২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পশুর উচ্ছিষ্টের বাজার বিশাল ॥ আয় হবে হাজার কোটি টাকা

  • এস এম মুকুল

গবাদি পশুর মাংস আর চামড়ার কদর আমাদের সবারই জানা। কিন্তু অজানা ব্যাপারটি হলো- মাংস আর চামড়া ছাড়া বাকি সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের রয়েছে বিরাট অর্থমূল্য। অছে বিপুল রফতানি সম্ভাবনাও। একবার ভাবুন তো আমরা উচ্ছিষ্ট হিসেবে গবাদি পশুর যেসব অংশ ফেলে দিই বিদেশীরা সেগুলো কিনে নেয় ডলার দিয়ে। পশু জবাইয়ের পর একটি মাঝারি আকারের গরুর ১৫ থেকে ২০ কেজি হাড় ফেলে দেয়া হয়। আমরা জানিই না যে, প্রতিদিন এই হাড় নিয়ে বাণিজ্য হয় ১০ থেকে ১৫ লাখ এবং নাড়িভুঁড়ি বিক্রি হয় ১২ লাখ টাকার। শুধুমাত্র কোরবানির ঈদ ও পরবর্তী ১ মাসে সারাদেশে প্রায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন পশুর হাড় সংগ্রহ করা হয়। গরুর শিংসহ হাড় বিক্রিতে প্রতিবছর ১০০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। বাংলাদেশ বোন এক্সপোর্টার এ্যান্ড মার্চেন্ট এ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, প্রতিদিন এই হাড় কেনা-বেচায় কোটি কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। জবাই করা পশুর ফেলে দেয়া হাড়গোড় সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রফতানি করে হাজার কোটি টাকা আয় সম্ভব।

উ”িচ্ছষ্টে তৈরি উপকরণ

বাংলাদেশ বোন এক্সপোর্টার এ্যান্ড মার্চেন্ট এ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, আবর্জনা হিসেবে ফেলে দেয়া গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার হাড়, শিং, অন্ডকোষ, নাড়িভুঁড়ি, মূত্রথলি, চর্বি বিভিন্ন পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে শিল্প কারখানায়। পশুর হাড় দিয়ে- জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ক্যাপসুলের কভার, ক্যামেরার ফিল্ম, সিরিষ কাগজ, পশুপাখির খাবার, বোতাম, সিরামিক পণ্য, মেলামাইন, খেলনা, শোপিসসহ ঘর সাজানোর নানা উপকরণ, নাড়ি দিয়ে অপারেশনের সুতা, রক্ত দিয়ে- পাখির খাদ্য, চর্বি দিয়ে- সাবান, পায়ের ক্ষুর দিয়ে বিভিন্ন প্রকার ক্লিপ ইত্যাদি উপকরণ তৈরি হয়। পিত্তথলি দিয়ে তৈরি হয় জীবন রক্ষাকারী ওষুধ। জাপান, চীন, কোরিয়া আর থাইল্যান্ডে উপাদেয় খাবার সুপ তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয় গবাদি পশুর লিঙ্গ। নাড়িকোষ দিয়ে তৈরি হয় জাপানের জনপ্রিয় খাবার সুসেড রুল। দেশেই ওষুধ কোম্পানি অপসোনিন তৈরি করছে ক্যাপসুলের কভার।

বিশাল রফতানি বাজার

পশুর পাকস্থলি একটু ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দিলেই এর দাম দাঁড়াবে ১০ থেকে ১২ ডলার। গরু, মহিষ, ভেড়া, খাসির অন্ডকোষের পাউডার জাপান, চীন ও কোরিয়া, মিয়ানমার ও হংকংয়ে রফতানি করা হয়। অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকেও আসতে পারে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। প্রতিটি গরু থেকে গড়ে ২০ কেজি হাড় ও ৫ কেজি অন্য অঙ্গ পাওয়া যায়। দেখা গেছে, বছরে গরুর উচ্ছিষ্টই উৎপন্ন হয় প্রায় ২৫ কোটি কেজি। এসব অঙ্গের মাত্র ১০ শতাংশও রফতানি করা সম্ভব হয় না। রফতানিকারকরা মনে করেন, পশুর বর্জ্য রফতানিতে সরকারের সহায়তা পেলে কয়েক হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে।

রফতানি হচ্ছে ক্যাপসুল সেল

জানা গেছে, দেশে মোট প্রায় ২শ’টি ওষুধ কোম্পানি ও হারবাল প্রতিষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য প্রতিমাসে ৪০ থেকে ৪৫ কোটি ক্যাপসুল সেলের চাহিদা রয়েছে। অপসোনিন গ্লোবাল ক্যাপসুল সেল গুঁড়া করা হাড় থেকে তৈরি করে ক্যাপসুলের সেল। এসব কাজে প্রতি মাসেই প্রয়োজন হয় কয়েকশ’ টন পশুর হাড়। প্রতি ঈদে কোরবানির পশুর হাড় দিয়ে এ চাহিদার প্রায় ৫০ শতাংশ পূরণ হয়। পাকিস্তান, আমেরিকা, ইউক্রেন, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইরান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, সৌদি আরবসহ ১৭টি দেশে প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় কোটি ক্যাপসুল সেল বিদেশে রফতানি হচ্ছে।

চলেছে হাড়ের বেচাকেনা

রাজধানীর হাজারীবাগের গজমহল রোড ও কালুনগর রোড এলাকায় গড়ে উঠেছে হাড্ডিপট্টি। জানা যায়, বছর দশেক আগে রাজধানীর হাজারীবাগের কয়েকজন ব্যবসায়ী এই হাড়গোড়ের ব্যবসা শুরু করেন। পরে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেটসহ জেলা পর্যায়ে ৬০টি কারখানায় হাড়ের ব্যবসায় কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়।

কোটি টাকার সম্পদ ডাস্টবিনে

সচেতনতা কিংবা প্রচার না থাকায় গবাদি পশুর হাড়-গোড়, ক্ষুর, শিং, লেজ কিংবা রক্ত শত কোটি টাকার সম্পদ উচ্ছিষ্ট হিসেবে স্থান হয় আবর্জনার ডাস্টবিনে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদি প্রতিটি এলাকায় একটি নির্দিষ্ট জায়গায় পশু কোরবানি করা হলে এসব উচ্ছিষ্ট সংগ্রহ করা সহজ হবে, পরিবেশ দূষণ কমবে, আয় হবে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা।

writetomukul36@gmail.com