১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অর্থনীতিতে নতুন বেতন স্কেলের প্রভাব

  • ড. মিহির কুমার রায়

অনেক জল্পনা-কল্পনা শেষে গত মাসের ৭ তারিখে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ২১ লাখ সরকারী চাকরিজীবীর জন্য ২০ গ্রেডে নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন হয়েছে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে এটি অষ্টম বেতন স্কেল। এই বেতন স্কেলের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো, মূল বেতন সর্বোচ্চ ৭৮,০০০ এবং সর্বনি¤œ বেতন ৮,২৫০ টাকা; সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল না থাকা; বাংলা নববর্ষে মূল বেতনের শতকরা ২০ ভাগ ভাতা; গত ১ জুলাই ২০১৫ থেকে নতুন স্কেলে মূল বেতন এবং ভাতা কার্যকর আগামী ১ জুলাই ২০১৬ থেকে; গ্রেড ভেদে শতকরা ৯১ ভাগ থেকে ১০১ ভাগ বেতন বৃদ্ধি এবং দুটি বিশেষ গ্রেড বিদ্যমান থাকা। নতুন বেতন স্কেল গঠন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে অর্থনীতিতে এর প্রভাব কেমন হবে, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে কিনা, বেসরকারী চাকরিজীবীদের বেতন বাড়বে কিনা, জনগণের জীবনমানের ওপর কেমন প্রভাব সৃষ্টি হবে ইত্যকার নানা প্রশ্ন উঁকি দিয়েছে মানুষের মাথায়। এসব প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী। তাঁরা বলেছেন, এই বাড়তি বেতন কাঠামো সরকারী খাতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবন-যাত্রার মান বাড়াবে, অঘোষিত দুর্নীতি কমাবে এবং অর্থনীতিতে গতিশীলতা বাড়বে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন এই বাড়তি বেতনের চাপে বাজার ব্যবস্থায় বড় ধরনের মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।

এরই প্রমাণ যেন বহন করে চলছে ভোগ্যপণ্যের বাজার বিশেষত শাক-সবজি, মাছ-মাংসের বাজার। যদিও বলা হচ্ছে প্রাকৃতিক কারণে ভাদ্র-আশ্বিন মাসে মাঠে তেমন শাক-সবজি থাকে না, এর মধ্যে অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে চাষকৃত শাক-সবজি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। আর এ কারণেই দাম চড়া। এই যুক্তি ধোপে টেকে না শাক-সবজি ব্যতীত প্রায় সকল ভোগ্যপণ্য, সেবাপণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রবণতা দেখে। বেতন স্কেল ঘোষণার এক সপ্তাহ আগে সরকার বিদ্যুত ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করেছে, যা ১ সেপ্টেম্বর ২০১৫ থেকে কার্যকর হচ্ছে। এই দাম বৃদ্ধির প্রভাব সৃষ্টি করেছে বিদ্যুত ও গ্যাসচালিত শিল্প খাতে, পরিবহন ব্যবস্থায়, পারিবারিক ব্যয় কাঠামো ইত্যাদি। এরই মধ্যে বাড়ির মালিকরা বিদ্যুত ও গ্যাসের ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে অনেক বেশি বাড়তি ভাড়া ভাড়াটিয়াদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। সরকারী চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি পেলেও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে তাদের জীবনমানের তেমন উন্নয়ন যে ঘটবে না, তা বলা যায়। তবে সবচেয়ে সমস্যায় পড়েছেন বেসরকারী খাতের চাকরীজীবীরা। তাদের বেতন বৃদ্ধি পায়নি। ফলে বর্ধিত ব্যয় তাদের জীবনমানের অবনতি ঘটাচ্ছে।

বেসরকারী খাতে কর্মসংস্থান সরকারী খাতের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। অথচ দেশের সিংহভাগ বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কোন চাকরি বিধি কিংবা বেতন কাঠামো নেই, যার মাধ্যমে সেখানকার চাকরিজীবীরা দাবি করতে পারবে সরকারী পর্যায়ের বেতন কাঠামোর সুবিধাগুলো। মূলত সঙ্কট সেখানেই। বেসরকারী খাতে বেতন বৃদ্ধি না করা হলে স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দেবে। আর তা প্রভাব ফেলবে অভ্যন্তরীণ জিডিপিতে। বেসরকারী উদ্যোক্তারা যদি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি করার পদক্ষেপ নেন, তবে তারা দুভাবে বেতন বৃদ্ধিজনিত ব্যয়ের সঙ্গে মুনাফার সমন্বয় ঘটাতে পারেন। এক, বেশি উৎপাদন বাড়িয়ে মুনাফা অর্জন; দুই, পণ্যের দাম বাড়িয়ে মুনাফা অর্জন। আমাদের দেশের বেশিরভাগ উদ্যোক্তাই যে দ্বিতীয় পন্থা অবলম্বন করবেন, তা ধারণা করা অযৌক্তিক নয়। যদি তাই হয় তাহলে মুদ্রাস্ফীতি হতে বাধ্য। তাহলে ২১ লাখ সরকারী কর্মকর্তার বেতন যে বৃদ্ধি হলো, তার প্রভাব পড়বে সামষ্টিক অর্থনীতিতে, যার ভুক্তভোগী দেশের ১৬ কোটি মানুষ।

এখন আসা যাক বাড়তি বেতনের যোগান কোথা থেকে হবে। বেতন বৃদ্ধির ফলে চলতি অর্থবছরে সরকারের অতিরিক্ত প্রয়োজন হবে ১৫ হাজার ৯০৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এই অর্থবছরে বেতনÑভাতা খাতে প্রয়োজন হবে ৬০ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা। সরকার বলছে এই অর্থের সংস্থান চলতি ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরের ২,৯৫,১০০ কোটি টাকা বাজেটের মধ্যে ধরা আছে। সরকার আয়ের উৎস বাড়িয়ে বাড়তি বেতনের খরচ মেটাবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নিয়ে যদি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতাদি দিতে হয়, তাহলে অর্থনীতির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে বিনিয়োগ কমে যাবে। কমে যাবে উৎপাদন। অর্থনীতি ধীর গতির হয়ে পড়তে পারে। তাই সরকারের উচিত হবে আয়ের উৎস বাড়ানোর দিকে সবিশেষ নজর দেয়া। তবে কোন অযৌক্তিক উৎস সৃষ্টি করে নয়।

সরকার যত রাজনৈতিক অঙ্গীকার নির্বাচনের আগে করে থাকে, তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জনগণের জীবন-যাত্রার মান উন্নয়ন। এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতি (অর্থের ক্রয় ক্ষমতা) বিষয়টি জড়িত। এক্ষেত্রে বর্তমান সরকার অনেকটাই সফল। সরকার ম্যাক্রো ইকোনমিক কর্মকা-ে যথেষ্ট উন্নতি দেখিয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে। ফলে দারিদ্র্য কমেছে দ্রুতগতিতে, আয় বেড়েছে সর্বস্তরের মানুষের। উন্নয়ন ঘটেছে জীবনমানের। কিন্তু সরকারী কর্মচারীদের নতুন বেতন স্কেল ঘোষণার আগ থেকেই জিনিসপত্রের দাম বাড়তে শুরু করায় জীবনমানের উন্নয়নের উর্ধগতিতে ছেদ পড়েছে। বিশেষ করে বেসরকারী খাতে কর্মরতদের জীবনে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। সামষ্টিক জীবনমানের উন্নয়নের জন্য বেসরকারী খাতের বেতন ও মজুরি বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি।

লেখক : কৃষি অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ডিন

সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা