২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

জন্ম ও পারিবারিক কথা

অবশেষে আমি আত্মজীবনী লিখতে বসেছি। অবশেষে বলছি এজন্য যে, আমি নিজের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা লিপিবদ্ধ করতে শুরু করি ১৯৪৮ সালে। বেশ কিছুদিন কিছু লেখালেখি করে সেই উদ্যোগে বিরতি পড়ে। ১৯৮৩ সালে আবার কিছু লিখতে বসি। তখন উপলক্ষ ছিল আমার আম্মার মৃত্যু। এর পরে ১৯৯৯ সালে আমি আমার উচ্চ বিদ্যালয়ে একটি রিইউনিয়নের আয়োজন করি। সেই রিইউনিয়নটি ছিল আমাদের সহপাঠী যারা ১৯৪৯ সালে সিলেট পাইলট স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা দেন, তাদের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে। পরবর্তী উদ্যোগ হয় ২০০০ সালে, যখন আমার আব্বার জন্ম শতবার্ষিকী সিলেট বার লাইব্রেরিতে উদ্্যাপিত হয়। সুতরাং বলা যেতে পারে, এই আত্মকথা লেখার জন্য আমার প্রস্তুতি যথেষ্ট। প্রথম যে উদ্যোগ নেই তখন কিন্তু সমাজে কেউকেটা হব, সেরকম কোন ধারণা ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল, অত্যন্ত সাদাসিধে আমার জীবনের বিভিন্ন ঘটনা লিপিবদ্ধ করা। তবে বিরাশিতে পদার্পণ করে এই উদ্যোগ অনেকটা দুঃসাহসী। কারণ যতই সুস্বাস্থ্যের বড়াই করি না কেন, বিস্মৃতি এখন স্বাভাবিক। তাছাড়া সমবয়সীদের সংখ্যা এতই কমে গেছে যে, কারও কাছ থেকে স্মৃতি জাগরূক করার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। সুতরাং ভুলত্রুটি হতে পারে জেনেই উদ্যোগটি নিচ্ছি। তাই কোথাও যদি সংশোধনের সুযোগ থাকে, সেই সুযোগটি নেবার জন্য সব বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী ও পাঠকদের কাছে রইলো সনির্বন্ধ অনুরোধ।

সিলেট একটি প্রাচীন জনপদ। মোটামুটি তিন হাজার বছরের পুরনো ইতিহাস হলো বর্তমানের বাংলাদেশ এবং তার নিকটস্থ কতিপয় ভারতীয় রাজ্যের। পনের শ’ বছর আগে যখন বাংলাভাষা রূপ নিতে থাকলো, তখনই শুরু হয় স্বতন্ত্র বাঙালী জাতিগোষ্ঠীর সূচনা। সিলেট তখন থেকেই বাংলাদেশের অংশবিশেষ।

এ দেশের সনাতনী ধর্ম ছিল হিন্দু ধর্ম। প্রায় ছয় শ’ খ্রিস্টাব্দ থেকে মুসলমানরা এ দেশে আসতে শুরু করে। খ্রিস্টানদের আগমন হয় আরও সাত শ’ বছর পরে। এটি খুবই আশ্চর্যের বিষয় যে, এখানে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্য বা উত্তর ভারত থেকে মুসলমানদের আগমনে সেটা হয়নি। সেটা মূলত হয়েছে ধর্ম প্রচারক সুফি এবং পীরদের প্রচেষ্টায়। সিলেটে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিশিষ্ট কারণ ছিল হযরত শাহজালালের ১৩০৩ সালে সিলেট বিজয়। তখন দিল্লীতে ছিল খিলজি রাজত্ব। হযরত শাহজালালের যুগের প্রায় দেড় শ’ বছর পরে সিলেটে আবির্ভূত হন শ্রীচৈতন্য এবং তার উদারপন্থী মনোভাব সম্ভবত মুসলিম সমাজের বিকাশকে সহজতর করে দেয়।

সিলেটে ১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি অর্থাৎ ১৩৪০ সালের ১১ মাঘ বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ৪টায় সিলেট মহানগরে ১নং ধোপাদীঘির পূর্ব পাড়ে আমার আব্বার বাড়িতে আমার জন্ম হয়। আমার আব্বা সেদিন প্রায় সেই সময়ে কলকাতা যাবার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তবে আমার আগমনের সম্ভাবনায় সেই ভ্রমণসূচি বাতিল হয়। আমার সব ভাইবোনের জন্ম হয়েছে নিজেদের বাড়িতে, কোন ক্লিনিক বা হাসপাতালে নয়। ডাক্তার ও দেশী আয়ার তত্ত্বাবধানে আমাদের সকলের জন্ম হয়েছে। আমার জন্ম বছরটি আমাদের দেশের জন্য খুব ভাল ছিল না। ভারত এবং নেপালে ঐ বছর একটি প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প হয়। সেই বছরেই সোভিয়েত রাশিয়ায় স্ট্যালিনের ভয়ঙ্কর শুদ্ধি অভিযান শুরু হয় এবং চার বছরব্যাপী এটি অব্যাহত থাকে। সবচেয়ে মারাত্মক ছিল ঐ বছরেই অফষড়ভ ঐরঃষবৎ জার্মানির সর্বময় কর্তা ঋঁযৎবৎ হয়ে দাঁড়ান। অন্যদিকে ভাল খবরের মধ্যে ছিল, চীনে মাও সেতুং-এর লং মার্চ সেই বছর শুরু হয়। নিউইয়র্কে ঘটা করে স্যান্টাক্লজের আগমন হয়। সোভিয়েত রাশিয়া অবশেষে প্রথম মহাযুদ্ধ শেষে যে লীগ অব নেশনস্্ স্থাপিত হয়, তাতে যোগদান করে। ঐ বছরেই প্রথমবারের মতো মার্কিন রাষ্ট্রপতি দক্ষিণ আমেরিকার কোন একটি দেশ ভ্রমণ করেন। সেই রাষ্ট্রপতি ছিলেন ফ্রেডারিক রুজভেল্ট এবং ভাগ্যবান দেশটি ছিল কলম্বিয়া। ঐ বছরই প্রথমবারের মতো ভারতের একজন মুসলমান জ্ঞানী ব্যক্তি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ. এফ. রহমান)। ঐ বছরেই সিলেটে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয় এবং সিলেট-শিলং রাস্তার উদ্বোধন হয়। আমার জন্মদিন যে কবি মাইকেল মধুসূদনেরও জন্মদিন, তা আমি খুঁজে পেতে বের করি আমার নবম জন্মদিনের আগেই। অবশ্য তিনি ছিলেন আমার ১১১ বছরের বড়।

আমার পিতা-মাতার বিয়ে হয় ১৯২৮ সালের ৭ নভেম্বরে। বিয়ে ঠিক হয়েছিল ১৯২৭ সালে, যখন আমার আব্বা ওকালতি করবেন বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। সে সময় আমার আম্মার দাদা মারা যাওয়ায় বিয়ে এক বছর পিছিয়ে যায়। আমার আব্বার জন্ম হয় ১৯০০ সালের ২ এপ্রিল। আমাদের কাছে এটা খুব মজার ব্যাপার ছিল যে, আব্বার বয়সের হিসাব খুব সহজেই করা যায়। আব্বা-আম্মার প্রথম সন্তান আমার বড় বোন আয়েশা খাতুনের (নিনা’র) জন্ম হয় আমার দাদাবাড়ি রায়নগরে ১৯২৯ সালে ২২ নভেম্বরে। আর আমার সর্বকনিষ্ঠ বোন রিও আজিজা খাতুনের জন্ম হয় ১৯৫৮ সালের ২৪ এপ্রিল। আমাদের দাদাবাড়িতে আমার বড় ভাই মরহুম আবু আহমদ আবদুল মুহসির জন্ম হয় ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৩২ সালে। আমার আব্বার বাড়িটি ধোপাদীঘির পূর্ব পাড়ে, যেটা এখন আমাদের বারো ভাইবোনের এজমালি বাড়ি এবং তাতে প্রত্যেকের হিস্যা সমান। এই সমান হিস্যার একটি ইতিহাস আছে। আমার দাদা ১৯৪৮ সালে একটি ওছিয়তনামা করে ছেলেমেয়েদের মধ্যে তার সম্পত্তি সমান ভাগে ভাগ করে দেন। এই কাহিনীটি কিছুক্ষণ পরেই বলছি।

বাংলাদেশে সিলেট মহানগরের ১ নম্বর ধোপাদীঘির পূর্ব পাড়ের এই বাড়িটি আমার আব্বা নির্মাণ করেন ১৯৩৩ সালে মোট ৬ হাজার টাকা খরচ করে। বাড়িটি মোটামুটি ছোটই ছিল। পাকা বাড়ি, টিনের চাল। বাড়িটিতে কামরা ছিল ৫টি এবং সামনে-পেছনে বারান্দা এবং সংলগ্ন একটি গোসলখানা, যাতে পানি সরবরাহের জন্য তখন কোন পাইপলাইন সংযোগ ছিল না। আর একটি ছিল পাক এবং খাবার ঘর। পাকঘরের মেঝে ছিল মাটির, চারপাশে বাঁশের বেড়া এবং ওপরে টিনের চাল। বেশ দূরে স্থাপিত ছিল পায়খানা। এই বাড়িটির এলাকা সম্ভবত এক বিঘার কিছু কম ছিল। এই বাড়িতে জন্মপ্রাপ্ত সন্তান আমি ছিলাম প্রথম। এর পরে এই বাড়িতে আরো এগারোটি ভাই-বোন জন্ম নেয়। অবশ্য ততদিনে বাড়িটিতে আরো কামরা ও ঘর যুক্ত হয়। আমরা ভাই-বোন ছিলাম চৌদ্দজন। তাদের মধ্যে একজন জন্মের এক মাসের মধ্যেই এবং আর এক ভাই ও বোন ইতিমধ্যে ইন্তেকাল করেছেন।

আমার বড় এক বোন এবং এক ভাই আগেই জন্মেছিলেন আমার দাদাবাড়ি রায়নগরে। রায়নগরে আমার দাদার বাড়িটি ছিল তার খরিদ করা একটি বাড়ি, যেটা রিচি সাহেবের বাংলা বলে প্রসিদ্ধ ছিল। ঐ বাড়িটি আমার দাদা রিচি সাহেবের বাঙালি উত্তরাধিকারীদের কাছ থেকে খরিদ করেন ১৯০৮ সালে। সেই বাড়িতে বহুদিন রিচি সাহেবের নামে একটি বাঁশের বেড়া, মাটির মেঝে এবং বাঁশের চালের বাংলা ছিল। সেই বাড়িতে জমি ছিল ১১ বিঘা এবং একটি সংলগ্ন গোরস্তানও ছিল। এই বাড়িটি আমার দাদা খরিদ করার পর প্রথম দিকে ভাড়ায় ছিল। আমার দাদা সেখানে নিজের জন্য একটি বেশ বড় বাড়ি নির্মাণ করেন ১৯২৮ সালে। তার এই বাড়িটিতে রিচি সাহেবের বাংলা আগের মতোই থেকে যায়। কিন্তু তিনি এর অতিরিক্ত আরও ৪টি ঘর নির্মাণ করেন। বসবাসের জন্য মূল বাড়িটি ছিল জমিটির মধ্যখানে; প্রায় ৬ কামরার একটি বড় পাকা বাড়ি। সিলেটের কায়দা অনুযায়ী ঢেউটিনের চাল এবং তার নিচে ঘরের আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য কাঠের ছাদ। আর একটি ঘর ছিল রিচি সাহেবের বাড়িতে ঢোকার পথেই (সিলেটে এই ঘরকে বলে টংগীবাড়ী।) সেখানে অতিথিরা আসতেন এবং কয়েকজন ছাত্র বসবাস করতেন। এসব ছাত্র মোটামুটিভাবে গ্রাম থেকে আসতেন এবং তারা আমার দাদাবাড়িতে থেকে পড়াশোনা করতেন। তাদের দায়িত্ব ছিল আমার দাদার ছেলেদের সঙ্গদান এবং কালেভদ্রে পড়াশোনা দেখা। তৃতীয় ঘর ছিল রান্নাঘর, যেখানে খাবার খাওয়ানোরও ব্যবস্থা ছিল। অন্য ঘরটি ছিল ধান-চালের ভাঁড়ার এবং বিভিন্ন জিনিসপত্র, হাতিয়ার ইত্যাদি রাখার গুদাম। এছাড়া দুটি পায়খানা ছিল বড় ঘরের সামান্য দূরে ভেতরের ঘরটা একটি চৌহদ্দির/দেয়ালে আবৃত ছিল। এছাড়া বাড়িটিতে দাদা একটি পুকুরও নির্মাণ করেন। সেই পুকুরে মেয়েদের গোসল করার জন্য কিছু বাঁশের বেড়া দিয়ে পর্দা দেয়া ছিল। আমার আব্বা ধোপাদীঘির পূর্ব পাড়ে অবস্থিত তার পিতার একটি জমিতে নিজে বাড়ি নির্মাণ করে তার পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেন ১৯৩৩ সালে। চলবে...

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া