২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রবীণের পাশে

বার্ধক্য মানবজীবনের এমন একটি অধ্যায় যে পর্বে এসে মানুষ অনেকটা একা হয়ে পড়ে, তার কর্মস্পৃহা হ্রাস পায় এবং নানা স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দেয়। তাই বার্ধক্যে উপনীত ব্যক্তির জন্য প্রথমত প্রয়োজন মনোযোগ ও যতœ। কোন সমাজে প্রবীণের প্রতি দায়িত্ব পালনের ধরন থেকে অনুমান করা যায় ওই সমাজের নীতি ও মূল্যবোধ কতখানি সুসংহত। প্রবীণের অবস্থান পরিবারে হলেও তার প্রতি দায় রয়েছে সমাজ ও রাষ্ট্রের। আধুনিক বিশ্বে প্রবীণ নাগরিক তথা সিনিয়র সিটিজেনরা পান বিশেষ মর্যাদা ও সুবিধা। এটি তাদের অধিকার। প্রবীণদের প্রতিটি মানবিক মৌলিক প্রয়োজনের দিকে দৃষ্টি দেয় বিবেচক সভ্য রাষ্ট্র। সে সুবাদে তাদের জীবনসায়াহ্ণ হয়ে ওঠে স্বস্তিময় ও স্বচ্ছন্দ। একজন সিনিয়র সিটিজেন যখন ঘরের বাইরে বের হন তখন তার ভ্রমণ বা যাতায়াত নির্বিঘœ ও সাশ্রয়ী করার জন্য প্রস্তুত থাকে বিশেষ ব্যবস্থা। তাকে দাঁড়াতে হয় না ভিড়াক্রান্ত লাইনে, দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হয় না কোন সেবা গ্রহণের প্রয়োজনে। এককালে কর্মময় জীবনে যিনি নিষ্ঠাভরে সার্ভিস দিয়েছেন, অবসর জীবনে তার অধিকার রয়েছে অপরের সেবা পাওয়ার। বস্তুত যে সমাজ ও দেশ গঠনে তাঁরা আন্তরিকতা ও উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করেছেন, সেই সমাজ ও রাষ্ট্র তাদের প্রতি অকৃতজ্ঞ হবে নাÑ এটাই তো প্রত্যাশিত। জীবনসায়াহ্নে মর্যাদার সঙ্গে তাঁদের পরিচর্যা ও কল্যাণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা রাষ্ট্র, পরিবার তথা সমাজের অবশ্য কর্তব্য।

দেরিতে হলেও আমাদের দেশে জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের কল্যাণে রাষ্ট্রীয়ভাবে বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রায় এক বছর আগে রাষ্ট্রপতি প্রবীণ ব্যক্তিদের দেশের সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে ঘোষণা দিয়ে তাঁদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা এবং খাদ্য, বস্ত্র ও চিকিৎসাসহ অন্য সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। দেশে বিশ্ব প্রবীণ দিবসও পালিত হয়ে আসছে আন্তরিক পরিবেশে। বর্তমানে দেশে প্রবীণদের সংখ্যা এক কোটি ২৫ লাখের ওপরে। এর বড় অংশই দুস্থ। বিপুলসংখ্যক প্রবীণ ব্যক্তি আবার সহায়সম্বলহীন। দুস্থ বয়স্কদের কল্যাণে প্রায় দুই দশক আগে বয়স্কভাতা চালু করা হয়। ভাতাপ্রাপ্তদের সংখ্যাও কয়েক বছর পর পর বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে বয়স্কভাতা গ্রহণকারীর সংখ্যা ২৭ লাখ ২২ হাজারে দাঁড়িয়েছে। নব্বই দশকের শেষদিকে যখন এ ভাতাটি চালু হয় তখন তালিকাভুক্ত প্রবীণের সংখ্যা ছিল চার লাখ। সে সময়ে মাসিক মাত্র ১০০ টাকা হারে ভাতা প্রদান করা হতো। এখন টাকার অঙ্ক ৪০০ করা হয়েছে। বলাবাহুল্য, বর্তমান বাজারে এটি অকিঞ্চিৎকর। সমাজের দরিদ্র বয়স্ক অংশের সার্বিক কল্যাণের জন্য টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ আবশ্যক। এক্ষেত্রে কেবল সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকাও কাজের কথা নয়। স্বেচ্ছাসেবী উন্নয়ন সংস্থাগুলোরও এ ব্যাপারে ভূমিকা রাখা দরকার। সমাজের বিত্তবান শ্রেণীরও দায়িত্ব রয়েছে। বিত্তবানদের উদ্বুদ্ধ করতে পারে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ।

আবাসন ও কর্মসংস্থান, যাতায়াত সুবিধা এবং স্বাস্থ্যসেবাসহ আরও কিছু সেবা দিতে প্রবীণদের পরিচিতি কার্ড দেয়ার কথা শোনা গিয়েছিল বেশ কিছুকাল আগে। কাজটি দ্রুত সুসম্পন্ন হওয়া চাই। সমাজের দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত, প্রতিবন্ধী, শারীরিকভাবে রুগ্ন-দুর্বল এবং পারিবারিকভাবে সামর্থ্যহীন প্রবীণদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিহ্নিত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ কাজে গতি আসুক। প্রবীণের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের মান্য করার সংস্কৃতি গড়ে উঠুক আমাদের সমাজেÑ এটাই প্রত্যাশা। মনে রাখা চাই, প্রবীণ ব্যক্তিরা সমাজের বড় সম্পদ; তাদের মূল্যবান অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন প্রজন্ম সার্থক করে তুলতে পারে তার মানবজনম।