২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইতালীয় নাগরিক তাভেলা হত্যাকাণ্ড তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই

  • খুনীদের শনাক্ত করতে সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা চলছে

গাফফার খান চৌধুরী ॥ গত ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার গুলশান কূটনৈতিক পাড়ায় ইতালীয় নাগরিক সিজার তাভেলা হত্যাকা-ের তদন্তে দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি নেই। হত্যাকারীদের কেউ গ্রেফতার হয়নি। খুনীদের শনাক্ত করতে অন্তত ডজনখানেক সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজের পর্যালোচনা চলছে। এনজিওটির বার্ষিক প্রতিবেদনসহ নানা দলিল জব্দ করা হয়েছে। দেশী-বিদেশী মিলিয়ে এনজিওটির বাংলাদেশে কর্মরত ৮০ জনের মধ্যে ৬৬ জনের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করে তার পর্যালোচনা চলছে। বার্ষিক প্রতিবেদন এবং প্রকল্পের আর্থিক লেনদেনের বিষয়াদি পর্যালোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনজিও ব্যুরোর মাধ্যমে এনজিওটির আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে তথ্য চাওয়া হবে। সিজারের ফ্ল্যাটে দেশী-বিদেশী নানা ধরনের মানুষের সন্দেহভাজন যাতায়াত ছিল।

এদিকে সিজার হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ঢাকার ইতালি দূতাবাস রেড এ্যালার্ট জারি করেছে। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্রাসেলস অফিস থেকে এ ঘটনার দ্রুত বিচার দাবি করা হয়েছে। নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে কূটনৈতিক পাড়ায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ইতালীয় নাগরিক হত্যাকা-ের সঙ্গে আইএসের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেছেন, জাতিকে হেয় করতেই বিদেশী হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটতে পারে। সিজার হত্যার পর বিভিন্ন দেশ থেকে যেসব নির্দেশনা আসছে তা মোটেই কাম্য নয়।

ঘটনার দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে গুলশান-২ নম্বরের ৯০ নম্বর সড়কে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমানের সরকারী বাসভবনের প্রাচীর দেয়ালের দক্ষিণ পাশে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন আইসিসিও কো-অপারেশন বাংলাদেশের প্রকল্প ব্যবস্থাপক সিজার তাভেলা (৫০)। তিনি নেদারল্যান্ডসভিত্তিক এনজিও আইসিসিও কো-অপারেশনের ‘প্রফিটেবল অপরচ্যুনিটিজ ফর ফুড সিকিউরিটি’ কর্মসূচীর প্রকল্প ব্যবস্থাপক ছিলেন। এনজিওটি বাংলাদেশে পানি, সেনিটেশন, রিফিওজি সমস্যা ও পুনর্বাসনসহ নানা সমাজসেবামূলক কাজ করছে।

মামলাটির তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পর থেকে অন্তত ডজনখানেক সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। তার পর্যালোচনা চলছে। তবে হত্যাকারীরা এখনও শনাক্ত হয়নি। সিজারকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে চাপে রাখতে এমন হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটানো হতে পারে। পাশাপাশি এনজিওটির আর্থিক লেনদেন বা এনজিওর কোন পদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের সূত্র ধরেও হত্যাকা-ের ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে।

এদিকে বুধবার সকালে গুলশান-১ এর ৩০ নম্বর সড়কের ১৬ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলায় এনজিওটির পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উর্ধতন কর্মকর্তাদের দীর্ঘ বৈঠক হয়। বৈঠকে এনজিওটির তরফ থেকে হত্যাকা-ের তদন্তে সব ধরনের সহযোগিতা করার নিশ্চয়তা দেয়া হয়। তদন্তকারী সংস্থা এনজিওটির দফতর থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে। সংগৃহিত কাগজপত্রের মধ্যে এনজিওটির বার্ষিক প্রতিবেদন ছাড়াও আর্থিক লেনদেনের নানা কাগজপত্র রয়েছে। এনজিওটি ৬৬ জন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ডিবির হাতে তুলে দিয়েছে। যেসব তথ্যের পর্যালোচনা চলছে। আর্থিক লেনদেনের বিষয়াদি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে এনজিওটির তরফ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা না হলে, প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনজিও ব্যুরোর মাধ্যমে তথ্য চাওয়া হবে। এনজিওটির কার্যক্রম স্বাভাবিক কারণেই কিছুটা ভাটা পড়েছে।

তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে আরও জানা গেছে, নিহত সিজার জন্মস্থান ইতালির মিলান শহর থেকে চাকরি জীবন শুরু করেছিলেন। মিলান ও আফগানিস্তান ছাড়াও অন্তত ১০টি দেশে কাজ করেছেন। প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এনজিওতে কাজ করেছিলেন। কর্মজীবনে নানা শ্রেণী পেশার মানুষের সঙ্গে সিজারের সখ্যতা হয়। অনেকের সঙ্গে দীর্ঘ যোগাযোগও অব্যাহত ছিল।

চলতি বছরের ১৫ মে সিজার বাংলাদেশে আসেন। বাংলাদেশে আসার পরেও বিভিন্ন দেশের লোকের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল সিজারের। সিজার বসবাস করছিলেন গুলশান-২ নম্বরের ৫৪ নম্বর সড়কের ১১/বি নম্বর বাড়ির ৫/২ ফ্ল্যাটে। চলতি বছরের জুনে নার্জার নামে সিজারের এক বান্ধবী দুই সপ্তাহের জন্য বাংলাদেশে এসে একই ফ্ল্যাটে বসবাস করে যান। বর্তমানে ওই বান্ধবী তুর্কিমেনিস্তানে রয়েছেন।

নার্জার চলে যাওয়ার পর থেকে সিজারের ফ্ল্যাটে নানা ধরনের দেশী-বিদেশী মানুষের হরদম যাতায়াত ছিল। যদিও ওই ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে সন্দেহজনক বা আপত্তিকর তেমন কিছুই পাওয়া যায়নি। ইতালিতে সিজারের ১৬ বছর বয়সী এক কন্যা সন্তান রয়েছে। ২ বছর আগে স্ত্রীর সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে যায় সিজারের। মিলানেই বসবাস করছে একমাত্র মেয়ে। তার কাছেই সিজারের মরদেহ পাঠানোর কথা রয়েছে। যদিও বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সিজারের মরদেহ কবে নাগাদ ইতালিতে পাঠানো হবে বা আদৌ পাঠানো হবে কিনা সে বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। পুরো বিষয়টি বাংলাদেশস্থ ইতালীয় দূতাবাসের ওপর নির্ভর করছে।

সূত্র বলছে, ২০১৩ সালে এনজিওটি বাংলাদেশের এনজিও ব্যুরোর তালিকাভুক্ত হয়। যদিও ২০১২ সাল থেকেই ওই বাড়িতে এনজিওটি কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। সিজার মাসিক প্রায় ৯ লাখ টাকা বেতনে কর্মরত ছিলেন। তিনি আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সদস্য ছিলেন। প্রতিদিনের মতো স্কুলটির সুইমিং পুলে সাঁতার কেটে বাড়ি ফিরছিলেন। ২ যুবক সিজারকে ডাক দিয়ে মেহগিনি গাছের নিচে অন্ধকারে দাঁড় করানোর পর বাম পাঁজরে গুলি চালায়। হত্যাকারীরা ৮৩ নম্বর সড়কে রাখা একটি মোটরসাইকেলে করে তিন জনই পালিয়ে যায়। হত্যাকারীরা সিজারের কাছ থেকে কিছুই নেয়নি। ঘটনাস্থল থেকে জব্দকৃত সেভেন পয়েন্ট সিক্স ফাইভ বোরের ৩টি বুলেটের খোসার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। ২টি বুলেট শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায়। একটি বুলেট উদ্ধার হয়েছে। এ ব্যাপারে এনজিওটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি হেলেন ভান ডার বেক বাদী হয়ে ঘটনার রাতেই গুলশান মডেল থানায় অজ্ঞাত খুনীদের আসামি করে মামলা দায়ের করেন।

এদিকে বুধবার দুপুরে ঢাকায় ইতালির রাষ্ট্রদূত মারিয়ো পালমার সঙ্গে সাক্ষাতের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের বলেন, সিজার হত্যাকা-ে আইএস জড়িত নয়। যদিও ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পরই হত্যাকা-ের দায় স্বীকার করে আইএসের তরফ থেকে বিবৃতি দেয়া হয় বলে জঙ্গী হুমকি পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ‘সাইট ইন্টিলিজেন্স গ্রুপ’ জানায়। ইতালির রাষ্ট্রদূত সিজার হত্যাকা-ের পর বাংলাদেশের নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করেন। মন্ত্রী আরও বলেন, সিজার হত্যার পর কয়েকটি দেশ বাংলাদেশে অবস্থানরত তাদের নাগরিকদের সর্তক থাকার বিষয়ে যে রেড এলার্ট জারি করেছে তা দুঃখজনক। এমন কোন পরিস্থিতি বাংলাদেশে সৃষ্টি হয়নি।

এদিকে বিদেশী নাগরিক হত্যার ঘটনায় বিদেশী কূটনীতিকদের উদ্বেগ নিরসনে সরকারের তরফ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কূটনৈতিক জোনে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশে চলাফেরার বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে। ঢাকায় আমেরিকান ক্লাব ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশন্যাল স্কুল সাময়িকভাবে বন্ধও রাখা হয়েছে।

বুধবার বাংলাদেশের ইতালি দূতাবাস থেকে রেড নোটিস জারি করে তাদের নাগরিকদের চলাফেরায় সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেছে। দেশটির নাগরিকদের হোটেল, ক্লাব, ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, বিদেশী নাগরিকদের সমাগম হয় এমন স্থানে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। হামলার আশঙ্কা করে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে তাদের নাগরিকদের সতর্ক করায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। তিনি ঘটনাটি ‘অত্যন্ত দুঃখজনক’ বলেও মন্তব্য করেন। ইতালির প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।