১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তৃণমূলে নির্দেশ অমান্য হওয়ায় ক্ষুব্ধ খালেদা জিয়া

  • সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও ৭৫টির মধ্যে একটি সাংগঠনিক জেলারও কমিটি হয়নি

শরীফুল ইসলাম ॥ বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার নির্দেশ মানেনি দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা। এ কারণে তাদের প্রতি চরম ক্ষুব্ধ হয়েছেন তিনি। লন্ডন থেকে দেশে ফিরে ৭৫ সাংগঠনিক জেলার শীর্ষ নেতাদের কাছে কৈফিয়ত তলব করার পাশাপাশি খালেদা জিয়া কেন্দ্র থেকে কমিটি চাপিয়ে দেবেন বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, খালেদা জিয়ার নির্দেশ অনুসারে ৯ আগস্ট বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে ৭৫ সাংগঠনিক জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে চিঠি দিয়ে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নিজ নিজ জেলার সকল ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, পৌরসভা, থানা ও উপজেলা কমিটি পুনর্গঠনের পর কাউন্সিলের মাধ্যমে জেলা কমিটি করার কথা বলা হয়। এ সময়ের মধ্যে এ কাজ সম্পন্ন করতে না পারলে কেন্দ্র থেকে কমিটি করে দেয়ার কথাও বলা হয়। কিন্তু জেলা নেতারা খালেদা জিয়ার নির্দেশ মানেননি। কিছু ইউনিট কমিটি করতে পারলেও ৭৫টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে একটি জেলার কমিটিও খালেদা জিয়ার বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে করতে পারেনি। লন্ডন থেকে এ খবর শুনে খালেদা জিয়া চরম ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলে জানা গেছে।

বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, কোন কোন জেলা থেকে কমিটি পুনর্গঠনের ব্যাপারে আরও সময় চাওয়া হচ্ছে। কিন্তু খালেদা জিয়া দেশে না থাকায় জেলা নেতাদের কেন্দ্র থেকে সুনির্দিষ্টভাবে কোন নির্দেশ দেয়া যাচ্ছে না। তবে লন্ডনে বসে খালেদা জিয়া যে ক্ষুব্দ হয়েছেন সে খবর জেলা নেতাদের ইতোমধ্যেই জানিয়ে দেয়া হয়েছে। অবশ্য এ খবর শুনে কোন কোন এলাকার তৃণমূল নেতারা আবার নতুন উদ্যমে কমিটি পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছেন।

৯ আগস্ট খালেদা জিয়ার নির্দেশনা পাওয়ার পর ৭৫টি সাংগঠনিক জেলার আওতাধীন ৪৮৭টি উপজেলা, ৩ শতাধিক পৌরসভা, ৮৭টি থানা ও প্রায় সাড়ে ৪ হাজার ইউনিয়নের মধ্যে এখন পর্যন্ত বেশ কিছু ইউনিট কমিটি পুনর্গঠন করতে পেরেছে তৃণমূল নেতারা। তবে একটি সাংগঠনিক জেলা কমিটিও করা সম্ভব হয়নি। এসব জেলার বাকি ইউনিট কমিটিগুলো পুনর্গঠন করতেই অন্তত আরও এক মাস সময় লেগে যাবে বলে তৃণমূল নেতারা মনে করছেন।

প্রসঙ্গত: সরকারবিরোধী টানা ৯২ দিনের আন্দোলন কর্মসূচী ব্যর্থ হওয়ার পর কেন্দ্র থেকে শুরু করে বিএনপির সর্বস্তরে স্থবিরতা বিরাজ করে। এ অবস্থার অবসানে সারাদেশের সর্বস্তরে দল পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। এরই অংশ হিসেবে তৃণমূলে আগে দল পুনর্গঠন করে পরে জাতীয় কাউন্সিল করার কৌশল নেয়া হয়।

তৃণমূল নেতাদের মতে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে বড় ধরনের ২টি আন্দোলনে ব্যর্থতার মূল কারণ দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের নিষ্ক্রিয়তা। অথচ ৯ আগস্ট কেন্দ্র থেকে দল পুনর্গঠনের যে চিঠি দেয়া হয়েছে তাতে আন্দোলনে ব্যর্থতার দায় তৃণমূল নেতাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। আর যখন বার বার চেষ্টা করেও দলের জাতীয় কাউন্সিল করতে পারছে না তখন তৃণমূলের কাউন্সিল করার ওপর কেন্দ্র থেকে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। কিন্তু আন্দোলনে সক্রিয় থাকা নেতাকর্মীরা যে মামলার কারণে নানামুখী হয়রানির শিকার হচ্ছে তা আমলে নেয়া হচ্ছে না।

এদিকে খালেদা জিয়াসহ সকল কেন্দ্রীয় নেতারা রাজধানী ঢাকায় অবস্থান করলেও বিএনপির অন্যতম সাংগঠনিক জেলা ঢাকা মহানগরীর কমিটি পুনর্গঠন করা সম্ভব হচ্ছে না। সহসা এই মহানগরীর কমিটি পুনর্গঠনের কোন লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। তাই অন্যান্য সাংগঠনিক জেলার নেতারা মনে করছেন যেখানে কেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে ঢাকা মহানগর কমিটি পুনর্গঠন করা যাচ্ছে না, সেখানে তৃণমূলে কমিটি পুনর্গঠন করতে না পারলে কেন তাদের কৈফিয়ত তলব করা হবে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুসারে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর তিন বছর পর পর সকল ইউনিট কমিটি পুনর্গঠন করে জাতীয় কাউন্সিল করে কেন্দ্রীয় কমিটি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল করার পর পৌনে ৬ বছর সময় অতিক্রান্ত হলেও বার বার চেষ্টা করেও কাউন্সিল করতে পারছে না বিএনপি।

তৃণমূল পর্যায়ের কমিটি পুনর্গঠন করতে ব্যর্থ হওয়ার পরও বিএনপি সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল করে ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে। কাউন্সিলের পর ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি খালেদা জিয়াকে চেয়ারপার্সন, তারেক রহমানকে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে মহাসচিব করে দলের ৩৮৬ সদস্যের জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করে বিএনপি। ২০১১ সালের ১৬ মার্চ খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ওই বছর ৬ এপ্রিল দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়ে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন খালেদা জিয়া। কিন্তু মির্জা ফখরুল পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব না হওয়ায় দল পুনর্গঠনসহ বিভিন্ন কর্মকা-ে তার নির্দেশনা মানতে চায় না দলের বিভিন্ন স্তরের নেতকর্মীরা। নির্ধারিত সময়ে তৃণমূলে দল পুনর্গঠনের কাজ শেষ না হওয়ার এটিও একটি কারণ বলে বিএনপি নেতাকর্মীরা মনে করছেন।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে রাজনৈতিকভাবে বেকায়দায় পড়ে নতুন উদ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি পুনর্গঠন করে জাতীয় কাউন্সিল কারার প্রস্তুতি নেয় বিএনপি। জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতির মাধ্যমে সরকারবিরোধী আন্দোলনের একটি আমেজ সৃষ্টি করে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করার কৌশল নেয়া হয়। অন্য নেতাদের প্রতি আস্থা না থাকায় জেলা নেতাদের ঢাকায় ডেকে এনে বৈঠক করে কমিটি পুনর্গঠন শুরু করেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট জেলার কেন্দ্রীয় নেতারা পুনর্গঠিত জেলা কমিটির নেতাদের অসহযোগিতা করতে থাকেন। তাই নতুন করে জেলা পর্যায়ে কোন্দল ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে ডজন খানেক জেলা কমিটি গঠনের পর এ প্রক্রিয়ায় কমিটি পুনর্গঠনের কাজ স্থগিত করেন খালেদা জিয়া। এবারও তৃণমূল পর্যায়ে দল পুনর্গঠনের কাজে খালেদা জিয়ার নির্দেশ উপেক্ষিত হওয়ায় জাতীয় কাউন্সিলের ব্যাপারে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত বিএনপি হাইকমা- কাউন্সিল ছাড়াই কমিটি করার কাজ শেষ করতে পারেন।

এদিকে তৃণমূলে কমিটি পুনর্গঠন শেষ করে জাতীয় কাউন্সিল করতে না পারলে নতুন করে নির্বাহী কমিটিতে কাউকে সংযুক্ত করা যাচ্ছে না। এ কারণে যোগ্যতাসম্পন্ন বিএনপির অনেক নেতা হতাশ হয়ে পড়ছেন। সুযোগবঞ্চিত বিএনপি নেতাদের ক্ষোভও বাড়ছে। তবে জাতীয় কাউন্সিল করার জন্য অনুকূল পরিবেশ না পেলে এ বছর ডিসেম্বরে অথবা পরবর্তী বছরের প্রথম ভাগে বিএনপি হাইকমান্ড সরাসরি কমিটি পুনর্গঠনের কাজে হাত দিতে পারেন। এজন্য খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান নিজ নিজ অবস্থান থেকে ফাইলওয়ার্ক করছেন বলে জানা গেছে। আর দলের তরুণ নেতারা আগেভাগেই নতুন কমিটিতে ভাল পদ পেতে লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ সুদূর লন্ডনে গিয়েও লবিং করছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) গোলাম আকবর খোন্দকার জনকণ্ঠকে জানান, প্রশাসনের বাধার কারণে বিভিন্ন জায়গায় সম্মেলন করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জেলা পর্যায়ে বিএনপির কমিটি পুনর্গঠনের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলার সভাপতি রাবেয়া চৌধুরী জনকণ্ঠকে বলেন, নেতাকর্মীদের নামে মামলাসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে জেলাসহ বিভিন্ন ইউনিট কমিটি করা সম্ভব হয়নি। তারপরও কিছু ইউনিট কমিটি হয়েছে। তবে এ কাজ শেষ করতে আরও সময় দরকার।

এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে দল পুনর্গঠনের কাজ চলছে। এখন পর্যন্ত জেলা কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা সম্বব না হলেও ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা ও থানা পর্যায়ের অনেক কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। বড় রাজনৈতিক দলকে বিভিন্ন সমস্যা মোকাবেলা করেই দলীয় কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হয়।