১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নিরাপত্তা ঝুঁকির দোহাই তুলেই অস্ট্রেলিয়ার ঢাকা সফর স্থগিত

স্পোর্টস রিপোর্টার ॥ যে রকম ভাবা হচ্ছিল, তাই ঘটল। বাংলাদেশ সফর স্থগিত করল অস্ট্রেলিয়া। সেই সঙ্গে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজও স্থগিত হয়ে গেল। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে এ সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।

নিরাপত্তার অজুহাত তুলে এক মাসের লম্বা সফরে আসছে না অস্ট্রেলিয়া। সিরিজে ৯ অক্টোবর থেকে চট্টগ্রামে ও ১৭ অক্টোবর থেকে ঢাকায় একটি করে টেস্ট ম্যাচ ছাড়াও ফতুল্লার খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামে ৩ অক্টোবর থেকে একটি তিনদিনের প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার কথা ছিল স্টিভেন স্মিথদের। কিন্তু এখন আর কিছুই হচ্ছে না। সফর স্থগিত করার ঘোষণা ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার (সিএ) প্রধান নির্বাহী জেমস সাদারল্যান্ডই জানিয়ে দিয়েছেন। সাদারল্যান্ড বলেছেন, ‘ছয়দিন আলোচনা ও নিরাপত্তা বিষয়ক নানা রকম প্রচেষ্টা ও অনুসন্ধানের পর আমরা এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে, এই মুহূর্তে সিরিজটা আপাতত স্থগিত করা ছাড়া আমাদের হাতে আর কোন পথ খোলা নেই। আমাদের দিক থেকে বিবেচনা করলে এটা সত্যিই হতাশার।’ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিজামউদ্দিন চৌধুরী সুজন বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

শুধু ক্রিকেটই নয়, ১৭ নবেম্বর যে বাংলাদেশে এসে বিশ্বকাপ ফুটবলের বাছাইপর্বের ম্যাচ খেলার কথা অস্ট্রেলিয়ার; তা নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। জর্দান, কিরগিজস্তানের মতো দলগুলো এখানে এসে বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব খেলেছে। কোন সমস্যা হয়নি। অথচ অস্ট্রেলিয়ানরা সেই ম্যাচ বাংলাদেশে না খেলার বিষয়ে এরইমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে। বিশ্ব ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা ও এশিয়ার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা এএফসির কাছে এরইমধ্যে অস্ট্রেলিয়া নিরাপত্তা ইস্যুর কথা জানিয়েছে।

অবশ্য বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজ বাতিল করে দেয়া হয়নি। ভবিষ্যতে এই সিরিজ পুনরায় আয়োজনের একটা পথ খোলা রেখেছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। সাদারল্যান্ড বললেন, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও বাংলাদেশ সরকারের বৈদেশিক সম্পর্ক বিভাগের সঙ্গে আমাদের তিন কর্মকর্তা বৈঠক করেছেন। আর সবকিছু বিবেচনা করেই আমরা সিরিজ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে, এখন সামনে কবে এই সিরিজটা আয়োজন করা যায় সেই বিষয়ে আমরা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছি।’

যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে, তাতে এ বছর আর সিরিজ হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। এ বছর বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কোন আন্তর্জাতিক ম্যাচ নেই। তবে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল অনেক ব্যস্ত থাকবে। বাংলাদেশের আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা আছে আগামী বছর জানুয়ারিতে। অস্ট্রেলিয়া সেই সময় পর্যন্ত মহাব্যস্ত। নবেম্বর-ডিসেম্বরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ খেলবে। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ খেলবে। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ভারতের বিপক্ষে সিরিজ খেলবে অস্ট্রেলিয়া। আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে আবার নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার সিরিজ রয়েছে। শুধু ফেব্রুয়ারি পর্যন্তই নয়, এমনকি ২০১৬ সালেও ব্যস্ততার জন্য বাংলাদেশে এসে খেলার সুযোগ পাবে না অস্ট্রেলিয়া।

অস্ট্রেলিয়ার সফর স্থগিতের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের ক্রিকেটেরই ক্ষতি হয়ে গেল। সব প্রস্তুতি নেয়া হয়ে গেছে। বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটাররা প্রস্তুত সিরিজ খেলতে। কর্মকর্তারাও সিরিজ আয়োজন করতে মাঠের বাইরের সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। কিন্তু হঠাৎ খবর মিলল হতাশার।

অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটাররা বাংলাদেশে খেলতে না আসায় শুধু যে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজ হচ্ছে না, এমনটি নয়। এর প্রভাব সামনে বাংলাদেশের ক্রিকেটে ভালভাবেই পড়তে পারে। এবারই প্রথমবারের মতো কোন আন্তর্জাতিক দল নিরাপত্তা ঝুঁকি বা জঙ্গী হামলার দোহাই দিয়ে বাংলাদেশে আসতে অস্বীকৃতি জানালো। এর আগে ২০১৩ সালের শেষের দিকে হোটেলের বাইরে ককটেল বিস্ফোরণের পর সিরিজের মাঝপথেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ অনুর্ধ ১৯ দল দেশে ফিরে যায়। অস্ট্রেলিয়ার এমন সিদ্ধান্তে এখন জানুয়ারিতে বাংলাদেশে অনুষ্ঠেয় অনুর্ধ ১৯ বিশ্বকাপেও প্রভাব পড়তে পারে।

নতুন অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথের নেতৃত্বে দুটি টেস্ট খেলতে গত সোমবার অস্ট্রেলিয়া দলের বাংলাদেশ সফরে আসার কথা ছিল। কিন্তু দলের নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে বাংলাদেশ সফরে স্মিথদের আসতে দেয়নি ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। সফরে আসার দু’দিন আগে গত ২৬ সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান নির্বাহী জেমস সাদারল্যান্ড জানান, নিরাপত্তা ইস্যুতে ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় আসছে না অসিরা। এ প্রসঙ্গে সাদারল্যান্ড জানান, ‘পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগের পরামর্শে আমরা খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার কথা ভেবে বাংলাদেশ সফর সাময়িক স্থগিত করেছি। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা বিবেচনায় অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সতর্কাদেশের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এখান থেকে একটি বিশেষজ্ঞ নিরাপত্তা দল বাংলাদেশে যাবে। তাদের তথ্যের উপর ভিত্তি করে সংশোধিত তারিখ চূড়ান্ত করা হবে।’

পরদিন ২৭ সেপ্টেম্বর দুপুর পৌনে ১২টায় অস্ট্রেলীয় নিরাপত্তা পর্যবেক্ষক দলের প্রধান শন ক্যারলসহ দু’জন ঢাকায় পৌঁছান। দলটি ২৮ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা বৈঠক করে। এ সময় অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল বাংলাদেশে খেলতে এলে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার আশ্বাস দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কিন্তু উত্তরে নিজেদের সিদ্ধান্ত জানায়নি ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা প্রতিনিধি দল। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও ছিলেন স্বরাষ্ট্রসচিব ড. মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক খান, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন এমপি, সহ-সভাপতি মাহবুব আনাম, সিইও নিজামউদ্দিন চৌধুরী সুজন, র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোঃ আছাদুজ্জামান মিয়াসহ নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে ছিলেন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা প্রধান শন ক্যারল, বাংলাদেশে নিযুক্ত সে দেশের হাইকমিশনার এইচইমি গ্রেগ উইলককসহ মোট ৬ জন। শন ক্যারল চলেও গেছেন মঙ্গলবার। কিন্তু কোন সিদ্ধান্ত তখন জানানো হয়নি। উল্টো অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের ক্রিকেটারদের রাজ্য দলের অনুশীলনে যোগ দেয়ার জন্য বলা হয়েছে। যাতে করে অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশ সফর বাতিল হওয়ার ইঙ্গিতই মিলেছে।

এরসঙ্গে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রর পক্ষ থেকে অস্ট্রেলিয়ান সরকারকে বাংলাদেশের নিরাপত্তার বিষয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে। বারবারই বলা হচ্ছিল, বাংলাদেশে পশ্চিমা নাগরিকদের ওপর জঙ্গী হামলা হতে পারে। এর সঙ্গে গত সোমবার রাতে গুলশান এলাকাতে এক ইতালিয়ান নাগরিকের হত্যা ও তার দায় ইসলামিক স্টেট (আইএস) নিয়ে নেয়ায় পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে। তখনই বোঝা যায় সফর বাতিল হতে চলেছে। অবশেষে বৃহস্পতিবার ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার কর্মকর্তারা দীর্ঘ সভার পর সফর স্থগিত করার সিদ্ধান্তই বিসিবিকে জানিয়ে দেয়।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীরও একই রা ॥ কূটনৈতিক রিপোর্টার জানান, ইতালির নাগরিক তাভেলা সিজার হত্যার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তা নিয়ে পশ্চিমা কূটনীতিকদের উদ্বেগের মধ্যে ঢাকা সফর স্থগিত করেছেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুগো জর্জ উইলিয়াম সয়ার। এদিকে ইতালীয় নাগরিক হত্যার ঘটনায় আইএসের জড়িত থাকার কোন তথ্য পুলিশ পায়নি বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সূত্র জানায়, ব্রিটিশ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুগো জর্জ উইলিয়াম সয়ারের আগামীকাল শনিবার ঢাকা সফরে আসার কথা ছিল। তিনি আপাতত ঢাকা সফর স্থগিত করেছেন। ব্রিটিশ হাইকমিশনের এক মুখপাত্র বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, লন্ডনে অনিবার্য কারণে তার সফরসূচী পরিবর্তন করা হয়েছে। এর সঙ্গে বাংলাদেশে নিরাপত্তার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নয়। তিনি জানান, খুব শীঘ্রই আবারও এ সফর অনুষ্ঠিত হবে।

এদিকে বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ঢাকায় ইতালীয় নাগরিক নিহত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জঙ্গী কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ওয়েবসাইট ‘সাইট ইনটেলিজেন্স’ গ্রুপ জানায় হত্যাকা-ের দায় স্বীকার করেছে জঙ্গী সংগঠন আইএস। কিন্তু পুলিশ আইএসের নিজস্ব ওয়েবসাইটে এই হত্যাকা- নিয়ে এ ধরনের কোন দাবিই দেখতে পায়নি।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, হত্যাকা-ের ঘটনায় ফৌজদারি আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। বর্তমানে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার ১১ সদস্যের তদন্ত দল এ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। অচিরেই পুলিশ এ বিষয়ে তদন্ত রিপোর্ট দেবে বলে আশা করা যায়। পুলিশের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে প্রকৃত খুনীদের গ্রেফতার করে অবশ্যই বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ঘটনার পর গুলশান ও বারিধারা এলাকার কূটনৈতিক জোনে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে, পুলিশ পেট্রোলও বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া সকল বিদেশী সংস্থা, অফিস ও বাসভবন, গুরুত্বপূর্ণ হোটেল, ক্লাব এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নজরদারি বাড়ানোর জন্যও ঢাকা মহানগর এলাকার সকল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্যরাও সাধারণ পেশাকে নজরদারি অব্যাহত রেখেছে।