২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি ॥ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী

  • দুলাল আচার্য

মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, মহাত্মা গান্ধী নামে যিনি ভুবনবিখ্যাত। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। এ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল অহিংস মতবাদ ও দর্শনের ওপর। এটি ছিল ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম চালিকাশক্তি, সারাবিশ্বে মানুষের স্বাধীনতা এবং অধিকার আদায়ের অন্যতম অনুপ্রেরণা। নেতৃত্বের অতুলনীয় গুণাবলী তাঁকে ভারতীয়দের জাতির পিতার সম্মানে অধিষ্ঠিত করে।

মহাত্মা গান্ধী প্রথম অহিংস শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মতাদর্শ প্রয়োগ করেন দক্ষিণ আফ্রিকায় নিপীড়িত ভারতীয় সম্প্রদায়ের নাগরিকদের অধিকার আদায়ের রণকৌশল হিসেবে। বিশ শতকের বিশের দশকে ভারতে ফিরে আসার পর মুষ্টিমেয় দুস্থ কৃষক এবং দিনমজুরকে সঙ্গে নিয়ে বৈষম্যমূলক কর আদায় ব্যবস্থা এবং বহু বিস্তৃত বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে আসার পর গান্ধী ভারতব্যাপী দারিদ্র্য দূরীকরণ, নারী স্বাধীনতা, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, বর্ণবৈষম্য দূরীকরণ, জাতির অর্থনৈতিক সচ্ছলতাসহ বিভিন্ন ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসেন। ভারতকে বিদেশী শাসন থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে তিনি কংগ্রেসকে জনগণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলেন। তখনও কংগ্রেস সরাসরি স্বাধীনতার দাবি তোলেনি। স্বরাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলতেন সব সময়। একপর্যায়ে ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনের ডাক দেন। সেই সঙ্গে বিলেতী পণ্য বর্জন করার সেøাগান তোলেন। তাঁর ডাকে সাড়া দেন কোটি কোটি ভারতবাসী।

মানবতাই ছিল তাঁর প্রধান দর্শন। বর্তমান বিশ্বে গান্ধী এখনও আগের মতোই জনপ্রিয়। তাঁর পথ ধরেই এগিয়ে যেতে বলেন বিশ্ব নেতৃত্বের কেউ কেউ। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে অহিংসার পথে বিশ্বাসী অনেকেই। এই দর্শন আর আদর্শই ভারতের বহু সম্প্রদায়ের অনৈক্যের মাঝে তিনি হয়ে ওঠেন ঐক্যের প্রতীক। ভারতবর্ষের একজন সাধারণ কৃষক-শ্রমিক যে ধরনের জীবনযাপন করতেন, ঠিক অনুরূপ ছিল মহাত্মা গান্ধীর জীবনযাপন। খাটো ধুতি আর খদ্দরের চাদর ছিল তাঁর পরিধেয়। খাবার ছিল নিরামিষ।

ফলমূল, দুধ খেয়েও অনেক সময় কাটাতেন। তাঁর প্রতিবাদের ভাষা ছিল উপবাস বা অনশন। তিনি সম্প্রীতি রক্ষার জন্য পাঞ্জাব থেকে পশ্চিমবাংলা, বিহার; বিহার থেকে পূর্ববাংলার নোয়াখালী, বিক্রমপুরের ফুরশাইল, লৌহজংও ছুটে এসেছিলেন।

অখ- ভারতে বিশ্বাসী ছিলেন মহাত্মা গান্ধী। ভারত বিভক্তি চাননি তিনি। তিনি বলতেন, স্বাধীনতা দশ বছর পিছিয়ে যাক, তবু ভারত বিভক্তি মানব না। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, তাঁকে ভারত বিভক্তি মেনে নিতে হয় শেষ পর্যন্ত।

মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ১৮৬৯ সালের ২ অক্টোবর গুজরাটের পোরবন্দরের হিন্দু মোধ পরিবারে জš§গ্রহণ করেন। জাতিসংঘ তাঁর জন্ম দিবস ২ অক্টোবরকে অহিংস দিবস হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। তাঁর পিতা করমচাঁদ গান্ধী ছিলেন পোরবন্দরের দেওয়ান। মা পুতলিবা দেবী ধর্মীয় পরিচয়ে ছিলেন প্রণামী বৈষ্ণব গোষ্ঠীর। ১৮ বছর বয়সে ১৮৮৮ সালে তিনি ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য লন্ডনে যান।

গান্ধীজী ছিলেন বহুমুখী লেখক। সম্পাদনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন গুজরাটী, হিন্দী ও ইংরেজী ভাষায় প্রকাশিত হরিজন পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। পত্র-পত্রিকায়ও চিঠি লিখতেন তিনি। প্রায় নিয়মিতই কোন না কোন পত্রিকায় তাঁর চিঠি প্রকাশিত হতো। মহাত্মা গান্ধীর কিছু বই প্রকাশিত হয়েছে। তিনি গুজরাটী ভাষায় ভগবদ্গীতার ওপর ধারাভাষ্য লিখেন। রয়েছে তাঁর আত্মজীবনী, সত্যের সঙ্গে আমার অভিজ্ঞতার গল্প (ঞযব ঝঃড়ৎু ড়ভ গু ঊীঢ়বৎরসবহঃং রিঃয ঞৎঁঃয), দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রাম নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় সত্যাগ্রহ (ঝধঃুধমৎধযধ রহ ঝড়ঁঃয অভৎরপধ), স্বাধিকার বিষয়ে মেনিফেস্টো হিন্দী স্বরাজ (ঐরহফ ঝধিৎধল ড়ৎ ওহফরধহ ঐড়সব জঁষব) ও গুজরাটী ভাষায় জন রাসকিনের টহঃড় ঞযরং খধংঃ। শেষোক্তটি গান্ধীর অর্থনৈতিক কর্মসূচী হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এছাড়া নিরামিষ ভোজন, আহার ও স্বাস্থ্য, ধর্ম, সমাজ সংস্কার ইত্যাদি বিষয়েও তিনি লেখালেখি করেছেন। ১৯৬০-এর দশকে ভারত সরকার গান্ধীর রচনাবলী (ঞযব ঈড়ষষবপঃবফ ডড়ৎশং ড়ভ গধযধঃসধ এধহফযর) প্রকাশ করে।

১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে মহাত্মা গান্ধী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হন। তিনি ভারতের গ্রামভিত্তিক সভ্যতাকে অক্ষুণœ রাখার জন্য শিল্পভিত্তিক আধুনিক সভ্যতার বিরোধিতা করেন। তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য ন্যায়বিচার ও ভালবাসার কথা বলতেন। তিনি দলিত, হরিজন তথা পিছিয়ে পড়া মানুষের স্বার্থে ছিলেন সোচ্চার। পশু-পাখি যারা ভালবাসে, তাদের তিনি শ্রদ্ধা করতেন।

জীবনপ্রেমিক, মানবপ্রেমিক একজন মহান মানুষ তিনি। শেষ পর্যন্ত স্বাধীন ভারতে এক উগ্র ধর্মান্ধ এই মহান মানুষটিকে হত্যা করে। তাঁর জন্মদিনে রইল আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।