২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ মিনার ঘটনা

  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

মিনাকে আরব দেশের মানুষ মুনা বলে। মক্কা মুকাররমার মসজিদে হারাম থেকে পূর্বদিকে ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মিনা বা মুনা ঐতিহাসিক এক উপত্যকা। এই উপত্যকার উত্তরে ও দক্ষিণে রয়েছে পর্বত। মিনা পশ্চিম দিক থেকে পূর্বদিকে বিস্তৃত একটি সঙ্কীর্ণ উপত্যকা। এর শুরু হয়েছে মক্কা মুকাররমার শেষ সীমা থেকে এবং শেষ হয়েছে মুযদালিফার শেষ সীমায়।

মিনায় তিনটি চিহ্নিত স্থান রয়েছে, যার প্রথমটিকে বলা হয় জাম্রাতুল আকাবা বা জাম্রাতুল কুব্রা বা জামরাতুল উলা। আমাদের দেশে একে বড় শয়তান বলা হয়। এখান থেকে পূর্ব দিকে ১৫০ মিটার এগিয়ে গেলে যে জামরা রয়েছে তাকে বলা হয় জামরাতুল বুসতা বা মেজো শয়তান। এখান থেকে পূর্ব দিকে এগিয়ে ১৫০ মিটার গেলে যে জামরা তা আমাদের দেশে ছোট শয়তান নামে পরিচিত। এই তিনটি স্থানকে সমষ্টিগতভাবে বলা হয় মুহাস্সাব। অবশ্য মক্কা ও মিনার মধ্যবর্তী সমতলভূমিকেও মুহাস্সাব বলা হয়। আর মিনা ও মুযদালিফার মধ্যবর্তী কিছুটা ঢালু স্থানকে বলা হয় ওয়াদিউন নার অর্থাৎ অগ্নি উপত্যকা। এইখানে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের জন্মের ৫০ দিন পূর্বে ইয়েমেনের রাজা আবরাহা বিরাট হস্তিবাহিনী নিয়ে মক্কার কা’বা শরীফ ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে এসে ঝাঁকে ঝাঁকে ছোট ছোট পাখির (আবাবীল) নিক্ষেপ করা কংকরের আঘাতে ধ্বংস হয়েছিল।

মিনার তিন জামরার চিহ্নিত স্থানে শয়তান হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস সালাম, হযরত ইসমাঈল আলায়হিস সালাম ও হযরত হাজেরা আলায়হাস সালামকে কুরবানি না দেবার জন্য প্ররোচিত করেছিল আর তারা পাথর মেরে শয়তানকে তাড়িয়ে ছিলেন। আর সেই ঘটনার চিহ্নিত স্থানে হাজীগণ প্রতিবছর হজের দিন আরাফাত ময়দানে অবস্থান করার পর সূর্যাস্তের পর ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে মুয্দালিফা এসে অবস্থান করেন। ভোরবেলায় ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে মিনায় এসে বড় শয়তানকে লক্ষ্য করে একে একে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করে পশু কুরবানি ও মাথা মু-ন করে হজের ইহ্রাম মুক্ত হন।

এবার এই ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ২৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার সৌদি আরবে ছিল ১০ জিলহজ। এবার মিনাতে জামরাতুল আকাবা বা বড় শয়তানকে কংকর মারতে গিয়ে ভিড়ের চাপে পদদলিত হয়ে সর্বশেষ খবর অনুযায়ী ১২শ’ ইহরাম পরিহিত হাজী শহীদ হয়েছেন। এ পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী বাংলাদেশী হাজীর সংখ্যা সর্বশেষ ৪১। এ সংখ্যা আরও বাড়বে বলে খবরে প্রকাশ। এই বিশাল শহীদী মিছিলে নারী হাজীগণও রয়েছেন। এবার মক্কা মুকাররমায় ভীষণ ঝড় হয়েছে। সেই ঝড়ের দাপটে মসজিদুল হারামের পূর্বাংশে মজবুত ক্রেন পড়ে বেশ কিছু হাজী মারা যান। আবার মিনাতে পদদলিত হয়ে জান কুরবান করলেন অনেক মানুষ।

এবার মক্কা, মুয্দালিফা ও মিনাতে মাত্রাতিরিক্ত অধিক গরম পড়েছে। হজের দিন সারা দিবস প্রচ- সেই গরমে আরাফাত ময়দানে অবস্থান করে মুয্দালিফাতে খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন করে ভোরবেলায় ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত বড় শয়তানকে কংকর মারার উদ্দেশ্যে রওনা হন। এবার পৃথিবীর নানা দেশ থেকে প্রায় বত্রিশ লাখ মানুষ হজ করতে আসেন। সবার লক্ষ্যস্থল মিনার জামরাতুল আকাবা বা বড় শয়তান। সেই প্রচ- ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে সৌদি সরকার ১ লাখ নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন নিয়োগ করেন। হাজীদের সেই বিশাল তরঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করা দুষ্কর হয়ে পড়ে। সৌদি সময় সকাল সাড়ে নয়টা মুতাবিক বাংলাদেশ সময় দুপুর সাড়ে বারোটায় ঘটে গেল সেই দুর্ঘটনা। আফ্রিকান এক কাফেলার প্রচ- চাপে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন কয়েক হাজার মানুষ। আর্তচিৎকারে ভারি হয়ে গেল আকাশ বাতাস। যা হবার তাই হলো। তাই বলে শয়তানের পাথর মারা থমকে যায়নি। শয়তানকে কংকর মারাকে বলা হয় রমী। এই সময় পড়তে হয় : বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার রাগমান লিশ শায়তান ওয়া রিদাআন লিবরহমান আল্লাহুম্মাজ আলহু হজ্জাম মাব্রূরান ওয়া যান্বান মাগ্ফুরান ওয়া সায়ীয়াম মাশ্কুরান ওয়া তিজারাতান লান তাবূর- মহান আল্লাহর নামে নিক্ষেপ করছি শয়তানকে অপদস্ত করার জন্য এবং রহমান আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য। হে আল্লাহ! আমার হজ কবুল করুন। আমার সমস্ত গোনাহ্কে ক্ষমা করুন। আমার সায়ীকে কৃতজ্ঞতাপূর্ণ করুন এবং আমার তেজারতকে এমন তেজারতে পরিণত করুন যাতে কোন লোকসান থাকবে না। এটা নিশ্চিত করে বলা যায় যারা মিনায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন তারা শহীদদের মর্যাদা লাভ করেছেন।

২০০৬ খ্রিস্টাব্দে মিনায় শয়তানকে কংকর মারতে গিয়ে ভিড়ের চাপে পড়ে ৩৬৪ জন হাজী শহীদ হয়েছিলেন। সেই দুর্ঘটনার ১০ মিনিট পূর্বে বড় শয়তানকে সাতটি কংকর মেরে আমার একমাত্র পুত্র আরিফবিল্লাহ মিঠু নিচে নেমে এসেছিলেন। এটা ছিল আল্লাহর খাস রহমত।

লেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরীফ,

উপদেষ্টা, ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা:),

সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ