২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রশ্ন ফাঁসের গুজবে রাজপথে অস্থিরতা থামছে না

বিভাষ বাড়ৈ ॥ প্রশ্ন ফাঁসের গুজবে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কান দেয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা বেড়েই চলেছে। পরীক্ষার আগে প্রশ্ন ফাঁসের কোন অভিযোগ না তুলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এখন পরীক্ষা দিয়েই রাস্তায় নেমে পড়ছে কিছু শিক্ষার্থী। এরা পরীক্ষার পর এমনকি ফল প্রকাশের পর নিজের দুর্বলতা টের পেয়ে রাস্তায় নেমে রীতিমতো নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। শিশুদের প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা থেকে শুরু করে মেডিক্যাল, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি, বিসিএস পরীক্ষা কোনটিকেই অস্থিরতার বাইরে রাখা যাচ্ছে না। দু’একটি ক্ষেত্রে ফাঁসের কারণে আগেই পরীক্ষা বাতিল করা হচ্ছে। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এখন পরীক্ষার পর কোন তথ্য প্রমাণ ও যুক্তি ছাড়া পরীক্ষা বাতিলের দাবি তোলা হচ্ছে। রাস্তায় নামা শিক্ষার্থীদের সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতেও সক্রিয় হয়ে উঠছে বিশেষ মহল।

প্রশ্নপত্র প্রণয়নের সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশ্ন প্রনণয়ন প্রক্রিয়া এখন যেখানে সম্পন্ন করা হয় তাতে ফাঁস হওয়া সহজ নয়। তার পরেও প্রশ্ন প্রণয়ন থেকে শুরু করে পরীক্ষা গ্রহণ পর্যন্ত ব্যাপক নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু সারাদেশে অসাধু চক্র প্রশ্ন ফাঁসের গুজব ছড়িয়ে ভুয়া প্রশ্ন বিক্রি করে বাণিজ্যে নেমে পরে। এদের কারণেই পরীক্ষার ভাল ফল করতে ব্যর্থ হওয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশ রাস্তায় নেমে পরে। এদের প্রভাবিত করার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, দু’একটি ক্ষেত্রে প্রশ্ন ফাঁস হওয়ায় মানুষ আস্থা হারিয়েছে। এখন এই আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করতে হবে। তবে দু’একবার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে বলে পরীক্ষা হলেই অযথা তথ্য প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ তুলে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এবার মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে যে লাগাতার নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির চিত্র দেখা যাচ্ছে তাতে উদ্বেগও বাড়ছে। অথচ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ পর্যালোচনা করলেই এর সত্যতার অসারতা প্রমাণিত হয়ে যায়। প্রথমত, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা দাবি করছেন অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার আগে প্রশ্ন পেয়েছে। ফলে এসএসসি ও এইচএসসিতে খারাপ ফল করা শিক্ষার্থীরা চান্স পেয়েছে। ভাল ফল করেও তারা চান্স পায়নি ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ মেধাতালিকাতেই দেখা যাচ্ছে, এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফলে সর্বোচ্চ ১০ স্কোরধারীরাই চান্স পেয়েছে প্রায় ৮৬ শতাংশ। এছাড়া আদিবাসীসহ অন্যান্য কোটা বাদ দিলে দেখা যায় মেধাবীরাই চান্স পেয়েছে মেডিক্যালে। ভাল ফল করে ভর্তির সুযোগ পাওয়া শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, খারাপ ফল করেও অনেকে চান্স পেয়েছে কথাটা অন্যায়। এখানে কোন যুক্তি নেই। অযথাই মাঠ গরম করছে কিছু শিক্ষার্থী। প্রশ্ন ফাঁস হলে তো এসএসসি এইচএসসিতে সর্বোচ্চ স্কোর পাওয়া শিক্ষার্থীরাই ৮৬ ভাগ চান্স পাওয়ার কথা নয়। তাহলে তো দুই পাবলিক পরীক্ষায় খারাপ ফল করা আবেদনকারী প্রার্থীরাও চান্স পেত। প্রশ্ন পেলে তারা চান্স পেত। এখানেই শেষ নয়। প্রশ্ন ফাঁস হলে দেশের বিশেষ একটি বা দুটি অঞ্চলে তা হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে সেই এলাকার প্রার্থীরাই ভাল করার কথা। কিন্তু তাও হয়নি। বরং দেশের প্রতিটি কেন্দ্রেই প্রায় সমান ফল করেছে। এদিকে যারা আন্দোলন করছেন তাদের কেউ পরীক্ষার আগে কোথাও প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ করেননি। অথচ পরীক্ষার পর এসে দাবি করছেন প্রশ্ন ফাঁস হয়েছিল।

এমবিবিএস ও বিডিএস ভর্তি পরীক্ষার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৫-২০১৬ সালে সরকারী মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজসমূহে ভর্তিযোগ্য ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা তিন হাজার ৬৯৪, কোটায় ভর্তিযোগ্য সংখ্যা ১১১ (পার্বত্য জেলাসমূহ-উপজাতি ও অ-উপজাতি, উপজাতি-অন্যান্য জেলা, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য), মেধা ও জেলা কোটা- তিন হাজার ৫৮৩ জন। এদের মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় যারা সর্বোচ্চ জিপিএ নম্বর-১০ পেয়েছে তাদের মধ্যেই ৩ হাজার ৭৩ (৮৫.৭৬%) জন এমবিবিএস ও বিডিএস ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে।

৯.৫ থেকে ১০ এর মধ্যে উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৪৬৭ (১৩.০৩%) জন, ৯.৪ থেকে ৯.৫ এর মধ্যে উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ২১(০.৫৯%) জন, ৯.৩ থেকে ৯.৪ এর মধ্যে উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ১০(০.২৮%) জন, ৯.২ থেকে ৯.৩ এর মধ্যে উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৭(০.১৯%) জন এবং ৯.০৮ থেকে ৯.২ এর মধ্যে উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৫ (০.১৩%)। কোটা ব্যতীত জিপিএ মোট নম্বর ৯.০৮ এর কম পেয়ে কোন ছাত্রছাত্রী ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি। জিপিএ মোট নম্বর ৯.৫ বা তার বেশি প্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীরা মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তাই প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সুবিধা নিয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার অভিযোগ সঠিক নয় বলেই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরীক্ষা নিয়ে আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য অধিদফতরও তথ্য প্রমাণসহ তাদের ব্যাখ্যা দিয়েছে। ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি করে স্বাস্থ্য অধিদফতর বলেছে, শতভাগ সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা করে এমবিবিএস ও বিডিএস ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন এবং পরবর্তীতে সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা গ্রহণ সম্পন্ন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে পরীক্ষার ফলও প্রকাশিত হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে কলেজসমূহে শুরুও হয়েছে ভর্তি কার্যক্রম।

সারাদেশে গোয়েন্দা সংস্থা ও র‌্যাব ভুয়া প্রশ্নপত্র বিলি করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়া কয়েকটি চক্রকে গ্রেফতারও করেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের বিষয়টি স্বার্থান্বেষী ও সুবিধাভোগী চক্রের অসুভ কর্মকা- উল্লেখ করে তাতে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।

জানা গেছে, পরীক্ষা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করার সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতর। গত ১৫, ১৭ ও ২২ সেপ্টেম্বর র‌্যাব দ্বারা এমবিবিএস পরীক্ষা প্রশ্নপত্র ফাঁসের সন্দেহে আটক ৩টি চক্রের কারও কাছেই এমবিবিএস পরীক্ষা সংক্রান্ত কোন প্রশ্নপত্র পাওয়া যায়নি। পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ভুয়া প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রলোভন প্রদানকারী সংঘবদ্ধ চক্রকে র‌্যাব গ্রেফতার করে।

এদিকে এই পরীক্ষাই নয়, এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে একজন শিক্ষার্থী একবারই ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারবে। দুইবার সুযোগ দেয়া হলে আসন শূন্য থাকায় অনেক শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে বলা হলেও একটি গ্রুপ ঠিকই রাস্তায় নেমে টানা আন্দোলন শুরু করে। এক পর্যায়ে আদালতের আদেশে নিষ্পত্তি হয় সেই জটিলতার। এবারের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের কোন প্রমাণ না পাওয়া গেলেও একটি শ্রেণী ঠিকই ফেসবুকসহ সামাজিত যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছে। একটি গ্রুপ ভুয়া প্রশ্ন বিক্রি করে লাখ লাখ টাকাও হাতিয়েছে।

গত বছরের জেএসসি পরীক্ষা নিয়ে রীতিমতো আন্দ্লোন শুরু হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, হাতে লেখা প্রশ্ন আগে পাওয়া গেছে। তাতে ৭০ থেকে ৮০ ভাগ কমনও পড়েছে। একই অভিযোগ নিয়ে গত বছর শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা নিয়ে জল ঘোলা করা হয়েছিল সবচেয়ে বেশি। অথচ শিক্ষকরাই বলেছেন, পঞ্চম শ্রেণীর পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস-এ কথাটিতে কান দেয়া বোকামির পরিচয়। কারণ এই পরীক্ষায় যে কোন শিক্ষক একটি মডেল প্রশ্ন করলেও ৯৫ থেকে ৯৮ ভাগ কমন পড়তে পারে। আসলে মডেল প্রশ্ন ছেড়ে একটি মহল বাণিজ্য করে প্রতিটি পরীক্ষাতেই।

গত ৩৩তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠানের আগে ঘটেছিল তুঘলকী কা-। সে সময় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে ওঠায় আগেই তা স্থগিত করা হয়। পরিবর্তিত তারিখ অনুযায়ী একমাস পরে পরীক্ষা হয়। তবে এবারও অভিযোগ ওঠে প্রশ্নপত্র ফাঁসের। তবে কথিত ফাঁস হওয়া এ প্রশ্নপত্রের সঙ্গে মূল প্রশ্নের মিল ছিল না। তা সত্ত্বেও এ ভুয়া প্রশ্নপত্রেই লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য করে নিয়েছে একটি মহল। ফাঁস হয়েছে-এমন গুজব ছড়িয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে চলে বাণিজ্য। পাঁচ লাখ টাকা দিলে সব প্রশ্নপত্র মিলবে, এমন কথাও বলা হয়েছিল। পরে পিএসসির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নেছার উদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, প্রশ্ন ফাঁসের সংবাদ সম্পূর্ণ ভুয়া। এর কোন ভিত্তি নেই। কাজেই পরীক্ষার্থীদের কাছে আমাদের অনুরোধ, আপনারা প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজবে কান না দিয়ে মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করুন।

দেখা যাচ্ছে এখন পরীক্ষা হলেই চলে একই কর্মকা-। অনেকে হতাশা প্রকাশ করে বলছেন, ভবিষ্যতে মনে হয় পরীক্ষাই নেয়া যাবে না। কিন্তু এই অবস্থার সমাধানের পথ কী? জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব শিক্ষাবিদ অধ্যাপক শেখ একরামূল কবীর বলছিলেন, আসলে শিশুদের পরীক্ষা নিয়েও এখন একটি মহল ভুয়া প্রশ্ন ছেড়ে দিয়ে বাণিজ্য করে। তার পরেও বিভিন্ন সময় কিছু পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হওয়ায় মানুষ আস্থা হারিয়েছে। এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। তবে আস্থা হারিয়েছে বলে সকল পরীক্ষা নিয়েই গুজবে কান দেয়া ঠিক নয়। তিনি বলেন, আস্থা ফিরিয়ে আনতে পুরো প্রক্রিয়াকে মানুষের কাছে আরও স্বচ্ছ করতে হবে। একটি জাতীয় কমিটি করা যেতে পারে। যে কমিটি করলে মানুষ আরও আস্থা পরে। তবে এই কমিটি কোন প্রশ্ন দেখতে পারবে না। তারা পরীক্ষা মনিটরিং করবে।

নির্বাচিত সংবাদ