২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাম্প্রদায়িকতা এখন আর স্থানীয় সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক ইস্যু

  • রামু ট্র্যাজেডির তিন বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে বক্তাদের অভিমত

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সাম্প্রদায়িকতা এখন আর কোন স্থানীয় সমস্যা নয়। এটি বৈশ্বিক ইস্যু। দখল, লুণ্ঠন, বৈষম্য ও নিপীড়নের মানসিকতাই সাম্প্রদায়িকতার মূল উৎস। রাজনীতিতে ধর্ম ও সংখ্যাগরিষ্ঠের কথিত ধর্মীয় অনুভূতির অহরহ ব্যবহার দিন দিন সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা বিভিন্ন রূপে সক্রিয় আছে- এটা স্বীকার করা জরুরী। তাহলেই সাম্প্রদায়িকতার মূলোৎপাটনে করণীয় ঠিক করা যাবে। ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অসাম্প্রদায়িকতা চর্চার ওপরও জোর দেয়া দরকার। পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক সব হামলার বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে করা উচিত।

‘রামু সাম্প্রদায়িক সহিংসতার তিন বছর পূর্তি’ উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনাসভায় বক্তারা এসব কথা বলেছেন। শনিবার রাজধানীতে জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। রামু ট্র্যাজেডির ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার একদল শিক্ষক-লেখক-সাংবাদিক-শিল্পী-আইনজীবী ও রাজনীতিক এর আয়োজন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আহমেদ কামালের সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক গীতি আর নাসরিন, অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান, অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার, অধ্যাপক ফাহমিদুল হক, অধ্যাপক রাজীব মীর, সাংবাদিক সোহরাব হাসান, উদিসা ইসলাম, শিল্পী মাকসুদুল হক, বিপ্লবী ওয়ার্কাস পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, বাম রাজনীতিক জোনায়েদ সাকী প্রমুখ। সভা সঞ্চালনা করেন রামু ট্র্যাজেডি মামলার অন্যতম আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।

সভার শুরুতেই জানানো হয়, ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতের আঁধারে কক্সবাজারের রামুতে তেরোটি ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ মন্দির ও ৫০ ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। হামলার তিন বছর পেরিয়ে গেলেও আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া এখনও শুরু হয়নি। ওই ঘটনায় প্রাথমিকভাবে দায়ের করা ১৯ মামলায় ১৫ হাজার মানুষকে আসামি করা হলেও গত বছর অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে মাত্র ৩৮৫ জনের বিরুদ্ধে। তবে ওসব মামলার কোনটিই শুনানির পর্যায়েও আসেনি। সভায় বক্তারা এসব মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের আওতায় নেয়ার দাবি জানান।

সাম্প্রদায়িকতার জন্য রাজনৈনিতক দলগুলোকে দায়ী করে সভায় অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, দখল ও লুণ্ঠনের মানসিকতা থেকে সাম্প্রদায়িকতাকে ব্যবহার করা হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গরিব অমুসলিম ও আদিবাসীদের সম্পদ লুট করা হচ্ছে। আর ভোটের হিসাব কষতে গিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এসবের বিচার করছে না। অধ্যাপক গীতি আর নাসরিন বলেন, দেশে প্রচলিত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইনগুলো সাম্প্রদায়িকতা থেকে উৎসারিত। পুরুষ নিজে লাভবান হয় বলে বৈষম্যমূলক এই আইনগুলো নিয়ে কারও তেমন মাথাব্যথা নেই। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারকে ‘না’ বললে এই আইনগুলোকেও ‘না’ বলতে হবে। শিল্পী মাকসুদুল হক বলেন, রামুর বৌদ্ধ মন্দিরে থাকা মূর্তিগুলোর বিশাল আর্থিক ও প্রতœতাত্তিক মূল্য ছিল।

হামলার পর মূর্তির শরীরের বিভিন্ন অংশসহ মূল্যবান অনেক প্রতœসম্পদ লুট করা হয়েছে। এ বিষয়টিতে নজর দেয়া উচিত। কত সংখ্যক প্রতœসম্পদ খোয়া গেছে তার জন্য পৃথক তদন্তের দাবি করেন এই শিল্পী। মিয়ানমারের নেত্রী আউং সান সুচি ও সামাজিক ব্যবসায়ী অধ্যাপক ড. মুহম্মদ ইউনূসকে ইঙ্গিত করে অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার বলেন, নাফ নদীর দুই পাড়ে দু’জন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী আছেন। অথচ মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যু ও বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে ঘটা সাম্প্রদায়িক হামলা বিষয়ে তারা দু’জনই আশ্চর্যজনকভাবে নীরব থাকেন। তাদের এই ভূমিকা রহস্যজনক। সোহরাব হাসান বলেন, রামু ট্র্যাজেডি কোন বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। ১৯৯২ ও ২০০১ সালের নির্বাচনের পরেও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু ওসব হামলার কোন বিচার হয়নি। বিচারহীনতার কারণেই সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা বাড়ছে। অধ্যাপক ফাহমিদুল হক বলেন, সাম্প্রদায়িকতা এখন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। দেশে সাম্প্রদায়িকতা আছে এটা অনেক রাজনীতিকই স্বীকার করতে চান না। অথচ ব্যক্তিগত জীবনে আমরা অবচেতনভাবেই সংখ্যালঘুদের প্রতি সাম্প্রদায়িক আচরণ করি। ঘোষণা দিয়ে অসাম্প্রদায়িক হওয়া যায় না। জীবনাচরণে অসাম্প্রদায়িকতা নিয়মিত চর্চা করতে হয়।