১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সরকারের পররাষ্ট্রনীতি পূর্বমুখী হওয়াই কাল হলো!

মোয়াজ্জেমুল হক ॥ বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্রমাগতভাবে যখন উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হওয়ার পথে ঠিক তখনই দেশে অবস্থানরত বিদেশীদের টার্গেট করা হয়েছে। যে সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের গভীর বন্ধন অটুট রয়েছে সে সব দেশের নাগরিকদের টার্গেট করা হয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাব এর নেপথ্যে বিদেশী ষড়যন্ত্র কাজ করছে বলে ধারণা পাওয়া গেছে। বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্র নীতি পূর্বমুখী হওয়ার পর থেকে পশ্চিমা দেশগুলো বিষয়টিকে খুব ভাল চোখে দেখে আসছে না। শুধু দেশ নয়, শক্তিশালী দেশসমূহের ইশারা-ইঙ্গিতে চলে এমন অর্থদাতা সংস্থাগুলোও অনেকটা বেঁকে আছে দীর্ঘদিন থেকে। যার কারণে পদ্মা সেতু থেকে অর্থায়ন প্রত্যাহার করে নেয়ার ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য একটি প্রমাণ হিসেবে প্রতীয়মান। কেননা, ওই প্রকল্পে কোন ধরনের দুর্নীতি না হওয়ার আগেই দুর্নীতি হবে এ আশঙ্কায় অর্থায়নের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেয়ার ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি ছিল নজিরবিহীন ও বিস্ময়কর একটি ঘটনা। এর পরও বর্তমান সরকার কঠোর অবস্থানে থেকে এসব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে সফলতার পথ খুঁজে পাচ্ছে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে দেশব্যাপী তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার ঘটানোর স্বীকৃতি হিসেবে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ সংস্থার (আইটিইউ) আইসিটি টেকসই উন্নয়ন পুরস্কার পেয়েছেন। এর পরে পরিবেশ খাতে বিশেষ অবদানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এ ছাড়া এ প্রথমবারের মতো নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক স্থায়ী সালিশী আদালতের সম্মানজনক সদস্য পদ লাভ করেছেন বাংলাদেশের দুই বিচারপতি। আরও আগে বাংলাদেশ ইন্টারপার্লামেন্টারি (আইপিইউ) ও কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি এ্যাসোসিয়েশন (সিপিএ)-এর প্রধান পদে নির্বাচিত হয়েছেন। আগামী অক্টোবর মাসে জেনেভাভিত্তিক অভিবাসন ও উন্নয়ন বিষয়ক বৈশ্বিক ফোরাম অন মাইগ্রেশন এ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (জিএফএমডি) চেয়ারম্যান পদের দায়িত্ব লাভ করতে যাচ্ছে।

অপরদিকে, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে আদালতে লড়াই করে বাংলাদেশ সমুদ্র বিজয় লাভ করেছে। এর পরে ভারতের সঙ্গে ১৯৭৪ এ ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি নতুনভাবে অনুমোদিত হয়ে এর পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়েছে। এতে ১১১টি ছিটমহল পেয়েছে বাংলাদেশ। আর ৫১টি পেয়েছে ভারত। লাভবান হয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমান সরকারের উত্তরোত্তর সফলতাকে ব্যর্থ করে দিতে ষড়যন্ত্রকারীরা অঢেল অর্থ ঢেলে লবিষ্ট নিয়োগ করেও সফল হতে পারেনি। এসব ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে দেশে সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের অপতৎপরতা। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধাপরাধী ও জঙ্গী গোষ্ঠীগুলোর সম্পৃক্ততা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করতে হেন কোন অপচেষ্টা হয়নি। কিন্তু সরকারকে টলানো যায়নি। দেশের উন্নয়ন কর্মকা-ে সাহায্য সহযোগিতা বন্ধে চেষ্টারও কমতি হয়নি। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘসহ অনেকের পক্ষ থেকে বহু ধরনের দুতিয়ালির চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সরকারের কাছে এসব কিছুই পাত্তা পায়নি। তবে ক্ষতি যে হয়নি তা নয়। কিন্তু সে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকার বদ্ধপরিকর। আর এরই ফলে সরকারের উন্নয়ন অগ্রগতি বিশ্বব্যাপী দৃশ্যমান। ফলে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীদের নিশ্চিতভাবে আতে ঘা লেগেছে।

গেল ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত জোট জঙ্গীদের সঙ্গে গোপন অঁাঁতাত করে দেশে দিনের পর দিন অরাজকতা সৃষ্টি করে জ্বালাও পোড়াও ও মানুষ হত্যা করে সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলার চেষ্টাও ব্যর্থ হয়ে গেছে। তবে অসংখ্য নারী-পুরুষ ও শিশুর প্রাণ অকালে ঝরে গেছে। অনেকে চিরতরে পঙ্গু হয়েছে। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীদের লাভের ঘর রয়েছে শূন্যের কোঠায়। সরকারকে চুল পরিমাণও টলাতে পারেনি। বিভিন্ন নামে জঙ্গী সংগঠন সৃষ্টি করে একের পর এক নাশকতা চালাতে গিয়ে সরকারের কঠোর নীতির কারণে আঁতুড়ঘরে মৃত্যু হয়েছে এসব সমাজ ও দেশ বিরোধীদের। জঙ্গীপনায় দেশী-বিদেশী অর্থায়নের চ্যানেলগুলোও উদ্ঘাটিত হয়েছে। বর্তমান সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিএনপি-জামায়াত জোট দিনের পর দিন লাগাতার হরতাল, অবরোধ, যানবাহন ভাংচুর ও জ্বালাও পোড়াও করেও কোন সফলতা বয়ে আসেনি। এসব ঘটনায় এসব রাজনৈতিক দল উল্টো জনধিক্কৃত হয়েছে।

বিভিন্ন সূত্রে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, সর্বশেষ উপায় হিসেবে এরা এখন বাংলাদেশের ওপর থেকে বিদেশীদের সুদৃষ্টি অবসানের পথকে টার্গেট করেছে। এটি তাদের প্রণীত গোপন নীলনক্সার কঠিনতম একটি অংশ। এবং শেষ পর্যন্ত এর প্রতিফলন ঘটতে শুরু করেছে। যার প্রথম শিকার হয়েছেন গত সোমবার ঢাকায় এক ইতালীয় নাগরিক। এ চারদিন পরই শনিবার রংপুরে টার্গেট করা হলো আরেক জাপানী নাগরিককে। পুলিশ ও গোয়েন্দাদের ধারণা, বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন বিদেশী নাগরিকদের কার্যক্রম রয়েছে। বিশেষ করে এনজিও সংস্থা, কনসালটেন্সি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে টেকনিক্যাল পদগুলোতে চাকরি এবং গার্মেন্টসসহ বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে বিদেশী নাগরিকদের নিয়মিত চাকরির অবস্থান রয়েছে। এর পাশাপাশি কিছু রাষ্ট্রের ছাত্রছাত্রী উচ্চতর লেখাপড়ার জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামে অবস্থান করে থাকেন। ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামেও এদের অবস্থান কম নয়। সিএমপির নগর শাখার ধারণা মতে, তাদের লিস্টে রয়েছে প্রায় ৫ হাজার নাগিরকের নাম। এ ছাড়া আনলিস্টে রয়েছে আরও প্রায় ৫ হাজার বিদেশী নাগরিক। এরা নিয়মিতভাবে আসা যাওয়ায় থাকেন। চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে চলাচলরত দেশী-বিদেশী ফ্লাইটগুলোতে দেখা যায়, বিদেশী নাগরিকদের ভিড়।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এখন শেষ উপায় হিসেবে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে বিদেশী নাগরিক হত্যা, গুম ও অপহরণের পথ বেছে নেয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র্রমন্ত্রী যদিও বলেছেন, ইতালীয় নাগরিক হত্যাকা- বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করছে এগুলো পরিকল্পিত। বিদেশী যে রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের অটুট যে বন্ধন বিরাজমান তাতে ফাটল ধরাতে এ পন্থা বেছে নেয়া হয়েছে। এতে সফল হলে বাংলাদেশ ওইসব দেশের নেক নজর থেকে দূরে সরে যেতে পারে বলে ষড়যন্ত্রকারীদের ধারণায় থাকতে পারে।

এদিকে, ইতালি ও জাপানী দুই নাগরিকের এক সপ্তাহের মাথায় হত্যা করার ঘটনায় প্রতীয়মান হচ্ছে ষড়যন্ত্রকারীরা এ পথে এগিয়ে যাবে এবং এতে করে তারা বড় ধরনের সফলতার কথা মাথায় রেখেছে। কিন্তু সরকারও ইতোমধ্যে এসব ঘটনা নিয়ে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। রাজধানী ঢাকাসহ যেসব স্থানে বিদেশীদের অবস্থান রয়েছে সব স্থানে পুলিশ প্রশাসনকে এ্যালার্ট করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, রাজধানী ঢাকার পর বিদেশীদের সবচেয়ে বেশি অবস্থান বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। বেশ কয়েকটি ইপিজেড, ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠান ও উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবস্থান থাকায় ঢাকার পরে চট্টগ্রামে বিদেশীদের সংখ্যা আনুপাতিকহারে বেশি। ফলে পুলিশ প্রশাসন চট্টগ্রামে আগেভাগে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। শনিবার সিএমপি সূত্রে এর বিস্তারিত বক্তব্য দেয়া হয়েছে।

ঢাকায় ইতালিয়ান এক নাগরিককে হত্যার পর শনিবার রংপুরে এক জাপানী নাগরিককে হত্যার ঘটনার পর বাংলাদেশে বসবাসরত বিদেশীদের মাঝে চরম উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে। বাণিজ্য, চাকরি এবং বিভিন্ন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে কনসালটেন্ট হিসেবে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বিপুলসংখ্যক বিদেশীর অবস্থান রয়েছে। এ অবস্থায় শনিবার সিএমপির পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে এ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। অনুরূপ এ্যালার্ট করা হয়েছে বিদেশী নাগরিকদের অবস্থানের এলাকার পুলিশকে। চট্টগ্রামে অবস্থানরত বিদেশীদের নিরাপত্তা দেয়াকে পুলিশ এখন চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ইতালীয় নাগরিক সিজার তাভেলাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর শনিবার রংপুরে জাপানী নাগরিক ওসি কোনিওকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি বিবেচনায় এনে সিএমপির শীর্ষ কর্মকর্তারা বৈঠক করেছেন। নগরীতে বিদেশীদের প্রবেশের ক্ষেত্রে আগে থেকে নগর পুলিশের বিশেষ শাখাকে অবহিত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আবাসিক হোটেলগুলোতে বিদেশী নাগরিকদের অবস্থানের বিষয়ে নিয়মিত তথ্য দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

সিএমপি সূত্রে জানানো হয়, ঢাকার পর চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি বিদেশী নাগরিকের অবস্থান। তাদের নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশ প্রশাসন টেনশনে আছে। এর পাশাপাশি বিদেশী নাগরিকরাও উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। এর আগে ইতালীর নাগরিক খুনের ঘটনার পর থেকেই সিএমপিতে চেকপোস্ট বসিয়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। শনিবার সকালে জাপানী নাগরিক হত্যাকা-ের খবর সংবাদের পর সিএমপির থানা, ফাঁড়ি ও জোনগুলোকে রেড এ্যালার্ট করা হয়েছে। সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) দেবদাস ভট্টাচার্য সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, প্রথাগত পদ্ধতি বাদ দিয়ে এসব ঘটনা নিয়ে ভিন্ন কৌশলে এগোনোর চেষ্টা চলছে।

সিএমপি সূত্রে জানানো হয়, বিদেশী নাগরিকরা কে কখন কোথায় যাচ্ছেন সব তথ্য পুলিশের কাছে থাকে না। এক্ষেত্রে চেকপোস্ট বসিয়ে নজরদারির মাধ্যমে তা চিহ্নিত করার চেষ্টা চলবে। যেসব বিদেশী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন তাদের ব্যাপারে তথ্য চাওয়া হয়েছে। এদের পূর্ণ তালিকা পাওয়া গেলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সুবিধা হবে।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রামে সিইপিজেডের কয়েকটি কারখানায়, ইউএসটিসি, এশিয়া ইউনিভার্সিটি অব উইম্যানসহ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দূতাবাসের শাখা, অলি ফঁসেসসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বিদেশী নাগরিকদের অবস্থান রয়েছে। আবার এদের অধিকাংশের আবাসস্থল রয়েছে হালিশহর, নাসিরাবাদ, খুলশী, ওআর নিজাম রোড, চান্দগাঁওসহ বিভিন্ন স্থানে। নগরীর বিভিন্ন স্থানে এদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। আবার অনেকে ঢাকায় থেকে কয়েকদিনের জন্য চট্টগ্রামে এসে কাজ করে চলেও যান।