২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গানের স্বর্ণালী সন্ধ্যায় সুজিত মোস্তফা

গৌতম পাণ্ডে ॥ সন্ধ্যা হতে না হতেই ছায়ানট মিলনায়তন শ্রোতাদের উপস্থিতিতে কানায় কানায় ভর্তি। মঞ্চকেও সাজানো হয়েছে বাংলার প্রকৃতির অবয়বে। দেশের প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী সুজিত মোস্তফার গান শুনতে অধীর আগ্রহে সবাই অপেক্ষায় রয়েছে। ঘড়িতে ঠিক সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা বাজতেই শিল্পী মঞ্চে আসলেন। একের পর এক তার পরিবেশনায় মুগ্ধ করলেন শ্রোতাদের। বাংলাদেশে যে এখনও সুস্থধারার সঙ্গীতের প্রতি অনেকের আকাক্সক্ষা রয়েছে, তার প্রমাণ মিলল শুক্রবার। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত নিমগ্ন চিত্তে সবাই গান শুনলেন, শিল্পীকে অনুরোধ জানালেন পছন্দের গান গাওয়ার জন্য। বলতে গেলে কাউকেই নিরাশ করেননি তিনি। তার পরিবেশনায় নজরুলসঙ্গীতই ছিল বেশি, পাশাপাশি সঙ্গীতের স্বর্ণযুগের গানও করলেন সাবলীলভাবে। অন্য সময়ে শিল্পীকে গম্ভির মনে হলেও এদিন কিন্তু তিনি খোশ মেজাজে ছিলেন। একজন শিল্পীর অভিমান নিয়ে শুরুতে তিনি বললেন, আমার গানের সিরিয়াস শ্রোতা আপনারা। শ্রোতার চাওয়া-পাওয়ার ওপর নির্ভর করে শিল্পীর সার্থকতা। কিছুক্ষণ আগে ছায়ানট মিলনায়তনে বিদ্যুত বিভ্রাটের কারণে আমার একক গানের এ অনুষ্ঠান প্রায় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল। সে বাধা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। আমার ডাক নামও কিন্তু বিদ্যুত। দেখা যাক গানের মাধ্যমে আপনাদের মধ্যে বিদ্যুত প্রবাহ ঘটাতে পারি কিনা।

‘আমার দুখের বন্ধু তোমার কাছে চাইনিতো এ সুখ’ নজরুল সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে শিল্পী তার পরিবেশনা শুরু করেন। নজরুলের ‘গুলবাগিচায় বুলবুলি আমি রঙিন প্রেমের গাই গজল’ গানটি পরিবেশনার পর গানের অনুরোধ নিয়ে মঞ্চে এলেন সঙ্গীতশিল্পী ইয়াসমিন মুশতারী, বললেন, খুব সুন্দর গান হচ্ছে। শিল্পীই বোঝে শিল্পীর কদর। সঙ্গে সঙ্গেই সুজিত মোস্তফা তাঁর অনুরোধের ‘তোমারেই আমি চাহিয়াছি প্রিয় শতরূপে শতবার’ নজরুল সঙ্গীতটি পরিবেশন করেন। এরপর তিনি পর পর গেয়ে শোনান নজরুলের-‘চেয়ো না সুনয়না আর চেয়ো না এ নয়ন পানে’, ‘প্রিয় যাই যাই বলো না’ ও ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী’। নজরুলের কাব্যগীতি ‘পরদেশী মেয়ে যাওরে ফিরে’ এক ভিন্নধাঁচে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন শিল্পী। পরের পরিবেশনা ছিল তরুণ প্রজন্মের প্রতি। তিনি গাইলেন ‘আজি গানে গানে যাক অভিমান’। আসতে থাকে একের পর এক অনুরোধ। তিনি গেয়ে শোনান অনুপ জালোটার গান ‘যারা ডাকে তারা ভুলে যায় আমি নেই তো এখানে আর’ ও মানবেন্দ্রর আমার হৃদয় নিয়ে আর কতকাল’ ও ‘বনে নয় মনে মোর পাখি আজ গান গায়’। সত্যি সত্যি শিল্পী সুজিত মোস্তফার মন পাখি যেন গানের ভেলায় ভাসতে থাকে। দেখা যায় কোন কোন শ্রোতা জানা গানগুলোর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে চলেছেন গুনগুন করে। এরপর মান্নাদের গানে মনোনিবেশ করেন তিনি। অসাধারণ সুরে গাইলেন ‘আমি যামিনী তুমি শশীহে’ ও ‘নানা আজ রাতে আর যাত্রা শুনতে যাব না’। যন্ত্রানুষঙ্গে যারা ছিলেন তাদের সঙ্গে শিল্পীর গান যেন এক ভিন্ন মাত্রা পায়। বিশেষ করে পল্লব সান্যালের তবলা বাদন শিল্পীকে গাওয়ার প্রবণতা এক ধাপ বাড়িয়ে দেয়। তালাত মাহমুদের ‘যে আঁখিতে এত হাসি লুকানো’ গানটি যেন হৃদয় ছুঁয়ে গেল। এছাড়া মান্নাদের ‘শুধু একদিন ভালবাসা’ বারে বারে কে যেন ডাকে আমারে’, ‘কাহারবা নয় দাদরা বাজাও’ ‘দোলে দোদুল দোলে ঝুলনা’ ‘আমি আজ আকাশের মত একেলা’ এবং মানবেন্দ্রর ‘যার কথা ভেবে ভেবে সব ভুলে যাই’ গানগুলোও ছিল অসাধারণ। প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ আবুহেনা মোস্তফা কামালের গান গেয়েও বাবাকে শ্রদ্ধা জানান শিল্পী সুজিত মোস্তফা। এ গানগুলোর মধ্যে ছিল ‘তোমার কাজল কেশ ছড়ালো বলে এই রাত এমন মধুর’ ও ‘আমি সাগরের নীল নয়নে মেখেছি’। নজরুলের ‘আমার যাবার সময় হলো দাও বিদায়’ গানটি দিয়ে শিল্পী তাঁর পরিবেশনার ইতি টানলেন কিন্তু শ্রোতারা বিষাদের এ গান দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হোক তা চাইলেন না। শ্রোতাদের অনুরোধে নজরুলের ‘আনন্দ লহ ঘনশ্যাম ব্রজ গোপী খেলে হরি’ গানটি পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শিল্পীর একক অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়। চমৎকার এক সঙ্গীত সন্ধ্যা উপহার দিলেন শিল্পী সুজিত মোস্তফা। উৎফুল্ল কণ্ঠে শিল্পী বলে উঠলেন, অনুষ্ঠানের শুরুতে আমার শরীর তেমন ভাল ছিল না কিন্তু আজ আমার গানের প্রতি শ্রোতাদের এত ভাললাগা দেখে নিজেও সুস্থ বোধ করছি।