২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চামড়ার দাম কম, ব্যাংকঋণ বেশি কেন ?

  • ড. আর এম দেবনাথ

আমার সামনে ঈদের আগের তিনটি খবরের কাগজ ও ঈদপরবর্তী সময়ের দুটো কাগজ। পাঁচটি কাগজের পাঁচটি খবরের বড় শিরোনাম কী। প্রথম খবরটির শিরোনাম হচ্ছে : সরকারী ব্যাংকগুলো চামড়াশিল্পে বেশি ঋণ দেবে। দ্বিতীয় খবরটির শিরোনাম হচ্ছে : ট্যানাররা কাঁচা চামড়ার দাম কম নির্ধারণ করেছেন। তিন নম্বর খবরটির শিরোনাম হচ্ছে : ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের সাড়া কম। এই তিনটি খবরই ঈদের আগের। ঈদপরবর্তী খবর দুটোর একটির শিরোনাম হচ্ছে : সমস্ত বিদেশী ঋণ বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে আনা হচ্ছে। সবশেষ ঈদপরবর্তী খবরের শিরোনামটি হচ্ছে : এক দশকের পর বাংলাদেশের চলতি হিসাব উদ্বৃত্ত থেকে বড় ঘাটতিতে। এই পাঁচটি শিরোনামই কি সব খবরের কথা বলে? না, নিশ্চয়ই নয়। তবে অর্থনীতির হালচাল বোঝার জন্য এই পাঁচটি খবর বিবেচনাযোগ্য বিধায় আমি নির্বাচন করেছি। যেমন প্রথম খবর দুটো। একটিতে বলা হয়েছে- এবার ‘ট্যানাররা’ কাঁচা চামড়ার দাম বেশ কম নির্ধারণ করেছে। পরক্ষণেই খবর, সরকারী ব্যাংকগুলো চামড়া ক্রয়ের জন্য এবার বেশি ঋণ দেবে। এতে কী বোঝা যায়? পরিষ্কার বোঝা যায়, চামড়া কেনার জন্য সরকারী ব্যাংকগুলো প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা ঋণ দিচ্ছে। এটা কেন? দেখা যাচ্ছে ‘ট্যানাররা’ কাঁচা চামড়ার দাম গত তিন বছর যাবত ক্রমাগতভাবে হ্রাস করে যাচ্ছেন। ২০১৩ সালে ঢাকার জন্য প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম ছিল ৮৫ থেকে ৯০ টাকা। ২০১৪ সালে সেই দাম হ্রাস করে ব্যবসায়ীরা নির্ধারণ করে ৭০ থেকে ৭৫ টাকায়। আর এবার ২০১৫ সালে কাঁচা চামড়ার বর্গফুটপ্রতি দাম নির্ধারিত হয়েছে মাত্র ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়। অর্থাৎ তিন বছরে ঢাকায় প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম কমানো হয়েছে ৩৫ টাকা। ভাবা যায়? ভাবতে তো হচ্ছেই। ব্যবসায়ীরা এর অনেক কারণের কথা বলেছেন। আমি এই মুহূর্তে ওসবে যাচ্ছি না! আমার ইস্যু ব্যাংকঋণের পরিমাণে। যদি কাঁচা চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুটে ২০ থেকে ২৫ টাকা কম হয় তাহলে ট্যানারদের চামড়া কেনার জন্য অধিকতর ঋণ লাগবে কেন! তবে কি এবার চামড়ার পরিমাণ গেল বছর বা তার আগের বছরের তুলনায় বেশি? না, এমন কোন খবর কাগজে পেলাম না। তাহলে কেন সরকারী ব্যাংক বেশি বেশি ঋণ দিচ্ছে এই খাতে? এর যুক্তি কী? আমরা জানি না শেষ পর্যন্ত সরকারী চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংক কাঁচা চামড়া কেনার জন্য কত টাকা ঋণ দিয়েছে। তাদের পরিকল্পনা ছিল মোটামুটি ৬০৮ কোটি টাকা ঋণের। এর মধ্যে সোনালীর ১৭৫ কোটি, জনতার ২৩০ কোটি, অগ্রণীর ১৩৪ কোটি এবং রূপালী ব্যাংকের ৬৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ চার ব্যাংক মিলে ৬০৮ কোটি টাকা। অথচ ২০১৪ সালে তারা এই খাতে দিয়েছিল ৫৩০ কোটি টাকা। হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ঋণ বেশি পাওয়া যাবে ৭৫ কোটি টাকা। যদি তাই হয় তাহলে কী দাঁড়ায়। ঋণ বাড়ল ১৫ শতাংশ অথচ কাঁচা চামড়ার দাম কমল প্রায় ৩০ শতাংশ। এই হিসাবের অর্থ কী? আমরা জানি কাঁচা চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্য শিল্পে ব্যাংকগুলোর প্রচুর টাকা আটকা পড়ে আছে। এর পরিমাণ ৫০০ কোটিরও ওপরে। শুধু বকেয়া টাকা বা পাওনা নয়, এই খাতটি নিয়ে সরকার ও সরকারী ব্যাংক উভয়ই বিব্রতকর অবস্থায় আছে। এরা কোন কথাই মানতে চায় না। ‘ডিকটেট’ করতে করতে ঢাকার পরিবেশ তারা নষ্ট করেই চলেছে। অথচ সরকার সরকারী ব্যাংকগুলোকে এই খাতে ঋণ দিতে বাধ্য করেই চলেছে। আবার উল্টোদিকে শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণ কমানোর চাপ সরকার ব্যাংকগুলোকে দিচ্ছে, মুনাফা বৃদ্ধির টার্গেট দিচ্ছে। এই যে দ্বিমুখী আচরণ তা অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চামড়াশিল্পের মালিকরা বলছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম কম, কম দামের চামড়াজাত পণ্যের বাজার বিদেশে। আবার পরিবেশবান্ধব না হওয়ায় বিদেশীরা আমাদের চামড়ারজাত দ্রব্য কিনতে চান না। এদিকে চামড়া খাত থেকে রফতানি আয়ও কমছে ধীরে ধীরে, যদিও চামড়াজাত দ্রব্যের রফতানি কিছুটা বাড়ছে। এরই মধ্যে চামড়া নিয়ে চলছে এক উত্তেজনা। বলা শুরু হয়েছে- চামড়াজাত দ্রব্য রফতানি হবে আমাদের আরেক বড় ব্যবসা। এসব উত্তেজনা প্রায়শই দেখা যায়। জাহাজশিল্প নিয়ে একবার হৈচৈ হয়েছে। আমি এসব উত্তেজনার প্রতি সরকারকে তীক্ষè নজর রাখার জন্য পরামর্শ দেব। বলব বিশ্বের চলমান মন্দার প্রতি নজর রাখতে এবং সে মোতাবেক পদক্ষেপ নিতে। গাছে ওঠা যায়, নামতে কিন্তু এক মিনিটও লাগে না- ধপাস।

পরবর্তী খবরটি পর্যটনশিল্পকে নিয়ে। ঈদপূর্ববর্তী খবরে বলা হয়েছে, পর্যটনশিল্পে এবার কক্সবাজার ভালই। কিন্তু বান্দরবান ও সুন্দরবনসহ অন্যান্য পর্যটন-স্পটে চলছে মন্দা। বলা হয়েছে এবার বান্দরবানে অগ্রিম বুকিং নেই। পর্যটনের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা এরজন্য মূলত আবহাওয়াকে দায়ী করেছেন। এবার মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টি হচ্ছে। গেল বছর এমন ছিল না। বান্দরবানে বৃষ্টিপাতে রাস্তাঘাট ভেঙ্গে গেছে। আবার বান্দরবানে যারা যায় এদের অধিকাংশই নাকি সাময়িক পর্যটক। দুপুরে যায়, বিকেলে চট্টগ্রাম ফিরে যায়। একই অবস্থা সুন্দরবনের এবং কুয়াকাটার। এটা হতেই পারে। আসলে আমাদের পর্যটনশিল্প দাঁড়াতেই পারছে না। এর সঙ্গে জড়িত বাস, ট্রেন ও বিমান সার্ভিস। জড়িত হোটেলশিল্প। সিলেটের মতো জায়গায় হোটেল, ভাল হোটেল চলে না। পর্যটকের অভাব। কক্সবাজারে সমস্যা আবার সমুদ্র। সমুদ্র উত্তাল থাকলে কক্সবাজার-টেকনাফ-সেন্টমার্টিন ভ্রমণ বিঘিœত হয়। যেভাবেই দেখা হোক না কেন পর্যটনশিল্পটা দাঁড়ায় দাঁড়ায় করে দাঁড়াতে পারছে না। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যাংকগুলো। কারণ এই খাতে ভাল পরিমাণ ব্যাংক ফিন্যান্স জড়িত। ইতোমধ্যেই পর্যটনশিল্পের ব্যবসা, হোটেল-মোটেলের ঋণকে দীর্ঘমেয়াদে পুনঃতফসিল করতে হচ্ছে বলে জানা যচ্ছে। এখন যে খবরটির কথা বলব তা বেশ চিন্তারই। আমরা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির খবরে বেশ উল্লসিত। আবার খুশি এই কারণেও যে, এত বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরও মূল্যস্ফীতি কমের দিকে স্থিতিশীল আছে। এর জন্য আন্তর্জাতিক কারণও দায়ী- এ কথা আমরা ভুলে গিয়েই সন্তুষ্ট। কিন্তু এই প্রেক্ষাপটে সর্বশেষ যে খবর আমরা পাচ্ছি তা কোনভাবেই ভাল নয়। খবরটি সরকারের ‘কারেন্ট এ্যাকাউন্টের’। ‘কারেন্ট এ্যাকাউন্ট’ বাদে সরকারের আরেকটি হিসাব আছে যার নাম ‘ক্যাপিটাল এ্যাকাউন্ট’। দৈনন্দিন আমদানি-রফতানি এবং বৈদেশিক আয়-ব্যয়ের হিসাব হচ্ছে ‘কারেন্ট এ্যাকাউন্ট’। এই হিসাবটি ছিল স্থিতিশীল। সব সময়ই থাকত ইতিবাচক ব্যালান্স। দেখা যাচ্ছে ২০১৪-১৫ সালে তা হঠাৎ করেই নেতিবাচক হয়েছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে ‘চলতি হিসাব’ বা ‘কারেন্ট এ্যাকাউন্টে’ ৫ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত ছিল। তার পরের বছর বেড়ে উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ৮ হাজার ৯১৬ কোটি টাকায়। তার পরের বছর (২০১২-১৩) এই উদ্বৃত্ত একটা লাফ দেয় এবং তা উন্নীত হয় ১৪ হাজার ৯৯০ কোটি টাকায়। ২০১২-১৩ অর্থবছরে আবার তা মারাত্মকভাবে কমে যায়। হয় ৮ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা একেবারে ঘাটতিতে পড়ে যায়। নেতিবাচক ব্যালান্স হয় ১৭ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা। এটা কিভাবে সম্ভব হলো? পাঁচ বছর যাবত আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম কম, ভোগ্যপণ্যের দাম কম, জ্বালানি তেলের দাম কম, মূলধনী যন্ত্রপাতির দাম কম। অবশ্য রেমিট্যান্স কাক্সিক্ষত হারে বাড়েনি। এমতাবস্থায় ‘চলতি হিসাবে’ এত বড় ঘাটতি কিভাবে সম্ভব হলো। দৃশ্যত বিনিয়োগে গতি নেই। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির পরিমাণ কমই হওয়ার কথা। অথচ বলা হচ্ছে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি বাড়ছে এবং বিদেশে নাকি মূলধনী যন্ত্রপাতির দাম বাড়তির দিকে। কেউ কেউ এই সংবাদকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। তবে কি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে? সন্দেহটি ঘনীভূত হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি খবরে। এত বলা হয়েছে, বেসরকারি খাতের সকল বৈদেশিক ঋণই এখন শক্ত ‘মনিটরিং’-এর আওতায় আসবে। কত টাকার ঋণ বেসরকারী খাত বিদেশে এখন পর্যন্ত করেছে? সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী তা নাকি আট বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা। টাকার হিসাবে খারাপ নয়। বরং বেশ খানিকটা বেশিই। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, বেশকিছু ক্ষেত্রে নাকি এসব ঋণ ব্যবহার করা হয়েছে- শীতাতপ যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র আমদানির জন্য। অথচ তাদের আনার কথা মূলধনী যন্ত্রপাতি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ কারণেই বিদেশে ঋণ করতে ব্যবসায়ীদের অনুমতি দিয়েছে। এখন নানান রকম অনিয়মের কথা উঠেছে। তারা অনেকেই দেশী ব্যাংকঋণ পরিশোধ করছেন। বেশি সুদে ব্যাংকে আমানত রাখছেন। কিছু টাকা বিদেশে রেখে দিচ্ছেন। এখন অভিযোগ- ব্যবসায়ীরা মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির পরিবর্তে ভোগ্যপণ্য, বিলাসপণ্য আমদানি করছেন। ‘ফ্রি ফর অল’- আর কী?

লেখক : ম্যানেজমেন্ট ইকোনমিস্ট ও

সাবেক শিক্ষক ঢাবি