১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সিরাজদিখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রমরমা বাণিজ্য

স্টাফ রিপোর্টার, মুন্সীগঞ্জ ॥ মুন্সীগঞ্জ সিরাজদিখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলছে রমরমা ব্যবসা। রোগীদের সেবা দেয়ার থেকে এখানে জেনো আর্থিক উপার্জনটাই বড় বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা ডাক্তারদের সহযোগিতায় প্রতিদিন হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা। সরকারী হাসপাতালে পরীক্ষা নীরিক্ষার করে রশিদ না দিয়ে টাকা নেওয়া অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে অতি উচ্চহারে গরীর রোগীদের থেকে প্যথলজি পরীক্ষার টাকা নেয়া হচ্ছে। যার কোন রশিদই দেয়া হচ্ছেনা। সংশ্লিষ্ট কাউন্টারে টাকা জমা দেয়ার বিধান থাকলেও এখানে টেকনোলজিষ্টরা নিজেদের ইচ্ছেমত নগদ টাকা নিয়ে রোগীদের পরীক্ষা নিরীক্ষার কাজ করছে। চাহিদা মত টাকা না দিলে পরীক্ষা করাতে পারেন না ভুক্তভোগী রোগীরা। এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।

সরজমিনে সিরাজদিখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শণ করে জানা যায়, হাসপাতালটির নানা অনিয়ম অব্যবস্থাপানা আর মানহীন চিকিৎসা সেবার কাহিনী। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং আবাসিক মেডিক্যাল অফিসারের বিরুদ্ধেও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। স্বাস্থ্য কর্মকর্তা অফিস সময়ে হাসপাতাল চত্বরে তাঁর বাসায় বসে রোগী দেখেন বলে জানা গেছে। হাসপাতালের জিনিসপত্র ও ওষুধ ক্রয়ের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রতি অর্থবছরে বেশ কয়েকবার বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সে অনুযায়ী জিনিসপত্র ও ওষুধ কেনেন না বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের কয়েকজন স্টাফ। উপজেলা প্যাথলজি বিভাগের কোন খবরও রাখেন না তিনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইছাপুরা চৌরাস্তার এক ওষধ ব্যবসায়ী বলেন, অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনা জেঁকে বসেছে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট সিরাজদিখান উপজলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এক্সরে মেশিন কখনো নষ্ট কখনো ভালো। নেই অন্য কোনো মেশিনারিজ। ডাক্তার থাকলেও ওষুধ নেই। প্রসূতি রোগীদের সিজার হলেও অনেক টাকা নেওয়া হয় রোগীদের নিকট থেকে। ভালো সেবা রোগীরা শেষ কবে পেয়েছেন তা বলা কঠিন। আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) নিয়মিত থাকেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি মোবাইল ফোনে শুধু সেভ কার নাম্বারে কথা বলেন। কোন রোগী প্রয়োজনে তাকে ফোন দিলেও ফোন রিসিভ না করায় রোগীরা তাদের প্রয়োজনীয়া কথা বলতে পারেনা আরএমও-র সাথে। একই সাথে হাসপাতাটিতে চলছে দালাল আর আয়াদের আধিপত্য। দালাল আর আয়াদের দৌরাত্বে রোগীদের জেনো দুর্ভোগের শেষ নেই। তাদেরকে খুশি করতে পারলে তারাতারি ডাক্তার দেখানো যায়। নতুবা কখন ডাক্তার দেখানো যাবে তার কোন সময় নেই।

অভিযোগ রয়েছে দুপুর ১২টার পর এ হাসপাতালটিতে ডাক্তার থাকে না। ডাক্তার না থাকায় ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা না মেলায় দিন দিন রোগীর সংখ্যা কমতে থাকায় স্টাফরা এখন দুপুরের পরে হেসে খেলে সময় পার করেন। সব মিলিয়ে এখন খুঁড়িয়ে চলছে কয়েক লাখ মানুষের ভরসার এই হাসপাতালটি।

জানা যায়, সিরাজদিখান উপজেলার লতব্দী ইউনিয়নের কমলাপুর গ্রামের মৃত আব্দুল খালেক মাওলানার মেয়ে সৌদী প্রবাসী সাজাহানের স্ত্রী মাকসুদা বেগম(২২) গত ৩০ সেপ্টেম্বর টিকিট কেটে সিরাজদিখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তার দেখা। ডাক্তার তাকে হিমোগ্লোবিন, ইএসআর, ব্লাডগ্রোপিং, আরবিএস, ইউরিন সুগার পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য লিখেন। মাকসুদা মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট প্যাথলজিস্ট মোঃ তোফাজ্জল হোসেনর কাছে গেলে তিনিি মাকসুদাকে জানান, এখানে সব কিছু করা যাবে। তবে টাকা দিতে হবে। মাকসুদা শুধু হিমোগ্লোবিন ও ব্লাডগ্রোপিং পরীক্ষা করলে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট তার নিকট থেকে ৪৬০ টাকা দাবী করেন। কিন্তু মাকসুদা টাকা দিয়ে টাকার রশিদ চাইলে এখান থেকে পরীক্ষা করে কোন টাকার রশিদ দেওযা হয়না বলেও জানান তোফাজ্জল। গত বৃহস্পতিবার বেলা ১১ টায় রিপোর্ট নিতে আসা মাকসুদা ও ৫/৬ জন মহিলা পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য টাকা দিলেও সে টাকার কোন রশিদ পাননি তারা। রক্ত পরীক্ষা করতে আসা কলেজ ছাত্রী হাবিবা আক্তার বলেন, প্রতিদিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাম, এক্সরে, রক্তসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়। অথচ এখানে পরীক্ষা নীরিক্ষার জন্য টাকা নিলেও কোন মানি রিসিট দেওয়া হয় না। সরকারী হাসপাতালে রশিদ ছাড়া টাকার বিনিময়ে চলছে বিভিন্ন পরীক্ষা-নীরিক্ষার কাজ। ফলে ভুক্তভোগী রোগীরা এ সব পরীক্ষায় মানসম্মত ফলাফল না পেয়েও গুনতে হচ্ছে রশিদ ছাড়া তাদের নির্ধারিত ফি। ফলে সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব আয়। পরীক্ষার আধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকলেও মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট মোঃ তোফাজ্জল হোসেনকে টাকা দিলেই সকল রোগ নির্ণয় করা সম্ভব এখানে। একই ধরনের পরীক্ষার ফলাফল এখানকার সঙ্গে নারায়নগঞ্জ কিংবা ঢাকার ফলাফলের সঙ্গে কোনো মিল হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংশ্লিষ্ট অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, এলাকার বেশীরভাগ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকদের সঙ্গে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মোঃ তোফাজ্জল হোসেনের অশিংদারিত্ব ব্যবসা রয়েছে। অবৈধ ভাবে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে টাকা নিয়ে তাদের প্যাডে স্বাক্ষর করে রমরমা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন এ হাসপাতের টেকনোলজিষ্ট।

এ ব্যাপারে তোফাজ্জল হোসেন জানান, ভূলক্রমে ওই দিন মানি রশিদ দেয়া হয়নি। তাছাড়া তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগও সঠিন নয় বলে তিনি দাবী করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিরাজদিখান ছাড়াও লৌহজং ও শ্রীনগর উপজেলার কয়েক হাজার দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবার সিরাজদিখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর নির্ভরশীল। তিন টাকা টিকেট কেটে এই হাসপাতাল থেকে রোগীদের সেবা পাওয়ার কথা থাকলেও প্রায় রোগীকেই আশপাশের বিভিন্ন ক্লিনিকে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। স্টাফদের যোগসাজশে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দালালরা গিজগিজ করে হাসপাতাল চত্বরে। জরুরি বিভাগ থেকে সাধ্যমতো সেবা মিললেও প্রসূতি, চর্মরোগসহ অন্যান্য রোগীদের পদে পদে ভোগান্তি পোহাতে হয়। দায়িত্ব থাকলেও ঠিকমতো বসেন না ডাক্তার। সিরাজদিখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক নূরুন-নবী বিল্লাহ বরেন, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট প্যাথলজিস্ট মোঃ তোফাজ্জল হোসেন রশিদ ছাড়া টাকা নিয়েছেন এটা নিয়ম বর্হিভূত কাজ। লিখিত অভিযোগ দিলে আমরা বিষয়টি দেখব। তাছাড়া তার বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. উলফাত আরা বেগম বলেন, মানি রশিদ ছাড়া টাকা নেবার একটি ঘটনা আমি জানতে পেরে রেজিষ্টার মিলিয়ে দেখেছি, সেখানে সব কিছু ঠিকঠাক আছে। কোন অনিয়ম হয়নি। তাছাড়া আরএমও সাহেবের মোবাইল অনেক সময় সাইলেন্স থাকলে হয়তো তিনি মোবাইল রিসিভ নাও করতে পারেন। তাছাড়া আমি ও আরএমও সাহেব এখানে বাসা নিয়ে থাকি। বাসায় বসে রোগী দেখার অভিযোগ সঠিক নয় বলে তিনি দাবী করেন। সকল ডাক্তারই আড়াইটা পর্যন্ত রোগী দেখেন। পরে শুধু ইমাজেন্সি বিভাগে ডাক্তার থাকেন।