২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইতালীয় নাগরিকের খুনীদের খুঁজে বের করা হবে

  • নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৯ সালের আগে কোন আগাম নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসবাদের সমর্থক যারা বাংলাদেশের অগ্রগতি ও উন্নয়ন চায় না, তারাই নির্ধারিত সময়ের আগে সাধারণ নির্বাচন চাইতে পারে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যতদিন ক্ষমতায় থাকবে, ততদিনই বাংলাদেশের উন্নয়ন গতি পাবে। যারা এই উন্নয়ন চায় না, তারা আগাম নির্বাচনের জন্য হৈ চৈ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ ব্যাপারে কারও উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিউইয়র্কে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় (স্থানীয় সময়) জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭০তম অধিবেশনে যোগদানের জন্য নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর সফরের ফলাফল সম্পর্কে অবহিত করার জন্য এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী সদস্যবৃন্দ, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. আবদুল মোমেন ও প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম এ সময় উপস্থিত ছিলেন। জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিষয় ছাড়াও সংবাদ সম্মেলনে প্রবাসী সাংবাদিকরা বর্তমান রাজনৈতিক ও স্থানীয় ইস্যু নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। খবর বাসস’র।

নিউইয়র্কে তাঁর এ সফরকে সফল অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত ২০১৫ পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা সদস্য দেশগুলো বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলোর টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি অত্যন্ত ‘গণমুখী’ লক্ষ্য। এছাড়াও, তিনি ভারত, জাপান, নেদারল্যান্ডস ও চীনের সঙ্গে অত্যন্ত সফল দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন।

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গীবাদের ঝুঁকির বিষয়টি স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা দেশকে হত্যা ও ক্যুর রাজনীতিতে নিমজ্জিত করেছিল, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশ হত্যা ও ক্যুর রাজনীতিতে ঘুরপাক খেয়েছে। সরকার দেশকে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গীবাদ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে।

তিনি বলেন, নিশ্চয়ই যুদ্ধাপরাধী ও বঙ্গবন্ধুর খুনীরা দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে এবং তারা অবিরাম তাই করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, এই অশুভ তৎপরতার বিরুদ্ধে সরকার দেশে একটি শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি বজায় রাখার জন্য সব ধরনের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।

সম্প্রতি ঢাকায় একজন ইতালিয়ান নাগরিক খুন হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার ঘৃণ্য এই খুনের সঙ্গে জড়িত দুর্বৃত্তদের খুঁজে বের করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই দুঃখজনক খুনের ঘটনা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর বিবৃতি প্রদানকারী একজন বিএনপি নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত।

শেখ হাসিনা বলেন, কেবল বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের সর্বত্রই কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন, এমনকি নিউইয়র্ক সিটিতেই প্রকাশ্য দিবালোকে আওয়ামী লীগের দুজন নেতাকে খুন করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, সরকার সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গীবাদ রোধ করার লক্ষ্যে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। কিন্তু, বিএনপি-জামায়াত জোট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে মানুষ হত্যার পথ বেছে নিয়েছিল।

বিএনপি-জামায়াত ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হত্যার রাজনীতি শুরু করে এবং তারা ২০১৪ সাল পর্যন্ত তা অব্যাহত রেখেছিল। তারা ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সন্ত্রাস চালিয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ অবশ্যই পুড়িয়ে মানুষ মারার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচার করবে। কেউ রেহাই পাবে না। তাদের অবস্থান যাই হোক না কেন, আমরা তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি করব।

এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংসদীয় ব্যবস্থায় সংসদে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হচ্ছে বিরোধী দল। এটি হচ্ছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। কিন্তু আমাদের দেশে আরেকটি দল রয়েছে যারা বিগত নির্বাচনে অংশ নেয়নি এবং জঙ্গীবাদী ও মানুষ মারার কর্মকা-ে লিপ্ত হয়েছিল। তারা কখনও কখনও পরিবহনে অগ্নিসংযোগ এবং শিশু ও নারীসহ মানুষ হত্যা করে তাদের অস্তিত্ব প্রকাশ করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনি যদি গণতন্ত্র, বিশেষ করে সংসদীয় পদ্ধতিতে বিশ্বাস করেন, তবে সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম দলকে বিরোধী দল হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আমাদের দেশের ক্ষেত্রে বিএনপি-জামায়াত নিজেদের রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচয় দিলেও তারা মূলত জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদী সংগঠন। জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে কে বিরোধী দল।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে এমন মানুষ আছে যারা মানুষ হত্যা করে যে কোন অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। তবে অস্বাভাবিক অবস্থার জন্য দায়ী খুনীদের বিচার হবেই। ঢাকায় ইতালির একজন নাগরিকের হত্যাকা-ে আইএস’র জড়িত থাকা সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, শিকাগো থেকে এক বার্তায় এই হত্যাকা-ে আইএস সম্পৃক্ত বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে এখনও কেউ এ দাবি করেনি। আমাদের গোয়েন্দাদের কাছে এমন কোন তথ্য নেই।

এই হত্যাকা-ের পেছনে অবশ্যই শক্তিশালী এক চক্র রয়েছে, তারা একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায়- এ কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গীবাদ কেবল বাংলাদেশে নয়, এটা এখন বৈশ্বিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ শান্তিতে বিশ্বাসী- জঙ্গীবাদে নয়। আমরা বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের উত্থান চাই না। একজন বিদেশী নাগরিকের হত্যাকা-ে আমরা খুবই ব্যথিত। এটা দুঃখজনক ঘটনা।

একজন ইতালীয় নাগরিকের হত্যাকা-ের পর ঢাকাস্থ কয়েকটি দূতাবাস ঢাকায় অবস্থানকারী তাদের নাগরিকদের প্রতি রেড এ্যালার্ট জারির ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, রেড এ্যালার্টের কোন যৌক্তিকতা নেই। নাজমুল যখন নিউইয়র্কে নিহত হয়েছিলেন, সে সময় আমরা এ ধরনের কোন রেড এ্যালার্ট দেখিনি। তিনি বলেন, নিউইয়র্কে কয়েক বছর আগে দু’জন বাংলাদেশের নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার রেড এ্যালার্ট জারি করেনি। অন্য দূতাবাসগুলোও তাদের নাগরিকদের প্রতি এ ধরনের কোন এ্যালার্ট জারি করেনি। আমি জানি না ঢাকায় দূতাবাসগুলো কেন এমনটা করল।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের নাগরিকদের জন্য রেড এ্যালার্ট দেয়ার কি কারণ থাকতে পারে। আমি জানি না, তবে ওই ঘটনার পরপরই বিএনপি’র একজন নেতার সন্দেহজনক তৎপরতা দেখেছি। আমি মনে করি, ওই বিএনপি নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এ হত্যাকা-ের রহস্যের উন্মোচন হতে পারে। দেশে ফেরার পর এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেব।

তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট টিম কেন বাংলাদেশ সফরে আসছে না, তা এখনও পরিষ্কার নয়। এ নিয়ে উভয় পক্ষ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

শেখ হাসিনা বলেন, অতীতে আমরা এ ধরনের ঘটনা দেখেছি। পাকিস্তান ও ভারতীয় দল বাংলাদেশে খেলেছে। এমন কি বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আয়োজনও হয়েছিল এখানে। এটা সম্পূর্ণভাবে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাপার যে কেন তারা বাংলাদেশে সফরে না আসার আকস্মিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ অতীতে পূর্ণ নিরাপত্তার সঙ্গে অনেক ক্রীড়ানুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এসব অনুষ্ঠানে অনাকাক্সিক্ষত কোন ঘটনা ঘটেনি। তবে অনেক দেশেই তা ঘটেছে- কিন্তু বাংলাদেশে নয়। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো যথেষ্ট দক্ষতা রয়েছে। এ ব্যাপারে আমাদের জনগণও খুবই সচেতন।

ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করেছে। প্রত্যেক ধর্মের মানুষ তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করবে। ইসলামও একথা বলে।

তিনি বলেন, কেউ ধর্মীয় রীতি-নীতি অস্বীকার করলে এটা তার নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু কেউ ধর্ম বিশ্বাসীদের (আস্তিক) অনুভূতিতে আঘাত দিতে পারে না। যদি কারও ধর্মে বিশ্বাস না থাকে, তবে তিনি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করবেন না। কিন্তু অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া অগ্রহণযোগ্য। কারও এটা করা উচিত নয়। আমার চোখে এটা জঘন্য কাজ। শেখ হাসিনা বলেন, সরকার এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলার পথ খুঁজছে। অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার ঘটনা চলতে থাকলে তা হবে একজন মানুষের সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন। আমাদের ধর্ম অবমাননা বন্ধে ব্যবস্থা নিতেই হবে। অন্যথায় এমন ঘটনা অব্যাহত থাকবে।

এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বেগম খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমান দুর্নীতি ও গ্রেনেড হামলা মামলায় শাস্তি পাবেন কিনা, তা নির্ধারণ করবে আদালত। তবে তিনি একথা বলেন যে, তিনি সব সময় অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের শাস্তির পক্ষে।

এসডিজি বাস্তবায়নের উপায় খুঁজে বের করার আহ্বান ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বছরের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি)Ñ২০৩০ কে একটি সম্মিলিত যাত্রা হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এটি বাস্তবায়নের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। শেখ হাসিনা বলেন, এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য সরকারী ও বেসরকারী এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনসহ সকল উৎস থেকে আমাদের সম্পদ সংগ্রহ করার প্রয়োজন হবে। অন্যথায় ওডিএ’র লক্ষ্য পূরণ করতে শুরু থেকেই খুবই সমস্যা হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে আয়োজিত এমডিজি ও এসডিজি’র ওপর এক উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন। ৭০তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের পাশাপাশি বাংলাদেশের উদ্যোগে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। শেখ হাসিনা বলেছেন, এমডিজি অর্র্জনের মতো এসডিজি’ও অর্জন করে বাংলাদেশ আরও একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ যাত্রায় কেউ পিছিয়ে থাকবে না। আমরা বাংলাদেশকে একটি প্রগতিশীল, শান্তিপূর্ণ এবং সমৃদ্ধশালী দেশ গড়ার প্রত্যাশা করি। তিনি বলেন, প্রযুক্তি এবং উন্নয়ন ও জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশের জন্য ব্যাপক সমর্থন প্রয়োজন। বাংলাদেশে বিশেষ করে স্বাস্থ্য, কৃষি, জ্বালানি ও পরিবহনের মতো সেক্টরগুলোতে পরিবেশ উপযোগী প্রযুক্তি প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে নেদারল্যান্ডসের রাজা উইলিয়াম আলোক্সান্ডার, বেনিন প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট বোনি ইয়া’ই, সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন এল ফেভেন, সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্ট মোগেনস লেকেটোফট, ইউএনডিপি’র প্রশাসক মিস হেলেন ক্লার্ক, ইউএন আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল এবং জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতিনিধি গায়ান চন্দ্র আচারিয়া এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত মাহমুদ মহিউদ্দিন বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে একটি উন্নয়ন বিস্ময় দেশ হিসেবে উল্লেখ করায় বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় অনেক বেশি অগ্রগতি হয়েছে। অনেক উন্নয়ন চিন্তাবিদদের ধারণা বাংলাদেশ ভুল প্রমাণিত করেছে।

প্রধানমন্ত্রী এমডিজি অর্জনের সাফল্যের কারণ সম্পর্কে বলেন, এমডিজি বাস্তবায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশ এমডিজি’র কাঠামোর আলোকে দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সমন্বয় করেছিল। আমরা চেয়েছিলাম, আমাদের জাতীয় প্রত্যাশা পূরণে এমডিজি’র লক্ষ্য যেন আমাদের সহায়তা করতে পারে। এক্ষেত্রে আমরা আমাদের জাতীয় সম্পদ সংগ্রহ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছি। আমাদের জনগণকে ক্ষমতায়ন করেছি। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক ভিত্তির মাধ্যমে অংশীদারিত্বে সম্পৃক্ত করেছি। শেখ হাসিনা বলেন, এমডিজি’র সময় বাংলাদেশে চরম দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে। মৌলিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বিগত ছয় বছরে বৈশ্বিক মন্দাবস্থা সত্ত্বেও আমাদের জিডিপি ৬ শতাংশের বেশি ছিল।

শেখ হাসিনা বলেন, জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করাই আমাদের অঙ্গীকার। আমরা জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের, অটিজম এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধীসহ অতিদরিদ্র লোকদের রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনতান্ত্রিক সুবিধা পেতে বাংলাদেশ তরুণ প্রজন্মের দক্ষতা উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। সরকার সকলের জন্য বিশেষ করে নারীর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের প্রতি অধিক গুরুত্ব দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে তিনি নারীর কল্যাণে গৃহীত কর্মপরিকল্পনার দুটি উদাহরণের কথা উল্লেখ করেন। এর একটি হচ্ছে দরিদ্র পরিবারের ১৩.৪ মিলিয়ন শিক্ষার্থীকে বৃত্তি প্রদান, এদের মধ্যে ৭৫ ভাগ মেয়ে এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের লেখাপড়া অবৈতনিক করে দেয়া। এতে স্কুল ঝরেপড়া উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি সরকার এ বছর ১ জানুয়ারিতে সারাদেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৩৪ মিলিয়নের বেশি বই বিতরণ করেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ এজেন্ডা-২০৩০ এর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। আমরা এমডিজি’র অর্জন ধরে রাখতে চাই। এর সাফল্য দিয়ে আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে চাই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সকল জাতীয় পরিকল্পনায় জনগণকে সম্পৃক্ত করেছে। এর অংশ হিসেবে পরিকল্পনা কমিশন নতুন বৈশ্বিক এজেন্ডা নিয়ে পরবর্তী পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (২০১৬-২০২০) প্রণয়ন করছে। তিনি এই পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন ও সমন্বয় নিশ্চিত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধানে সমন্বয় কৌশল গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন।

ইতালিয়ান নাগরিকের খুনীদের অবশ্যই খুঁজে বের করা হবে ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকায় ইতালিয়ান নাগরিকের হত্যাকা-কে মর্মবেদনাদায়ক বলে উল্লেখ করে দুষ্কৃতকারীদের খুঁজে বের করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। নিউইয়র্কে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় (স্থানীয় সময়) জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, একজন বিদেশী নাগরিক খুন হওয়ার জন্য আমরা খুবই দুঃখিত। এটি একটি মর্মবেদনাদায়ক ঘটনা। আমাদের সরকার ঘৃণ্য এ খুনের ঘটনায় জড়িত দুষ্কৃতকারীদের খুঁজে বের করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন, এ হত্যাকা- নিয়ে বিভ্রান্তিকর বিবৃতি প্রদানকারী একজন বিএনপি নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

তিনি আরও বলেন, এ খুনের ঘটনার পর একজন বিএনপি নেতার সন্দেহজনক তৎপরতা লক্ষ্য করেছি। বিএনপি নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে খুনের পেছনের ক্লু বেরিয়ে আসবে। দেশে ফিরে যাওয়ার পর আমি ব্যবস্থা নেব। ঢাকায় কয়েকটি কূটনৈতিক মিশন একজন বিদেশী নাগরিক খুন হওয়ার পর তাদের নাগরিকদের জন্য ‘রেড এলার্ট’ জারি করায় শেখ হাসিনা বিস্ময় প্রকাশ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, রেড এলার্ট জারি করার কোন যৌক্তিকতা নেই। কয়েক বছর আগে নিউইয়র্কে দুইজন বাংলাদেশী নাগরিক খুন হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র সরকার কোন রেড এলার্ট জারি করেনি। আমাদের কূটনৈতিক মিশনগুলোও তাদের নাগরিকদের জন্য এ ধরনের কোন এলার্ট জারি করেনি। আমি জানি না, ঢাকায় কূটনৈতিক মিশনগুলো কেন তা করেছে। ঢাকায় ইতালির নাগরিক খুন হওয়ার সঙ্গে আইএস লিঙ্ক থাকার খবর প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, শিকাগো থেকে একটি বার্তায় খুনের সঙ্গে আইএস লিঙ্ক থাকার দাবি করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে এখনও পর্যন্ত কেউ তা দাবি করেনি। আমাদের গোয়েন্দাদের হাতে এ ধরনের কোন তথ্য নেই।

অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট টিমের সফর বাতিলের বিষয়ে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার এখনও স্পষ্ট নয় কেন অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট টিম বাংলাদেশে আসছে না। শেখ হাসিনা বলেন, অতীতে আমরা এ ধরনের পরিস্থিতি দেখেছি। পাকিস্তান ও ভারতের টিম বাংলাদেশে খেলেছে। এমনকি বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলাও এখানে আয়োজন করা হয়েছে। এটি নিতান্তই অস্ট্রেলিয়ার ব্যাপার যে, তারা কেন হঠাৎ করে বাংলাদেশে না আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ পূর্ণ নিরাপত্তা নিয়ে অতীতে বেশ কয়েকটি ক্রীড়া অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে এবং কোন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেনি। অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা অনেক দেশে ঘটেছে, কিন্তু বাংলাদেশে ঘটেনি। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যথেষ্ঠ অভিজ্ঞতা আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ও সংশ্লিষ্টদের রয়েছে এবং আমাদের জনগণও এ ব্যাপারে খুবই সচেতন।

ঢাকার গুলশান এলাকায় সোমবার রাতে অজ্ঞাত বন্দুকধারীদের গুলিতে ইতালিয়ান নাগরিক তাভেলা সাসের (৫০) নিহত হন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ঢাকায় বাসস’র সঙ্গে আলাপকালে বলেন, আমরা নিশ্চিত, ইতালিয়ান নাগরিককে পূর্ব-পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। সরকার ও দেশের বিরুদ্ধে এটি একটি গভীর ষড়যন্ত্র।

তিনি বলেন, হত্যার মূল পরিকল্পনাকারীরা পেশাদার খুনী ভাড়া করে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনা হবে। এ হত্যাকা-ের তদন্তের জন্য বাংলাদেশ পুলিশ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবি’র যুগ্মকমিশনার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম কমিটির প্রধান। তদন্ত কমিটিকে সহায়তা করার জন্য সিআইডি’র বিশেষ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রেজাউল হায়দারের নেতৃত্বে একটি সাপোর্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে।

বাংলাদেশে ব্যাপকভিত্তিক অর্থায়ন কর্মসূচী চালুর আগ্রহ ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দারিদ্র্য বিমোচন ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচীর জন্য বাংলাদেশে ব্যাপকভিত্তিক অর্থায়ন কর্মসূচী চালু করতে তার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতিসংঘ সদর দফতরে নেদারল্যান্ডসের রানী ম্যাক্সিমার সঙ্গে এক বৈঠককালে এ আগ্রহ প্রকাশ করেন।

জাতিসংঘ মহাসচিবের উন্নয়ন সংক্রান্ত ব্যাপকভিত্তিক অর্থায়ন বিষয়ক স্পেশাল এ্যাডভোকেট রানী ম্যাক্সিমা এ অর্থায়ন কর্মসূচী সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবহিত করেন। রানী বলেন, তিনি ব্যাপকভিত্তিক অর্থায়ন কর্মসূচী সংক্রান্ত একটি কৌশল চালু করতে যাচ্ছেন এবং তখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি চান।

শেখ হাসিনা বৈঠককালে খাদ্য নিরাপত্তা, স্কুলের পাঠ্যবই বিতরণ, ইন্টারনেট সংযোগ এবং সামাজিক নিরাপত্তা বলয় কর্মসূচীসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন সম্পর্কে রানীকে অবহিত করেন। প্রধানমন্ত্রী নদী ড্রেজিং ও জলবায়ু সহিষ্ণুতাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচীতে রানীর সহায়তা কামনা করেন। শেখ হাসিনা বলেন, নেদারল্যান্ডস ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে সাহায্য করতে পারে। জবাবে রানী বলেন, ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নের জন্য নেদারল্যান্ডস আরও কর্মসূচী গ্রহণ করবে।