২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দেশে পথশিশু ১০ লাখ, রাতে ঘুমানোর বিছানা নেই শতকরা ৪১ জনের

দেশে পথশিশু ১০ লাখ, রাতে ঘুমানোর বিছানা নেই শতকরা ৪১ জনের
  • আজ জাতীয় পথশিশু দিবস

নিখিল মানখিন ॥ দু’টি শিশু সন্তান নিয়ে রাজধানীর মগবাজার এলাকায় ভিক্ষা করেন রোজিনা বেগম (৩৮)। বড় ছেলের বয়স সাড়ে পাঁচ বছর, ছোট ছেলেটি চারে পা দিয়েছে। অনেক আগেই তাদের ত্যাগ করে অন্যত্র চলে গেছেন পিতা মোঃ মোসলেম। বাংলামোটর পরীবাগ রাস্তার ফুটপাথে পলিথিনের কুঁড়েঘরে থাকে তারা। দোকানদার ও পথচারীদের কাছে মা রোজিনা বেগম ভিক্ষা চাইলে শিশু দু’টিও হাত পাততে শুরু করে। মায়াবি চেহারার শিশুদের হাতে টাকাও তুলে দেন পথচারীদের কেউ কেউ। কাউকে খেতে দেখলেই চাইতে থাকে শিশু দু’টি। অনেকে খাবারের কিছু অংশ তাদের খাওয়ান। অজান্তেই মায়ের সঙ্গে ভিক্ষাবৃত্তি করে যাচ্ছে শিশু কাইয়ুম ও উমর। এভাবে এই দু’টি শিশুর মতো দেশের অসংখ্য পথশিশুর ভবিষ্যৎ জীবন হয়ে পড়েছে অনিশ্চিত। তাদের অনেকেই নানা অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। এমনি এক পরিস্থিতিতে শুক্রবার পালিত হবে জাতীয় পথশিশু দিবস।

বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা সোশ্যাল এ্যান্ড ইকনোমিক এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগামের (সিপ) ‘পথশিশুদের অমানবিক জীবন ও বিভিন্ন সমস্যা শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থের অভাবে পথশিশুদের ৭৫ ভাগ ডাক্তারের কাছে যেতে পারে না। অসুস্থ হলে তাদের প্রায় ৫৪ ভাগের দেখাশুনার জন্য কেউ নেই। পথশিশুদের প্রায় ৪০ ভাগ প্রতিদিন গোসল করতে পারে না। আর ৩৫ ভাগ শিশু খোলা জায়গায় পায়খানা করে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে ওঠে তারা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে পথশিশুর সংখ্যা । দেশে বর্তমানে পথশিশুর সংখ্যা ১০ লাখ। অথচ ক্রমবর্ধমান এ শিশুদের কল্যাণে নেই কোন নীতিমালা। সরকার ঘোষিত ভিশন ২০২১ অর্জন করতে হলে এখনই এ শিশুদের কল্যাণে একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা তৈরি প্রয়োজন। পথশিশুদের প্রায় ৪৪ ভাগ ধূমপান করে এবং রাতে ঘুমানোর জন্য ৪১ ভাগ শিশুর কোন বিছানা নেই। কোন মতে খাবার জোগাড়ের জন্য ৮০ ভাগ পথশিশু বিভিন্ন ধরনের কাজ করে। ৮৪ ভাগের কোন শীতবস্ত্র নেই। একটি যুগোপযোগী নীতিমালা না থাকায় এই ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূল ধারায় নিয়ে আসার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। পথশিশুদের উন্নয়নে সরকারের নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগও কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করতে পারছে না। প্রতিবছর জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ থাকলেও তার সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এসব শিশু । পথশিশুদের উন্নয়নে মনযোগী না হলে, সরকার ঘোষিত ভিশন ২০২১ বাস্তবায়ন কঠিন হবে। বিগত সরকারের সময়ে পথশিশুদের উন্নয়নে একটি কার্যকর ও পরিপূর্ণ নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হলেও তা আজও বাস্তবায়িত হচ্ছে না। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শতকরা ৩৪ দশমিক ৮ ভাগ পথশিশু কোন একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসবাস করে ১ থেকে ৬ মাস। ২৯ ভাগ পথশিশু স্থান পরিবর্তন করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কারণে, আর ৩৩ ভাগ পাহারাদারদের কারণে। এরা ফুটপাথে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটালেও প্রায় ৫৬ ভাগ শিশুকে মাসিক ১৫০-২০০ টাকা নৈশ প্রহরী বা মাস্তানকে দিতে হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, রাজধানী ঢাকার একটি বড় সমস্যা পথশিশু। এসব পথশিশু পথে পথে থাকে। পথে বসবাসরত পথশিশুদের অনেকেই মা-বাবা থেকে বিচ্ছিন্ন। পথে কর্মরত পথশিশু যারা রাস্তায় জীবিকা নির্বাহ করে একটা নির্দিষ্ট সময়ে পরিবারে ফিরে যায়। আর পথে সপরিবারে বসবাসরত পথশিশু যারা পরিবারসহ পথে বসবাস করে। রাজধানীর বিভিন্ন বস্তি, রাস্তার ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল ইত্যাদিতে এদের বসবাস। অবহেলা, অনাদর, অযতœ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে ওঠে তারা। তাদের জীবনের মৌলিক অধিকারগুলো হতেও তারা বঞ্চিত। অনেকে স্কুলে গেলেও অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বিভিন্ন কারণে ঝরে পড়ে। জীবন ও জীবিকার তাগিদে তাদের অনেক ধরনের কাজের সঙ্গেই জড়িত হতে হয়। ভিক্ষা, ফুল, বিভিন্ন জিনিসপত্র রাজপথে ফেরি করা ছাড়াও গার্মেন্ট কারখানা, বাস-ট্রাকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়োজিত আছে ভাগ্য বিড়ম্বিত এ শিশুরা। এ ধরনের কর্মক্ষেত্রের বেশিরভাগই শিশু ও শিশুস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এসব পথশিশুর বিরাট অংশ বিভিন্ন অপরাধ চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। একটা দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে ওই দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর। আর আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি বিরাট অংশজুড়ে আছে পথশিশুরা। আর তাদের বাদ দিয়ে উন্নয়নের কথা চিন্তও করা যায় না। শুধু সরকার, প্রশাসন, সংস্থাই নয়, আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু দায়বদ্ধতা আছে বলে মনে করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

পথশিশুদের জীবন উন্নয়নে উদ্যোগ বাড়ছে ॥ পথশিশুদের জন্য এগিয়ে আসছে সরকারী-বেসরকারী সংস্থা। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, বর্তমান সরকার ৪০ হাজার পথশিশুকে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষা কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে আট হাজার শিশুকে প্রতি মাসে দুই হাজার টাকা করে দেয়া হচ্ছে। তারা নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে। মন্ত্রণালয় তাদের লেখাপড়ার তদারকিও করছে। পর্যায়ক্রমে সকল সুবিধাবঞ্চিত শিশুকে এ কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

এদিকে সেভ দ্য চিলড্রেন, ইউসেফ-এর মতো কিছু সংস্থা ও মানবাধিকার কর্মীরা সীমিত পরিসরে পথশিশুদের নিয়ে কাজ করছে। পথশিশুদের লেখাপড়ার পাশাপাশি কাজের সুযোগও করে দিচ্ছে। মাঝে মাঝে টাকা দিয়েও সহায়তা করছে। এছাড়া পথশিশুদের স্বপ্নপূরণ করার জন্য অপরাজেয় বাংলাদেশ, পদক্ষেপ, বার্ড, বিকশিত বাংলাদেশ, টিএসটিসি, সুইশ বাংলাদেশ, জাগো ফাউন্ডেশন, একমাত্রা, এএসডিসহ বেশ কয়েকটি এনজিও কাজ করছে। এসব এনজিওগুলোর মধ্যে কিছু এনজিওতে ডে-নাইট উভয় সময়ই পথশিশুদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে অধিকাংশ পথশিশুই এসব ডে কেয়ার সেন্টারের কথা জানে না। অপরাজেয় বাংলাদেশ পথশিশুদের শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক সহায়তাসহ নানারকমের পড়াশোনা ও খেলাধুলার কাজে নিয়োজিত করে পথশিশুদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করছে।

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া