২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাংলাদেশে নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে একমত নন বিদেশী কূটনীতিকরা

তৌহিদুর রহমান ॥ ইতালি ও জাপানের দুই নাগরিককে হত্যার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে বিদেশী কূটনীতিকদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। তাদের কেউ কেউ মনে করছেন দুই নাগরিককে হত্যা করা হলেও বাংলাদেশে বিদেশী নাগরিকরা নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে নেই। আবার কোন কোন দেশ মনে করছে এই হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বিদেশীরা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। তারা সরকারের প্রতি বিদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা জোরদারে অনুরোধ জানিয়েছেন। এদিকে জাপানি নাগরিককে হত্যার ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছে দেশটি। আর দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশে বসবাসরত নাগরিকদের চলাফেরায় সতর্ক করে দিয়েছে। একাধিক কূটনৈতিক সূত্র এসব তথ্য জানায়।

ঢাকায় ইতালির নাগরিক সিজার তাভেলাকে হত্যার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও অস্ট্রেলিয়া নিজ নিজ নাগরিকদের প্রতি সতর্কবার্তা দেয়। তবে শুক্রবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সতর্কবার্তা শিথিল করে। আর ইতালি তাদের রেড এ্যালার্ট প্রত্যাহার করে নেয়। এরই মধ্যে শনিবার রংপুরে হত্যাকা-ের শিকার হন একজন জাপানি নাগরিক।

ইতালীয় নাগরিককে হত্যার পর ঢাকার যুক্তরাজ্য হাইকমিশনের সতর্কবার্তা যখন বহাল, তখনই বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে বেড়িয়েছেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি প্রতিনিধি দল। চার সদস্যের ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি প্রতিনিধি দল শুক্রবার ঢাকা ত্যাগ করার আগে সাংবাদিকদের জানিছেন, বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা চমৎকার ও সুরক্ষিত। এখানে রেড এ্যালার্ট জারির মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলেও তারা জানান। এর আগে ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত মা মিং চিয়াং সাংবাদিকদের জানান, নিজ দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে রেড এ্যালার্ট জারির কোন পরিকল্পনা তাদের নেই। আর ইতালির নাগরিক তাভেলা হত্যাকা-কে একটি সাধারণ সংঘটিত অপরাধ বলেও মনে করেন তিনি।

এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুই বিদেশী নাগরিককে হত্যার ঘটনায় কয়েকটি দেশের কূটনীতিকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্য দেশের কূটনীতিকরা তাদের সঙ্গে একমত নন। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবনতি এখনও সেই পর্যায়ে যায়নি যে, এখান থেকে চলে যেতে হবে বা আসা বন্ধ করতে হবে। আর সিজার তাভেলাকে আইএস হত্যা করেছে কি-না সে বিষয়েও একমত নন মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিকরা। ঢাকায় আরব দেশের কূটনীতিকদের ডিন ও মিসরের রাষ্ট্রদূত মাহমুদ ইজ্জাত বলেছেন, তাভেলাকে কারা খুন করেছে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এখনই এ বিষয়ে কোন কিছু বলা উচিত নয়। তদন্ত শেষ হলে সেটা বলা সম্ভব হবে। ইতালিও বলেছে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই হত্যাকা- নিয়ে তারা এখনই কোন মন্তব্য করবে না।

সিজার তাভেলাকে হত্যার ঘটনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজ নিজ নাগরিকদের প্রতি প্রথমে যে সতর্কবার্তা দিয়েছিল, সেটা শিথিল করে। একই সঙ্গে দূতাবাসের কনস্যুলার সেবা চালুর বিষয়টিও তারা জানায়। এরই মধ্যে শনিবার জাপানি নাগরিককে হত্যার মধ্য দিয়ে বিদেশী কূটনীতিক ও নাগরিকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দুই বিদেশী নাগরিক হত্যাকা-ের পর শনিবার ঢাকার কয়েকটি দেশের দূতাবাসের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা জোরদারের জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ করা হয়েছে। এর আগে ইতালির নাগরিকের হত্যার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর পক্ষ থেকে রাজধানীর কূটনৈতিক জোনে নিরাপত্তা জোরদারে সরকারের প্রতি অনুরোধ করা হয়েছিল। তাদের অনুরোধের প্রেক্ষিতে কূটনৈতিক এলাকায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়।

এদিকে জাতিসংঘ অধিবেশন শেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শনিবার দেশে ফিরেছেন। তিনি ঢাকার বিমানবন্দরে এসেই বাংলাদেশে দুই বিদেশী হত্যার পেছনে কারা রয়েছে, তাদের খুঁজে বের করতে গোয়েন্দাদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন।

রংপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে জাপানি নাগরিক হোসে কুনিও হত্যার ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছে ঢাকার জাপান দূতাবাস। শনিবার ঢাকার জাপান দূতাবাসের মুখপাত্র মাচুনাগা এ দাবি জানান। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে জাপানি নাগরিক খুনের ঘটনাটি আমরা জানতে পেরেছি। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।

এদিকে রংপুরে জাপানি নাগরিককে হত্যার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে অবস্থানরত দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকদের সতর্ক করেছে দেশটি। শনিবার দক্ষিণ কোরিয়ার ঢাকার দূতাবাস সংস্থাটির ফেসবুক পেইজে এক পোস্টের মাধ্যমে এই সতর্কবার্তা দিয়েছে। এতে বাংলাদেশে অবস্থানরত দক্ষিণ কোরীয় নাগরিকদের চলাফেরায় সাবধানতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। দেশের যে কোন স্থানে চলাফেরার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ব্যাপারে উচ্চপর্যায়ে সচেতনতা অবলম্বনেরও আহ্বান জানানো হয়।

শনিবার বেলা পৌনে এগারোটার দিকে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার নাসিনিয়ার বিল কচুআলুটারি এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন জাপানের নাগরিক হোসে কুনিও। ওই এলাকায় তার একটি ঘাসের প্রকল্প রয়েছে। সকালে এই প্রকল্প থেকে ফেরার পথে কচুআলুটারি এলাকায় তাকে গুলি করা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এর আগে সোমবার গুলশান ই-এর ৯০ নম্বর সড়কে সিজার তাভেলাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি আইসিসিও কো-অপারেশন নামে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রুফ (প্রফিটেবল অপরচ্যুনিটিজ ফর ফুড সিকিউরিটি) কর্মসূচীর প্রকল্প ব্যবস্থাপক ছিলেন। আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) এ হামলার দায় স্বীকার করেছে বলে জঙ্গী হুমকি পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ‘সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ’ জানিয়েছে। তবে আইএসের এই দাবির সত্যতা যাচাই হয়নি বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

জাপানী নাগরিক হত্যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত বিচার দাবি ॥ জাপানের নাগরিক হোসে কোনিও হত্যার দ্রুত বিচারের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই ঘটনায় শোক জানিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট এ আহ্বান জানান। শনিবার ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।

এতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট বলেন, রংপুরে জাপানের নাগরিক হোসে কোনিওর মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে শোকাহত। আমি তাঁর পরিবার, বন্ধু ও জাপানের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। এ অপরাধের প্রতিটি বিষয় তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দ্রুত বিচারের কাঠগড়ায় আনতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।