও ভুয়া এ্যাকাউন্ট থেকে তাই নারীর সঙ্গে হয় কদর্যপূর্ণ অসদাচরণ। থ্রিজির যুগে উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধা নিয়ে নারীর গোপন ভিডিও ছেড়ে দেয়া হয়। নারীর ছবি বিকৃত করে ছাড়া হয় বিভিন্ন সাইটে। অশ্লীল শব্দচয়নে মন্তব্য করা হয় নারীকে নিয়ে। নারীর অজান্তে তার ফোন নম্বর ফেসবুকে প্রকাশ করে তাকে সামাজিকভাবে নিপীড়ন করা হয়। কিছু মানহীন অনলাইন পত্রিকা নারীকে নিয়ে অহরহ যৌনাত্মক সংবাদ শিরোনাম করে সেগুলো ছড়িয়ে দিচ্ছে ফেসবুকে। অর্থাৎ নারীর প্রতি পারিবারিক ও সামাজিক নির্যাতনের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে সাইবার নির্যাতন। অনেক নারীর পরিবার এসব বিবেচনা করে এখন আর চান না তাদের কন্যা ফেসবুকে বিচরণ করুক। ডিজিটাল বাংলাদেশ কি নারীর জন্য সাইবার জগতকে অভয়ারণ্য করতে প্রস্তুত?

রাষ্ট্রকে নাগরিকের অধিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনী সহায়তা ও কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সরকার তথ্যপ্রযুক্তি আইন করেছে। সাইবার নিরাপত্তা আইনের খসড়া করেছে। কিন্তু সাইবারে নারীকে নিরাপত্তা সেবা দিতে রাষ্ট্র কি বিশেষ সংযোজন করেছে এসব আইনে? বস্তুত এক পর্নোগ্রাফি আইন ছাড়া সাইবারে নারী নিরাপত্তাবিষয়ক তেমন কোন আইনী কাঠামো অনুপস্থিত ও ঘোলাটে।

পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২-এর আওতায় যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী ‘সাময়িকী’ একটি উপকরণ হিসেবে গণ্য হয়েছে। অথচ অনলাইনের চটিপত্রিকাগুলোকে আইনের আওতায় আনার কোন তৎপরতা নেই। সাইবার নিরাপত্তা আইনের খসড়ায় অপরাধের বিভিন্ন ধরন উল্লেখ থাকলেও অনলাইনে নারীকে যৌন হয়রানি করার কোন সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়নি। এক অংশে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনকেই টেনে আনা হয়েছে কেবল। পর্নো উৎপাদনে নারীর জ্ঞাতসারে অথবা অজ্ঞাতসারে স্থিরচিত্র, ভিডিওচিত্র ধারণ করলে তা অপরাধ হবে। নারীর সঙ্গে যৌন হয়রানির আচরণগুলো সর্বক্ষেত্রে ‘পর্নোগ্রাফি’ শব্দ দিয়ে বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। নারী অনলাইনে লিঙ্গবৈষম্যের শিকার হয়। হিন্দু নারী হিসেবে সাইবারে নিগৃহীত হয়। আদিবাসী নারী হিসেবে ইন্টারনেটে অবমাননার শিকার হয়। সামাজিক অপরাধ আমলে নিতে নারী নির্যাতন দমন আইন অনুরূপ সাইবার নিরাপত্তা আইনের আওতায় ‘সাইবারে নারী নির্যাতন দমন’ শীর্ষক একটি অধ্যায় সংযোজন করলে আইনটির মাধ্যমে নাগরিক হিসেবে নারীর আইনী অধিকার বাস্তবায়নের অভিপ্রায় নিশ্চিত হবে।

সাইবার নিরাপত্তা আইনের খসড়ায় ধারা ১৪ এর (গ) ও (ঘ) গোপনীয়তা লঙ্ঘনের শাস্তি বর্ণিত আছে। এখানে গোপনীয়তা লঙ্ঘন হিসেবে নারীর শরীরের ব্যক্তিগত অঙ্গ ও ব্যক্তিগত মুহূর্ত অজান্তে ধারণকে ধর্তব্যে আনা হয়েছে। এই ধারাটি ভিকটিম নারীর জন্য সহায়ক হবে। কিন্তু ধারাগুলো বিচ্ছিন্নভাবে থাকায়, বিশেষভাবে নারীর প্রতি হওয়া সাইবার অপরাধগুলোকে সম্পর্কযুক্ত করতে বেগ পেতে হয়। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং, ওয়েবসাইট, মোবাইল ডিভাইস, ভিডিওসাইট এ রকম কিছু আধুনিক মাধ্যমের নামোল্লেখ থাকলে আইনের আধুনিকায়ন বোধগম্য হতো। এতে এ ধরনের মাধ্যমে সংঘটিত হওয়া অপরাধকে সুস্পষ্টভাবে আইনের সংজ্ঞা ও ধারার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করা যায়। তাতে আইনের অপব্যবহার ও জটিলতাও এড়ানো যায়।

সচেতনতা সৃষ্টিতে সব নারী ও ভিকটিম নারীকে আসলে জানতে হবে নারী হওয়ার কারণে সাইবারে তার ওপর যে কোন আক্রমণ হলে আইন কিভাবে তাকে সহায়তা দিতে পারে। নারীকে জানানোর দায়িত্ব সরকারের। নারী কখনও সাইবারে যৌন হয়রানি অথবা বৈষম্যের শিকার হলে তার কী ধরনের প্রমাণাদি সংরক্ষণ করা উচিত? এ ব্যাপারে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালু করা জরুরি। ডিজিটাল বাংলাদেশে নারীও অবাধে সাইবার জগতে বিচরণ করবে, এই স্বাচ্ছন্দ্য দিতে সকল পরিবারকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

এই সাইবার অপরাধ ও আইন মনিটর করতে একটি ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব আবশ্যক। যেখানে মামলা ও অপরাধের ধরন অনুযায়ী একেকটা ঘটনা নথিভুক্ত হবে। কেস স্টাডি হবে। তদন্ত লিপিবদ্ধ হবে। একটি ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবই হতে পারে সেই তথ্যকেন্দ্র, যেখান থেকে আগামীতে সাইবারে নারীর প্রতি আক্রমণের অপরাধমূলক ঘটনাগুলোর পরিসংখ্যান ও আইনী পরিণতি জানা সম্ভব হবে যথাযথভাবে। তখনই মূলত নারী অনুভব করতে পারবে সাইবারে নারীর সহায়তায় রয়েছে সাইবার আইন। তখনই নারী আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ইন্টারনেটে যুক্ত হয়ে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে জানাবে, রাষ্ট্র নিশ্চিত করেছে সাইবারে নারীর মুক্ত পদচারণা।

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তি গবেষক