২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যাপিত জীবন এবং আধুনিক কবিতা

  • রেহানুল হক

‘নদী চলতে চলতে বাঁক নেয়, যেখানে বাঁক নেয় সেখানে আধুনিকতা’- আধুনিকতা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের এই কথাটি যুক্তিগ্রাহ্য। যদিও সময়ের মানদ-ে সমসাময়িকতাকেই আধুনিকতা মনে করা হয়। স্বীকার্য যে, পরিবর্তিত পরিস্থিতি আধুনিক কিন্তু একে সময়ের উত্তর, পূর্ব বিবেচনায় এনে বিচার করলে উরুবাম্বা নদীর পাদদেশ থেকে ৬০০ মিটার খাড়া উঁচু পাহাড়ে অবস্থিত ইনকা শহর মাচুপিচু-কে মধ্যযুগীয় বলতেই হয়। কিন্তু সময়ের চেয়েও অগ্রগামী মাচুপিচু আজও বিস্ময় এবং কালবিচারে চির-আধুনিক।

তবে সাহিত্যে আধুনিকতা বলতে আমরা বুঝি বিংশ শতাব্দীর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রচিত আমূল বিকশিত সাহিত্য। পরিবর্তিত নানা প্রেক্ষাপটে এর বীজ রচিত হয় শতাব্দীর শুরুতে। প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাস ও মূল্যবোধের বিরুদ্ধে দেখা দেয় তীব্র অভিঘাত। এ শতাব্দীতে শিল্প বিপ্লবের ফলে নতুন নতুন শহর প্রতিষ্ঠা পায়, ব্যাপক উন্নয়ন হয় যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্থাপত্য ও প্রকৌশল বিদ্যায়। গড়ে উঠে শিল্পকারখানা, রাস্তাঘাট, স্টিম ইঞ্জিন ও গ্যাসবাতি। জনসংখ্যা বিপুল হারে বেড়ে গিয়ে ফাঁকা জায়গাগুলো পূর্ণ হয়, দলে দলে মানুষ এসে ভিড় করে শহরে। বেড়ে যায় হৈ-চৈ, গোলমাল, কর্মব্যস্ততা। সবকিছুর দাম বেড়ে গেলেও মানুষের দাম কমে যায়। ফলে শিশুদের বাধ্য করা হয় শ্রমে, মেয়েরা রত হয় দেহ-ব্যবসায়। শ্রমিক-মালিকের দ্বন্দ্ব জন্ম দেয় শ্রেণী-বৈষ্যমের। উপরন্তু, দু’দুটো বিশ্বযুদ্ধ জীবনকে পৌঁছে দেয় অন্ধকারের উৎসমুখে। চারদিকে দেখা যায় নৈরাজ্য, অনাচার, অবক্ষয় ও ধ্বংসযজ্ঞ। কিন্তু এ ধ্বংসযজ্ঞের ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে আসেনি শুভ আত্মা। ফলে কোলাহলপূর্ণ নগরেও পরিবর্তনকামী কবি হয়ে পড়েন নিঃসঙ্গ ও একাকী-খ-িত ও বিচ্ছিন্ন। কিন্তু পরিবর্তন থেমে থাকেনি। শুধু প্রচলিত ধ্যান-ধারণা, ছন্দ, বাক্য, বিন্যাসের শৃঙ্খল ভঙ্গই নয়- চিন্তা-চেতনায় কবি উন্মোচিত করতে থাকেন নতুন নতুন দিগন্ত। এক কথায় বলতে গেলে এভাবেই গড়ে উঠে আধুনিক সাহিত্য।

ভার্জিনিয়া উলফের মতে মানব প্রকৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসে ১৯১০ এর ডিসেম্বর থেকে, কিন্তু এ পরিবর্তনের লক্ষণ স্পষ্ট হয়েছিল ভিক্টোরীয় যুগেই- ১৮৫৭ সালে, আধুনিকদের আদি দেবতা বোদলেয়ারের ‘খবং ঋষবঁৎং ফঁ গধষ’ (ঞযব ঋষড়বিৎং ড়ভ ঊারষ) প্রকাশের মধ্য দিয়ে। গ্রন্থটি প্রকাশের পর পরই তুমুল আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। সুরা, লেসবিয়ানিজম, পবিত্র ও অশুচি প্রেম, বিষাদ, শহুরে দুর্নীতি প্রভৃতি বিষয়ের অবতারণায় গ্রন্থটি অশ্লীলতার দায়ে অভিষিক্ত হয়। তবে কয়েকটি কবিতাকে সমালোচকরা প্রেম, শিল্প ও কাব্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত করেন। অনস্বীকার্য যে, বইটির মাধ্যমে বোদলেয়ার আধুনিক কবিতায় যে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে তা দেখিয়ে দিয়ে গেলেন।

শতাব্দীর প্রথমার্ধে ১৯২২ সালে ‘ঞযব ডধংঃব খধহফ’ নামে একটি অবিস্মরণীয় কবিতা প্রকাশ পায়। নতুন শিল্প আঙ্গিকে কবিতাটির বিশেষত্ব প্রথাগত ও ব্যক্তিগত প্রতীক, ইতিহাস প্রসঙ্গ, মিথ, উপমা এবং নানারকম উদ্ধৃতির ব্যবহারে। অবজেকটিভিটির আড়ালে ইতিহাস সচেতন কবি মূলত সাবজেকটিভ উপলব্ধিগুলোকেই প্রাণ দিয়েছেন। আর এ প্রয়াসই এলিয়টকে হোমার, ভার্জিল, দান্তে, শেক্সপিয়ার এবং বোদলেয়ারের কাতারে নিয়ে এসেছে। অবক্ষয়পূর্ণ আধুনিক জীবনের প্রতীক কবিতাটি পাঁচটি বিচ্ছিন্ন অংশে বিভক্ত যা আবার আধুনিক জীবনের বিচ্ছিন্নতাকে নির্দেশ করে। উপসংহারে কবি বলেছেন, ‘যবৎব রং হড় ধিঃবৎ নঁঃ ড়হষু ৎড়পশ’. এই ‘ধিঃবৎ’ হলো নিঃস্বার্থ প্রেম এবং দয়ার প্রতীক, ‘ৎড়পশ’ হলো পার্থিব লালসা এবং ভোগের প্রতীক। ইন্দ্রিয়াসক্তি, পার্থিব সম্পদের মোহ পোড়ভূমির মূল ব্যাধি কিন্তু এর নিগড় থেকে মুক্তির উপায়ও কবি নির্দেশ করেছেন। তা হলো Datta, Dayadham, Damayanta-i চর্চা। নিঃসন্দেহে বলা যায়, এই একটিমাত্র কবিতাই এলিয়টকে ব্যাপক খ্যাতি এনে দেয়। কিন্তু উপলব্ধির তীক্ষèতায় ‘ঞযব খড়াব ঝড়হম ড়ভ ঔ. অষভৎবফ চৎঁভৎড়পশ’ও কম যায় না। সৌন্দর্য এবং শিল্প সচেতন পাঠক মাত্রই একমত হবেন যে কবিতা দু’টির মাধ্যমে এলিয়ট চেতনার এক নতুন জগত উন্মোচন করেছেন।

কয়েকজন মহাপুরুষের জন্ম দিয়ে আয়ারল্যান্ড বিশ্বসাহিত্যে অমর হয়ে রয়েছে। এদের মধ্যে জেমস জয়েস উপন্যাস, বার্নাড শ’ নাটকে এবং ইয়েটস ও সীমাস হীনি কবিতায় উজ্জ্বল নক্ষত্র। আইরিশ সাহিত্যের পুনর্জাগরণে ইয়েটসের অবদান অতুলনীয়। ১৯২৩ সালে প্রথম আইরিশ হিসেবে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। নোবেল কমিটি তার কবিতার মূল্যায়নে বলেছিল ‘inspired poetry, which in highly artistic form gives expression to the spirit of a whole nation.’ অতীন্দ্রিয়বাদ, আধ্যাত্মবাদ, গুহ্যতত্ত্ব এবং জ্যোতির্বিদ্যায় আগ্রহী এ কবির কাব্য কেল্টিক উপকথা, রূপকথা, স্বপ্ন, মায়া, অতিপ্রাকৃত বস্তুতে পূর্ণ হলেও ব্যবহৃত প্রতীকগুলো একান্ত তার নিজস্ব। যুগের অবক্ষয়ে কবি অবলোকন করেন ‘Things fall apart, the centre cannot hold.’ কিন্তু কবির বিশ্বাস ২০০০ বছর পরে হলেও এ সঙ্কট একদিন কেটে যাবেই। কবির cœbMix Byyantium- যে ইুুধহঃরঁস এ বার্ধ্যকের কোন স্থান নেই, যা চিরসুন্দর, চির আনন্দের।

ইয়েটসের পরই যে আইরিশ কবির কবিতা কাব্যপ্রেমীদের হৃদয় ছুঁয়ে যায় তিনি সীমাস হীনি। মূলত গীতিকবি হীনি তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক এবং ব্যক্তি সম্পর্ক নিরূপণের পাশাপাশি ইতিহাস এবং ব্যক্তি চেতনার ছেদবিন্দু নির্ণয় করেছেন। তবে হীনির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব পল্লী কবিতার আধুনিকায়ন। কৃষকের সন্তান হীনি গ্র্যাজুয়েট হলেও আত্মপরিচয় বিস্মৃত নন। তাই তো তিনি ছেলেবেলায় তাঁর স্কুল শিক্ষক ব্যাঙের জীবণচক্রের যে শিক্ষা তাঁকে দিয়েছিলেন তা আজও অবলীলায় বলতে পারেন। ব্যবহার করতে পারেন দশ বছরের বালকের মিষ্টি স্বরে উচ্চারিত শব্দগুলো যেমন- Slap, plop, farting, clotted, slobber ইত্যাদি। হীনির বর্ণনায় আরও লুকিয়ে থাকে ইন্দ্রিয়ানুভূতির শিহরণ। পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য খুঁজতে গিয়ে তাই অনুভবে আসে ‘The cold smell of potato mould , the squelch and slap/ Of soggy peat, the curt cuts of an edge/ Through living roots awaken in my head.’ (Digging)

বিংশ শতাব্দীর কোন বিপ্লবী কবির নাম তুললে প্রথমেই মায়াকোভস্কির নাম আসে। কাব্যবৈশিষ্ট্যে গীতিধর্মী, সরস, কৌতুকপ্রবণ, বহুদর্শী, গভীর আবেগতাড়িত, কখনওবা ক্রোধান্বিত এবং আপাদমস্তক বিপ্লবী। বলশেভিক সমর্থক এ কবি ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে জারতন্ত্রের পতনের পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। আবেগে পূর্ণ এবং রূপকালঙ্কারে সজ্জিত তাঁর কবিতাসমূহ একদিকে যেমন ক্রোধের আগুনে উন্মত্ত করে তেমনি জীবনের জয়গানেও উজ্জীবিত করে। সন্দেহ হয় ‘ঙঁৎ গধৎপয’ কবিতাটিই একটি নতুন সমাজের ভিত গড়েছিল কিনা! Beat the squares with the tramp of rebels! Higher, rangers of haughty heads! We’ll wash the world with a second deluge, Now’s the hour whose coming it dreads! (Our March) শুধু কি তাই? বিপ্লব-উত্তর পরিস্থিতিতে একটি নব্য প্রতিষ্ঠিত সমাজ ও রাষ্ট্র দাবি করে একটি নতুন স্বর, নতুন ভাষা বা নতুন কবিতা! মায়াকোভস্কি সে চাহিদাও পূর্ণ করেন।

এ তো গেল একটি সমাজকে ভেঙ্গে আরেকটি সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা। কিন্তু একটি রাস্তার ভাষা তুলে এনে একটি জাতির মুখে যিনি ভাষা জুড়ে দেন তিনি ইয়েহুদা এ্যামিচাই। ১৯৪৮ সালে বেলফোর চুক্তির মাধ্যমে ইসরাঈল প্রতিষ্ঠা পায়। ইউরোপের নানা জায়গা থেকে ইহুদীরা এসে নতুন রাষ্ট্রে জমায়েত হয়। কিন্তু তাদের ভাষা ছিল ভিন্ন ভিন্ন। অপরদিকে হিব্রু সীমাবদ্ধ ছিল বড়জোর ফেরিওয়ালা, মুদি দোকানদার, বস্তি বা বাইবেলের মধ্যেই। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতারা তাই নবগঠিত রাষ্ট্রটির জন্য একটি জাতীয় ভাষা চাইলেন এবং যা অবশ্যই ইউরোপীয় কোন ভাষা থেকে নয়। আর এ কাজটি করতেই এগিয়ে এলেন ইয়েহুদা এ্যামিচাই। সাহিত্যের মাধ্যমে তিনি হিব্রুকে জনপ্রিয় করলে অবশেষে লুপ্ত ভাষা আবার প্রাণ ফিরে পেল।

প্রাত্যহিক জীবনের সমস্যা ও সম্ভবনাই এ্যামিচাইয়ের কবিতার বিষয়বস্তু। রূপকের ছলে লিখেন তিনি। যে ইতিহাস হারিয়ে যেতে বসেছে সে ব্যাপারেও তিনি অত্যন্ত সজাগ। জীবনানুভূতির রসেবং সজীবতা তাঁর কাব্যকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।

লক্ষণীয় যে, যে জাতিসত্তার উৎকর্ষ ও বিকাশের জন্য এ্যামিচাই লড়াই করলেন তা প্রতিষ্ঠা পেল আরেক সার্বভৌম জাতিকে উৎপাটিত করে। ফলে ইহুদীরা শান্তির নিবাস পেল ঠিকই কিন্তু ফিলিস্তিনীরা হয়ে পড়ল উদ্বাস্তু। মহান কবি মাহমুদ দারবিশও এ থেকে বাদ গেলেন না। একসময় পারিবারিক জমিদারি থাকলেও গ্যালিলি থেকে তাদের পালিয়ে যেতে হলো লেবানন- জেযিন এবং দামুর। ইহুদীরা তাঁর সেই ফেলে আসা গ্রামকে নিশ্চিহ্ন করল। তাই এক কবিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিলেন আরেক কবি। কারণ একজনের ধ্বংসের বিনিময়ে আরেকজন নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছে তাঁর-ই ইতিহাস। তাই এখন প্রতিযোগিতা হিব্রু আসলে কার? তবু দারবিশ তো কবি। তাই তো তিনিই বলতে পারেন ‘The first teacher who taught me Hebrwe was a Jew. The first love affair in my life was with a Jewish girl. The first judge who sent me to prison was a Jewish woman. So, from the beginning I didnt see Jews as devils or angels but as human beings.

একজন কবি ধর্ম, জাত-পাত প্রভৃতির উর্ধে। কিন্তু বোধশূন্য বর্বরদের জন্য কবিকেও আজ সংগ্রাম করতে হয় জাতিসত্তার। মাহমুদ দারবিশ তাই গর্জে ওঠেন-

Write down

I am an Arab

And I work with comrades in a stone quarry

And my children are eight in number.

For them I hack out

a loaf of bread

clothing

A school exercise-book

From the rocks

Rather than begging for alms

At your door

Rather than making myself small

At your doorsteps.

Does this bother you?

মাহমুদ দারবিশ লিখেছেন ক্ল্যাসিকাল আরবীয় স্টাইলে। তবে প্রথমদিকে প্রথাগত ছন্দবদ্ধতা অনুসরণ করলেও পরবর্তীতে লিখতেন মুক্তছন্দে, ভাষারীতি বরাবর-ই সরল।

বিজ্ঞান ও মানবিক বিদ্যার মাঝে একটি কৃত্রিম বিভেদ বহু আগে থেকেই চলে আসছে। আর্নল্ড টয়েনবীর ইতিহাসে নেই যেমন কোন বিজ্ঞানীর নাম তেমনি বিজ্ঞানী মহলেও কবিরা উপেক্ষিত। একদল অপরদলকে বলে অনুভূতিহীন, অপরদল এ দলকে বলে দায়দায়িত্বহীন। কিন্তু উভয়ের-ই সাধারণ কাজ যে প্রকৃতির অবাধ রহস্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া, মনের অগাধ প্রসার ঘটানো, তা দেখিয়ে দিলেন মিরোশ্লাব হোলুব। পেশায় চিকিৎসক (সমসাময়িক কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইমিউনোলজিস্ট), নেশায় কাব্যপ্রেমী। আপাত দৃশ্যগত দু’টি বিপরীতমুখী স্রোত একবিন্দুতে মিলিত হলে যে অপরূপ বর্ণাঢ্যতার সৃষ্টি করে তার যথার্থ প্রমাণ হোলুবের কবিতা। সূক্ষ্ম, সমালোচনামূলক, নিরাবেগ, নিরীক্ষাধর্মী, কৌতুকরসপ্রবণ এবং মায়াময় দৃষ্টিতে পৃথিবীকে দেখেন তিনি। তাঁর কবিতায় রূপক, বিশেষ করে বিজ্ঞান ঘনিষ্ঠ রূপকের ব্যবহার প্রচুর যা এক আণুবীক্ষণিক জগতকে উন্মোচিত করে বলে কবির অভিমত। এছাড়া মিথ এবং ইতিহাসের প্রয়োগেও তিনি সিদ্ধহস্ত। কিন্তু সাধারণ শব্দগুচ্ছকেই সাধারণ প্রকাশভঙ্গিতে অসাধারণ মানে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা হোলুবকে ভিন্নতর এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ‘ঞযব ঈধঃ’ কবিতাটি লক্ষ্য করলে দেখা যায় এখানে রাতকে তুলনা করা হয়েছে অক্ষরবিহীন বইয়ের সাথে (ধ নড়ড়শ রিঃযড়ঁঃ ষবঃঃবৎং)। সাধারণত কোন উপমা বা উৎপ্রেক্ষা কোন কিছুকে বুঝতে সাহায্য করে কিন্তু এখানে সৃষ্টি হচ্ছে বিভ্রান্তি। প্রশ্ন জাগে রাত কিভাবে অক্ষরহীন? হলেও তা কি রহস্যঘেরা না শূন্য? আকর্ষণীয় না অর্থহীন? আবার the eternal dark/ dripped to the stars- drip’ বোঝায় নিচে পড়াকে কিন্তু তারা তো উপরে। আবার মনে হয় কবিতাটির কি আরও কোন তাৎপর্য রয়েছে! ‘নষধপশ পধঃ’ বলতে হোলুব কি মৃত্যুকে বোঝাতে চান রাতের মতোই যা রহস্যঘন? বিড়ালটিকে বাইরে না যেতে তিনি কাকুতি মিনতি করছেন তবু বিড়ালটি অন্ধকারে হারিয়ে গেল এর অর্থ কী এরূপ নয় যখন আমরা প্রিয়জন কাউকে মৃত্যুবরণ না করার অনুনয় করি কিন্তু তবু সে মৃত্যুবরণ করে।

‘অনুবাদে যে জিনিসটি হারিয়ে যায় সেটিই কবিতা’ রবার্ট ফ্রস্টের এ কথাটি অন্তত একজনের ক্ষেত্রে সত্য নয় তিনি টমাস ট্রান্সট্রোমার। ২০১১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী সদ্য প্রয়াত এ কবি সমসাময়িক কালের শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন। দীর্ঘদিনের বন্ধু রবার্ট ব্লাই ট্রান্সট্রোমারের সুন্দরতম কবিতাগুলোর অনুবাদ করেছেন। তাঁর অভিমত শব্দ, ছান্দসিক ঋতু টমাসের কবিতার আবহ তৈরি করে এবং মূলত আধুনিকতা, এক্সপ্রেশনিজম, অতিপ্রাকৃত বা শক্তিশালী চিত্রকল্প, নিঃসঙ্গ ও বিচ্ছিন্ন জীবনচারিতা তাঁর কাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য, কিন্তু পাঠককে গোলকধাঁধার সম্মুখীন করার যে ক্ষমতা টমাসের তা তাঁকে অনন্যতা দিয়েছে। ফলে পাঠক ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না একেবারেই সহজ কথাগুলো দিয়ে কবি কী বোঝাতে চান। যেমন-

ÒThe music is a house of glass standing on the slope

Rocks are flying, rocks are rolling

The rocks roll straight through the house

But every pane of glass is still wholeÓ.

(Allegro)

ট্রান্সট্রোমার একজন মনোবিশারদ। পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হওয়ার পূর্বে তিনি কিশোর অপরাধী, অক্ষম ও নেশায় আসক্তদের নিয়ে কাজ করতেন। মনোচিকিৎসক হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতার প্রতিফলন তাই বিভিন্ন কবিতায় সহজেই লক্ষণীয়।

এভাবেই ভিক্টোরীয় যুগের শেষার্ধে, আধুনিক এবং উত্তর-আধুনিককালে কবিরা চেতনা এবং শিল্পের নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে গেছেন। মানতেই হয় আজ যা আধুনিক কোন এক সময় সেটাই প্রাচীন বলে গণ্য হবে। তবু মাচুপিচু বা চেচেন ইটযার মতো কিছু শৈল্পিক সৌন্দর্য রয়ে যাবে যা চির-আধুনিক। এ যেন হ্যাম্পস্টেডে ব্রাউনের বাগানবাড়িতে ঘনিয়ে আসা অন্ধকারে বিষণœ কবি জন কীটসের শোনা সেই নাইটিঙ্গেলের গানের মতোই সত্য ও শাশ্বত; যা শুনেছে অনেক সম্রাট, কৃষক, বাইবেলের দুঃখিনী নারীরুকথা এবং এখন কবি যা শুনছেন, ভবিষ্যতেও অনেকে যা শুনে থাকবে। আর এ চিরসত্যের ছোঁয়া পেতেই এই মহাপুরুষদের অভিযাত্রা। তাদের কর্মযজ্ঞে একটি বিষয়ই প্রমাণিত হয় পৃথিবীতে মানুষ নামক প্রাণীটি দু’শ্রেণীর। একদল অনুভূতিহীন এবং তারা সুখেই থাকে, আরেকদল অনুভূতিশীল এবং কবি জন কীটসের মতোই তারা উপলব্ধি করতে পারে না যে তারা জাগ্রত না ঘুমিয়ে?