২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গল্প ॥ ম্যারাথন লেক এবং ‘শুন বরনারী’

  • আলমগীর সাত্তার

ম্যারাথন লেক, ঐতিহাসিক ম্যারাথন যুদ্ধক্ষেত্রের কাছেই ওই লেকের গ্রীক নাম ম্যারাথন লিমনি। পর্যটকদের কাছে ম্যারাথন যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়ে ম্যারাথন লেকের আকর্ষণ অনেক বেশি। আমি এর আগেও দু’একটি লেখায় ম্যারাথন লেকের কথা উল্লেখ করেছি। আজকের কাহিনীর প্রয়োজনে আবারও সেসবের পুনরাবৃত্তি করতে হচ্ছে।

বেশ কিছুদিন যাবত তেমন একটা লেখালেখি করিনি। ভাবছিলাম কোন্ বিষয়ে লিখব? অনেক ভেবে-চিন্তে ঠিক করেছি, নিজের জীবনের কথাই খ- খ- আকারে লিখব। তাতে করে মুক্তিযুদ্ধের কথা আসবে। ভ্রমণ কাহিনী আসবে। আসবে প্রেম-ভালবাসার কথাও। আমি তেমন বিখ্যাত লোক নই যে আত্মজীবনী লিখব! তবে খ- খ- আকারে লিখলে অনেক কিছুই পাঠকের কাছেও আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। অমন চিন্তা-ভাবনা থেকেই আজকের এ লেখা।

আমি যখন বাংলাদেশ বিমানের ক্যাপ্টেন ছিলাম, তখন সবচেয়ে বেশি ফ্লাইট এবং অবস্থান করেছি এথেন্স শহরে। এথেন্স ফ্লাইটের জন্য আমি সব সময় অনুরোধ করতাম। এর প্রধান কারণ ওই দেশের আবহাওয়া। গ্রীষ্মকালে ওখানে গরমের তেমন আধিক্য থাকে না। সমুদ্র-জলের উষ্ণতা থাকে এমন যে, তাতে করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাঁতার কাটা যায়। ঘর্মাক্ত না হয়ে শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো যায়। গ্রীকদের হৃদয়ের উষ্ণতাও বেশি। গ্রীকদের মাঝে ঠক-বাটপারদের সংখ্যাও খুব কম।

গ্রীসে শীতের মৌসুমে ঠা-ার তীব্রতা তেমন না। ওই দেশে এতিহাসিক দ্রষ্টব্য স্থানের সংখ্যাও অনেক। ওখানকার খাবার-দাবারও আমার কাছে খুব উপাদেয় মনে হয়। ওই দেশের ম্যাট্রেক্স নামের ব্রান্ডি আমার খুব প্রিয়। আমার ধারণা ম্যাট্রেক্স ব্রান্ডি আমাকে সুস্থ এবং সবল রেখেছে অনেক দিন।

এথেন্স থেকে ম্যারাথন লেকের দূরত্ব পঞ্চাশ কিলোমিটার। বিগত শতকের ন’এর দশকে এথেন্স থেকে ওখানে যেতে বাস ভাড়া লাগত পঞ্চাশ দ্রাকমা, যা ছিল বাংলাদেশের মুদ্রায় দশ টাকার সমান। এক ঘণ্টা সময়ে ওখানে পৌঁছে যাওয়া যেত। যাত্রাপথের দৃশ্যও ছিল অপূর্ব। তাই এথেন্সে অবস্থান করার সময় আমি প্রায়ই ওখানে চলে যেতাম।

ম্যারাথন লেকের জলরাশি আটকে রাখার জন্য এর একধারে তৈরি করা হয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম শ্বেতপাথরের বাঁধ। চারদিকে মধ্যম উচ্চতার পাহাড় শ্রেণী। লেকের পূর্ব পাড়ে ম্যারাথন ভিলেজ। ভিলেজের পরেই ম্যারাথনের যুদ্ধের মাঠ।

ম্যারাথন লেকের চেয়ে লেকের শ্বেতপাথরের বাঁধই পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এই আকর্ষণের কারণ প্রায় আড়াই শ’ ফুট উচ্চতার এবং যথেষ্ট প্রশস্ত শ্বেতপাথরের বাঁধটির মতো বিশ্বের অন্য কোথাও আর কোন বাঁধ নেই। এছাড়া এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ লেকের চারদিকের জলপাই, পাইন, ইউক্লিপটাস গাছ আর উঁচু-নিচু পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে অসংখ্য বুনোফল এবং নির্জনতা কে কোন মানুষকে বিমোহিত না করে পারবে না। বাঁধটার একদম নিচে আছে খুব সুন্দরভাবে সাজানো ফুলের বাগান। অরণ্যের ছায়ায় ছায়ায় সরু রাস্তা দিয়ে একদম নিচের স্তরে নেমে যায়। নিচের ফুলের বাগানে বসার আছে কিছু পাথরে তৈরি বেঞ্চ। নিচের নির্জন ওই ফুলের বাগানে বসে সময় কাটানোর জন্য আমি প্রায় ওখানে চলে যেতাম। সেই তখনকার দিনে যখনই বাইরে বেরোতাম তখন আমার কাঁধে থাকত একটি চামড়ার ব্যাগ। সেই ব্যাগে থাকত দু’একখানা বই, একটি ক্যাসেট প্লেয়ার এবং সঙ্গে হেডসেট, একটি ছোট পানির বোতল ও কিছু খাবার। লেকের বাঁধের নিচের বাগানে একাকী বসে ক্যাসেট প্লেয়ারে গান শুনতে অথবা বই পড়তে কী যে ভাল লাগত তা বলে কাউকে বোঝাতে পারব না। একা একা নির্জন প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটালে মনে এক রকম প্রশান্তি দেখা দেয়। অজানা নামের একজন কবির লেখা থেকে কয়েকটি লাইনের উদ্ধৃতি দিচ্ছি :

“ও অগ ঞঐঊ ইঊঝঞ ঋজওঊঘউ ও ঊঠঊজ ঐঅউ

ও খওকঊ ঞঙ ইঊ ডওঞঐ গঊ.

ও খওকঊ ঞঙ ঝওঞ অঘউ ঞঊখখ গণঝঊখঋ

ঞঐওঘএঝ ঈঙঘঋওঊউঘঞওঅখখণ.”

আমি যখন একা থাকি, তখন নিজেকে সম্পূর্ণরূপে পাই।

দুই

১৯৫৮ সালের কথা। সম্পর্কে আমার এক মামা ঢাকার আগামসি লেনে একটি বাসার গ্যারেজ ভাড়া নিয়ে থাকতেন এবং ঢাকায় ছোট একটি চাকরি করতেন। আমি মামার ভাড়া করা গ্যারেজের এক প্রান্তে একখানা চৌকি পেতে থাকতাম। কাছেই এক চাচাত বোনের বাসায় দু’বেলা খাবারের ব্যবস্থা ছিল।

’৫৮ সালে আমি ঢাকার সিটি নাইট কলেজে আইএ ক্লাসে ভর্তি হলাম। আজিমপুর সরকারী অফিসার্স কলোনির দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে নবাবগঞ্জের কাছে ছিল ওয়েস্ট এ্যান্ড হাই স্কুল। স্কুল ভবনটি ছিল টিনশেডের। ওই স্কুল ভবনে সন্ধের পর চলত সিটি নাইট কলেজের কার্যক্রম। কলেজে আমি কমই যেতাম। ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসের আমার পাঠ্য বিষয়ের বইগুলো পড়লে আমি নিজেই ভাল করে বুঝতে পারতাম। আজিমপুর সরকারী কর্মকর্তাদের কলোনিতে আমার সম্পর্কে এক চাচা বাস করতেন। তার ছিল দুই মেয়ে এবং দুই ছেলে। আমার চাচা এবং চাচি দু’জনেই ছিলেন অতিশয় ভাল এবং উদারপন্থী মানুষ। ওই বাসায় গেলে চাচা এবং চাচি খুব আপনজনের মতোই ব্যবহার করতেন। আপ্যায়ন করতে এতটুকু কৃপণতা করতেন না। তাদের সন্তানরাও ছিল বাবা-মায়ের মতো খুব মার্জিত স্বভাবের। সন্তানরা সবাই ছিল খুব মেধাবী। বড় মেয়েটির বয়স ছিল তখন বিশ বছর। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ত। আমার বয়স ছিল তখন উনিশ বছর। বড় মেয়েটির ভারিক্কি ধরনের একটি ভাল নাম ছিল। একটি তিন অক্ষরের ডাকনামও ছিল। যেহেতু সত্যিকারের ঘটনা নিয়ে লেখাটি লিখছি তাই নামটি বদলে দিয়ে অন্তরা নামে এখানে উল্লেখ করব।

অন্তরা মহাসুন্দরী না হলেও ছিল বেশ আকর্ষণীয়। কেমন করে রুচিসম্মতভাবে সাজতে হয় সেটা সে জানত। তার রসিকতাবোধও ছিল যথেষ্ট। তার সঙ্গে আমার বেশ সুসম্পর্ক ছিল। তাই বলে তার সঙ্গে প্রেম-ভালবাসার কথা আমি কখনও চিন্তা করিনি। মনে হয় সেও করেনি।

অন্তরার ছিল গল্প-উপন্যাস পড়ার নেশা। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় ভাল করার জন্য সে প্রতি মাসে বিশটি টাকা বৃত্তি পেত। তা দিয়ে শুধু গল্প-উপন্যাসের বই কিনত। একদিন অন্তরা আমাকে আমার অন্যতম প্রিয় লেখক সুবোধ ঘোষের সদ্য প্রকাশিত উপন্যাস ‘শুন বরনারী’ বইখানা দিয়ে বলল, পড়ে দেখ, তারপর বলবে, কেমন লাগল।

এবার আমি একটু ব্যাখ্যা করে বলতে চেষ্টা করছি, কেন আমি অন্তরার প্রতি প্রেম-ভালবাসার আবেগে তাড়িত হইনি, যদিও সে যথেষ্ট আকর্ষণীয়া ছিল। এর কারণ প্রেম-ভালবাসার প্রতি আমার মাঝে এক ধরনের প্রতিরোধ ক্ষমতার সৃষ্টি হয়েছিল।

কয়েক প্রকার অসুখ আছে, যাতে করে একবার ভুগলে, সেটা আর দ্বিতীয়বার হয় না। ওই রোগের প্রতি এক ধরনের ইমমিউনিটি বা প্রতিরোধ ক্ষমতার সৃষ্টি হয় শরীরে। যেমন গুটি বসন্ত, জল বসন্ত রোগ। অমনভাবে প্রেম রোগে আক্রান্ত হলে মনের মাঝে এক ধরনের প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি হয়।

আমার গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলায়। ১৯৫৪ সাল। আমি তখন কালকিনির প্রধান তহসিলদার কুমুদ রঞ্জন ভট্টাচার্যের ছোট মেয়ে গীতালী ভট্টাচার্যের প্রেমে পড়েছিলাম। তখন আমার এবং গীতালীর উভয়ের বয়স পনেরো। সে প্রেমের আবেগের তীব্রতা ছিল খুব বেশি। ওই প্রেমকাহিনী নিয়ে ‘ঠাকুরমার বয়ফ্রেন্ড’ নাম দিয়ে একটি গল্প লিখেছিলাম। আদতে ওটা গল্প ছিল না। ছিল আমার জীবনেরই সত্য কাহিনী। যেমন আজ যা লিখছি, সেটাও সত্য কাহিনী। গীতালীর সঙ্গে প্রেমের ব্যাপারে আমি সফলও না আবার ব্যর্থ তাও বলা যাবে না। ১৯৫৪ সালের শেষের দিকে কুমুদ বাবু তার পরিবার-পরিজন নিয়ে ভারতে চলে যান। আমার আক্রোশ গিয়ে পড়েছিল ভারত ভাগ হয়ে দুটি দেশ হওয়ার ওপর। দেশ ভাগ না হলেও আমাদের প্রেমের সফল পরিণতি লাভ করত এমনটাও আমি মনে করি না। ২০০৬ সালে গীতালীর সঙ্গে উড়িষ্যার ধবলগিরি মন্দির প্রাঙ্গণে দেখা হয়েছিল। পঞ্চাশ বছর পর আমাকে দেখে সে চিনতে পেরেছিল দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম। আমি ওর পরিবার-পরিজনের সঙ্গে বসে পুরনো দিনের স্মৃতিচারণ করছিলাম। সব শুনে গীতালীর নাতনি (পুত্রের কন্যা) মালতী রসিকতা করে বলল, দিদা, তাহলে সেই বয়সে তোমার একজন বয়ফ্রেন্ড ছিল? মালতীর এমন রসিকতা আমরা সবাই খুব উপভোগ করেছিলাম।

কাজী আশরাফ মাহমুদ ছিলেন আমার চাচা। তিনি ছিলেন ভারতবিখ্যাত কবি। তিনি মহাত্মা গান্ধীর ছেলে রামদাস গান্ধীর মেয়ে সুমিত্রার প্রেমে পড়েছিলেন। সে প্রেম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল। আশরাফ মাহমুদের সঙ্গে কন্যার বিয়ের ব্যাপারে রামদাস গান্ধী সম্মত ছিলেন। কিন্তু বাপুজি অর্থাৎ মহাত্মা গান্ধী আপত্তি তোলেন। এর কারণ আশরাফ মাহমুদ এবং সুমিত্রার মাঝে বয়সের পার্থক্যটা ছিল অনেক।

প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কাজী আশরাফ মাহমুদ আট-দশখানা বিরহের কাব্য লিখে গেছেন। সবই মৈথিলী ভাষায়।

শুরু করেছেন এভাবেÑ

বন্ধন পূছো মুঝসে মেরে

ইন গীতা কা জনম বিকাশ,

কি সী দিবস লিখ যাওয়ে গা

স্বয়ং প্রেম ইনকা ইতিহাস।

এরপর তিনি একে একে লিখলেন কুটজ, কুটজমালা, বিরহিনী, বিয়োগিনী, নিমন্ত্রণ ইত্যাদি শখের বিরহের কাব্যগ্রন্থ। এ ছাড়া তিনি হিন্দি এবং মৈথিলী ভাষায় বেশকিছু রোমান্টিক কবিতা এবং ভজন ও কীর্তন লিখে গেছেন। রোমান্টিক কবিতাগুলো লিখেছিলেন ব্যর্থ প্রেমের আগেকার সময়ে।

তার লেখা রোমান্টিক কবিতার কিছু নমুনা তুলে ধরছিÑ

“ঠুমুক ঠুমুক পস

কুসুম কুঞ্জ মগ,

চপল হরিণ আয়ে,

হো হো চপল চরণ হরি আয়ে।

মেরে প্রাণ ভুলায়ন আয়ে

মেরে নয়ন লোভায়ন আয়ে।”

কুটজ কাব্যগ্রন্থখানা আমি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। মৈথিলী ভাষার ওপর আমার কিছু দক্ষতা আছে। তাই ‘কুটজ’ কাব্যগ্রন্থ সম্পর্কে একটি মন্তব্য করাই যথেষ্ট মনে করি।

“ঈঙগঊ জঅউঙ ঞঐওঝ ওঝ ঘঙ ইঙঙক,

ডঐঙ ঞঙটঈঐঊঝ ঞঐওঝ ঞঙটঈঐঊঝ অ গঅঘ.”

কবি আশরাফ মাহমুদ তার সব কাব্যগ্রন্থে সুমিত্রার নামের স্থলে সুভদ্রা বলে উল্লেখ করেছেন। সুমিত্রাকে বিয়ে করতে ব্যর্থ হয়ে তিনি আজীবন অবিবাহিত থেকে যান।

প্রেম রোগের ব্যাপারে আশরাফ মাহমুদ প্রতিরোধ ক্ষমতা লাভ করেছিলেন, কারণ প্রেম নামের বসন্ত রোগে তিনি আক্রান্ত হয়েছিলেন। বসন্ত রোগে আক্রান্ত হলে তা শরীর এবং মুখম-লে অনেক ক্ষতচিহ্ন রেখে যায়। কিন্তু প্রেম রোগে আক্রান্ত হলে ক্ষতচিহ্ন থেকে যায় হৃদয়ে যা বাইরে থেকে দেখা যায় না।

তিন

এবার আমি ১৯৫৮ সালের কথায় ফিরে যাই। আমার প্রায় সমবয়সী আত্মীয়া অন্তরার কথায়। সে আমাকে প্রায়ই বলত ‘শুন বরনারী’ উপন্যাসের নায়ক ‘হোমিও হিমুর’ চরিত্রের সঙ্গে আমার অনেক মিল আছে। তার এমন মন্তব্যের কারণ আমার জানা নেই। হয়ত সে আমাকে উদ্দেশ্যবিহীন এবং ভবঘুরে ধরনের মানুষ বলে মনে করত। আসলে আমি তেমন নিচেষ্ট অথবা ভবঘুরেও ছিলাম না, যদিও আমি জীবনে আমার অভীষ্ট উচ্চতায় পৌঁছাতে পারিনি। সে জন্য মনে ক্ষোভও নেই। অভীষ্ট উচ্চতায় পৌঁছাতে পারিনি। সে জন্য মনে ক্ষোভও নাই। অভিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছাতে হলে ভাগ্যেরও সহায়তা লাগে। কর্মযোগ এবং ভাগ্যযোগ আমার এক হয়নি।

আমার বড় মামা ছিলেন তখনকার ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের খুলনা শাখার ম্যানেজার। ১৯৫৯ সালে তিনি ওই ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখার ম্যানেজার হয়ে এলেন। আমি গিয়ে উঠলাম বড় মামার বাসায়। ভর্তি হলাম তোলারাম কলেজে। এরপর এক সময় যোগদান করলাম পিআইএতে পাইলট হিসেবে। চলে গেলাম পাকিস্তানে। ১৯৬৮ সালে বদলি হয়ে ঢাকায় ফিরে এলাম। অন্তরাদের বাসায় আর তেমন একটা যাওয়া হতো না।

অল্প কিছুদিন আগে অন্তরার সঙ্গে দেখা হয়েছে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে। আমরা একই টেবিলে খেতে বসেছিলাম। আমার এখন বয়স সাতাত্তর আর ওর বয়স আটাত্তর। আমরা দু’জনেই বৃদ্ধ, কিন্তু সুস্থ শরীরেই আছি। দেখে তাকে আগের চেয়েও মার্জিত এবং রুচিশীল মনে হয়েছে। বয়সের ভারে তার বুদ্ধির তীক্ষèতা একটুও কমেনি। এই বয়সেও তার কণ্ঠস্বর আগের মতোই শানিত এবং মধুরতাও বিদ্যমান আছে। তাকে দেখে আমি যেমন খুশি হয়েছি, বোধ হয় সেও খুশি হয়েছে। কার ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি কে কোথায় আছে, এমনি ধারার কথাবার্তা হলো। ‘শুন বরনারী’ নিয়ে আর কথা হলো না। আমি নিজেই তাকে প্রশ্ন করলাম, আমাকে দেখে এখনও তার হোমিও হিমু বলে মনে হয়, না যথেষ্ট বৈষয়িক মনে হয়? হাসতে হাসতে বলল, দুটোর মাজামাঝি। এরপর সে তার বাসায় যাওয়ার জন্য অনুরোধ করল। আরও বলল অল্পদিনের মধ্যে সে লন্ডনে তার ছেলের কাছে চলে যাবে।

ওই দিন বাসায় ফিরে এসে খুব ভাল ঘুমালাম। ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখলাম, ম্যারাথন লেকের শ্বেতপাথরের বাঁধের পূর্ব তীরের রেস্তোরাঁর সামনের সবুজ ঘাসের উপর অন্তরা আর আমি বসে আছি।

ওই রেস্তোরাঁয় আমি আগে অনেকবার গিয়েছি। সামনের সবুজ ঘাসের ওপর বসে অনেক সময় কাটিয়েছি। ওখানে একবার গিয়েছিলাম বাংলাদেশ বিমানের একজন বিমানবালার সঙ্গে। ওই বিমানবালাকে আমি রসিকতা করে মহারানী বলে সম্বোধন করতাম। আর একবার ওখানে মিসরীয় সংবাদপত্র আল আহরামের সুন্দরী এক মহিলা সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। ওই মহিলা সাংবাদিক আর আমি একসঙ্গে এথেন্সে ফিরেছিলাম। সে আমার হোটেলেও এসেছিল এবং আমরা একসঙ্গে ম্যাট্রেক্স ব্রাস্তিও পান করেছিলাম।

বাংলাদেশ বিমানের বিমানবালা মহারানী অথবা মিসরীয় সাংবাদিককে স্বপ্নে না দেখে দেখলাম আমার আত্মীয়া অন্তরা এবং আমি ম্যারাথন লেকের রেস্তোরাঁর সামনে সবুজ ঘাসের ওপর বসে আছি। ১৯৫৮ সালে অন্তরা দেখতে যেমনটা ছিল, তেমনটাই তাকে দেখাচ্ছিল। সে বেশিরভাগ সময় নীল শাড়ি পরত। স্বপ্নেও দেখলাম, সে নীল শাড়ি পরিহিত এবং তার হাতে ‘শুন বরনারী’ উপন্যাস খান।

স্বপ্নটা ভেঙ্গে যখন জেগে উঠলাম, তখন মনে হলো ব্যাপারটা যেন স্বপ্ন নয়, যেন সবকিছু একদম সত্যি। স্বপ্ন ভেঙ্গে যাওয়ার পর বাস্তবে ফিরে আসতে আমার একটু সময় লেগেছিল।

বাস্তবে ফিরে এসে এমন স্বপ্ন আমি কেন দেখলাম, তা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করলাম। লেখার শুরুতে আমি দাবি করেছি, অন্তরার সঙ্গে আমার সুসস্পর্ক ছিল, অবশ্য তা প্রেম-ভালবাসার নয়। হয়ত তখন আমরা মুখে প্রেম-ভালবাসার কথা বলিনি। কিন্তু অবচেতন মনে নিশ্চয়ই তার প্রতি আমার যথেষ্ট কামনা-বাসনা ছিল। সিগমু ফ্রয়েড তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় অবচেতন মনের প্রসঙ্গে যা কিছু বলেছেন, তাহলে তা সবই সত্যি। অনেক দিন আগে ফ্রয়েডের স্বপ্নের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সম্পর্কিত একখানা বই কিনেছিলাম। ফ্রয়েডের মতে, স্বপ্নে অবচেতন মনের অনেক ইচ্ছাই প্রতিফলিত হয়।