২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নিরাপত্তাহীনতার প্রশ্ন নাকি ক্রিকেট কূটনীতি

  • মুহম্মদ শফিকুর রহমান

অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট টিম নিরাপত্তাহীনতার প্রশ্ন তুলে বাংলাদেশে খেলতে আসবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। তাদের এই না আসা নিরাপত্তাহীনতার প্রশ্ন নাকি ক্রিকেট কূটনীতি, তা এখনও স্পষ্ট নয়। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত নিয়ে অস্ট্রেলিয়া দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচে শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশকে অপমান করল। এটা নিঃসন্দেহে অখেলোয়াড়সুলভ আচরণ। এর খেসারত আজ হোক কাল হোক অস্ট্রেলিয়াকে দিতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না যে, আমরা বীরের জাতি। যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। এই অপমানের প্রতিশোধ বাঙালীরা নেবেই। এই মুহূর্তে জাতির নেতৃত্ব দিচ্ছেন শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুকন্যা ‘ধরিত্রীর আদরের কন্যা’ হয়ে বিজয়মাল্য পরে আজ দেশে ফিরছেন। আমরা স্বাগত জানাই। অভিনন্দন জানাই। এই বিষয়েই লেখার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু গত রবিবার চতুরঙ্গ পাতায় আমার একটা বড় লেখা ছাপা হয়েছে। তাই আজ অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট কূটনীতি নিয়েই লিখতে চাই।

অবশ্য আমাদের গ্রামের মুজিব ভাই বেঁচে থাকলে বলতেন ‘ডরাইছে’। মুজিব ভাই, অর্থাৎ মুজিবুল হক খাঁ, বন্ধু সার্কেলের সবচে সিনিয়র ছিলেন। বড় ভাই। সব ব্যাপারে, এমনকি সিরিয়াস ইস্যুতেও একটা মজার কথা বলে উড়িয়ে দিতেন। কেউ গালাগাল করলেও। একবার এর পেছনের দর্শনটা জানতে চাইলে বলেছিলেন, দ্যাখো, কেউ তোমাকে অপমান করল। তুমি ক্ষেপে গিয়ে তাকে একহাত নিলে। কিছু অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করে পাল্টা দু’কথা শুনিয়ে দিলে। কিংবা ‘হারামজাদাই’ বলে দিলে। ওতে ওর নয়, তোমার দুর্বলতাই প্রকাশ পাবে।

মুজিব ভাই প্রয়াত হয়েছেন বেশ আগে। আজ এত বছর পরও তার কথা মনে পড়ে। লেখাপড়া মানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুই ক্লাস। আর্থিক দৈন্যের কারণে কৈশোরেই লেখাপড়া ছেড়ে উপার্জনে নামতে হয়। একই কারণে যৌবনের শুরুতেই ভাগ্যান্বেষণে ঢাকায় আসতে হয় এবং ভাগ্য তাকে টেনে নিয়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হলে। বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল। হল ক্যান্টিনের বয়ের চাকরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সঙ্গে থাকতে থাকতে গরিব মুজিব ভাই হয়ে উঠেছিলেন বুদ্ধিদীপ্ত এবং রুচিশীল মানুষ। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বলেছিলেন, এ জাতির ভোগান্তি আছে। যারা ছায়া দেয়া বটগাছটি ফাটল তাদের রৌদ্রতাপদগ্ধতায় পুড়তে হবে।

অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট টিমের বাংলাদেশে না আসার পেছনে কারণ নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বরং ক্রিকেট কূটনীতির প্রশ্ন, তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। সবই ঠিকঠাক চলছিল। হঠাৎ এমন কি হলো যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশকে তাদের নিজ নিজ দূতাবাসে রেড এ্যালার্ট জারি করতে হলো। শুনেছি, আবার নাকি তুলেও নিয়েছে। একজন ইতালিয়ান আকস্মিকভাবে সন্ত্রাসীর গুলিতে নিহত হলেন? বিষয়টি যে নিরাপত্তার নয় তার প্রমাণ যে মুহূর্তে অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশে খেলতে আসবে না বলে জানিয়ে দিল সে মুহূর্তে বাংলাদেশের ক্রিকেট কোচ একজন অস্ট্রেলীয় ফুটবল টিমের কোচ ইতালিয়ান; এমনকি যখন অস্ট্রেলীয়রা তাদের ওই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল তখনও একজন ব্রিটিশ এমপি ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। তারা অস্ট্রেলিয়ার সিদ্ধান্তে অবাক হয়েছেন। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বলেও শোনা যায়। সবচে বড় কথা হলো, অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট কর্তৃপক্ষ ওই সিদ্ধান্ত নেয়নি, নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। পাকিস্তানে এমন সিচ্যুয়েশন তৈরি হয়েছিল বিভিন্ন দেশের ক্রিকেট কর্তৃপক্ষের না-রাজির কারণে। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট টিম এমন কোন না-রাজি জানিয়েছিল বলে শোনা যায়নি। তবে সে দেশের প্রশাসনের আগ্রহটা একটু বেশিই চোখে পড়েছে। তাদের একটি প্রশাসনিক টিম বাংলাদেশে এসেছিল। আমাদের ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড, নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ তাদের সব রকমের নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছে বলে শুনেছি। বিশেষ করে র‌্যাবের ডিজিসহ উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, পুলিশ কর্তৃপক্ষ তাদের দেখিয়ে দিয়েছিলেন গোটা নিরাপত্তার কথা। যে হোটেলে অবস্থান করবেন সেই হোটেলের শক্ত নিরাপত্তা বলয়, ডগ স্কোয়াড সবই তাদের টিমকে দেখানো হয়, ব্রিফ করা হয়। তাদের চলাচলের পথে অন্তত ২০ মিনিট আগে থেকে রাস্তায় কেউ থাকবে না। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য বরাদ্দ মাত্র ৫ মিনিট। তারপরও তারা দেশে ফিরে গিয়ে জানিয়ে দিলেন, আসছেন না।

বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন রেটিংয়ের দিক থেকে ৭ নম্বরে উঠে এসেছে। লাকি নম্বর। ইতোমধ্যেই ক্রিকেটের রুই-কাতলারা বাংলাদেশের কাছে হেরে ফিরে গেছে; অস্ট্রেলিয়াকেও হেরে ফিরে যেতে হতো তা কনফিডেন্সের সঙ্গে বলে দেয়া যায়। তাহলে কি এ জন্য এলো না? নাকি বিশ্বের দেশে দেশে আজ যে জঙ্গী তৎপরতা চলছে তার ঢেউ বিশ্ব মোড়লরা বাংলাদেশের গায়েও লাগাতে চায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শান্তি, ধর্মীয় সহনশীলতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশের গায়েও জঙ্গী লেবেল লাগানোর জন্য বিশ্ব মোড়লরা উঠেপড়ে লেগেছে। অথচ বাংলাদেশে ঈদ, পূজা-পার্বণ যেমন হয় তেমনি পয়লা বৈশাখের আনন্দোৎসব বিশ্বের এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। প্রয়াত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সালাহউদ্দিন আহমদ তার এক লেখায় বলেছেন, ‘আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে যে ধারাটি প্রাধান্য পেয়ে আসছে সেটি সংঘাত বা বিরোধের ধারা নয়; বিভিন্ন মতবাদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সমন্বয়ের ধারা।’ এটাই অনেকের সহ্য হয় না। তাই তো আমরা লক্ষ্য করি, সাম্প্রতিক কিছু অর্গানাইজড ক্রাইম, পেট্রোল বোমা, আগুন বোমার ঘটনা ঘটছে। যদিও জঙ্গী-সন্ত্রাস প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জিরো টলারেন্স নীতির কারণে আঁতুড়ঘরেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হতে বাধ্য হচ্ছে। অথচ আমাদের কিছু মিডিয়া (বিশেষ করে টেলিভিশন) মিছিল-মিটিং হচ্ছে, পুলিশ-বিডিআরের সঙ্গে রাজপথে জনতার মারামারি ইত্যাদি ছবি বহির্বিশ্বে ছেড়ে দিয়ে আনন্দ পাচ্ছে। পেছনে ইন্ধন জোগাচ্ছে যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াত-শিবির এবং তাদের গডমাদার খালেদা জিয়া, তার ছেলে তারেক ও তার দল। এদের পক্ষ নিয়ে বহির্বিশ্বে লবি করে বেড়াচ্ছে আমাদের একমাত্র নোবেল লরেট প্রফেসর ড. ইউনূস। সম্প্রতি সাবেক মার্কিন ফার্স্ট লেডি ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের ব্যক্তিগত ইমেলে তা ধরা পড়েছে। কেবল তা নয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদান এবং জাতিসংঘের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ বা ‘ধরিত্রীর আদরের কন্যা শেখ হাসিনা’ বা আইসিটি পুরস্কার গ্রহণ উপলক্ষে নিউইয়র্কে অবস্থানকালে হোটেলের সামনে বিএনপির যে বিক্ষোভ মিছিল হয়, তার পুরোভাগে ড. ইউনূস ও দুর্নীতির দায়ে লন্ডনে পলাতক খালেদাপুত্র তারেকের শ্যালককে দেখা গেছে। এটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে যেমন দেখা গেছে তেমনি সংবাদপত্রেও ছাপা হয়েছে। সাংবাদিক হিসেবে তারপরও বলছি, বেচারা ড. ইউনূসের একটা গতি হলো এবার। একটি রাজনৈতিক দল পেলেন।

বস্তুত দীর্ঘদিন থেকেই একটি চক্র বাংলাদেশবিরোধী কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের দ্রুত বিকাশমান আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি তাদের ভাল লাগে না। বেশিদিন হয়নি, পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের সে কি আপ্রাণ প্রচেষ্টা; যাতে না হয়। ব্যাংক এক পয়সাও ছাড় দিল না, তবু নাকি দুর্নীতি হয়েছে। যদিও তা পরে কানাডার আদালতের মাধ্যমে সুরাহা হয়েছে, তাদের মুখে চুনকালি পড়েছে। শেখ হাসিনা বাপের বেটি, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করে দিলেন। নির্মাণ কাজ এখন দেখার মতো পর্যায়ে।

আজ বিশ্বব্যাপী মুসলিম দেশে দেশে আইএস, বোকো হারাম, আল কায়েদা জঙ্গীদের তৎপরতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ওই সব মুসলিম দেশের (লিবিয়াসহ) মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ঘরবাড়ি ছেড়ে ইউরোপের দিকে ছুটছে। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সাগর পাড়ি দিচ্ছে নৌকায়। প্রাণ হারাচ্ছে। সাগর তীরে শিশু আয়লানের মৃতদেহের ছবিও তাদের মনকে নাড়া দিচ্ছে না। জঙ্গীরা মুসলিম দেশে তৎপর অথচ ইসরাইল যে যুগ যুগ ধরে মুসলমানদের ভূমি, মসজিদ দখল করে রেখেছে, সেদিকে নজর নেই। তাদের শ্যেনদৃষ্টি আমাদের মতো শান্তিপূর্ণ দেশের দিকে। এখানেও আইএস, বোকো হারাম বা আল কায়েদার সহায়তায় হিযবুল মুজাহিদিন, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, হামযা ব্রিগেড নাম দিয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে। তাদের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে রয়েছে জামায়াত-শিবির এবং তাদের গডমাদার খালেদা জিয়া ও তার পলাতক পুত্র তারেক। কিন্তু ধরিত্রীর আদরের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জিরো টলারেন্স ডিক্লেয়ার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় তা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি, পারছে না। অবশ্য বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া তাদের মাথার ওপর না থাকলে দাঁড়াতে চাওয়ার ধৃষ্টতা দেখাবারও সাহস পেত না। কেননা, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ধর্মভীরু, কিন্তু ধর্মান্ধ নয় বলেই জঙ্গীবাদ শেকড় গাড়তে পারছে না। অস্ট্রেলিয়াকেও একদিন অনুতাপে দগ্ধ হতে হবে। হতেই হবে। তারপরও একটা কথা বলতে হয়, অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট কূটনীতি করছে অথচ আমাদের কূটনীতিকরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একযোগে বিদেশ সফর করছেন?

ঢাকা ॥ ২ অক্টোবর ২০১৫

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, জাতীয় প্রেসক্লাব