২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এক ঘণ্টার মধ্যে তিন নবজাতকের মৃত্যু, হাসপাতাল সিলগালা

  • দিনভর উত্তেজনা ছিল এশিয়ান কার্ডিয়াক এ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে

স্টাফ রিপোর্টার ॥ একে তো অবৈধ হাসপাতাল, তারওপর চিকিৎসকও ভুয়া। আর এর মাসুল দিতে হয়েছে নিষ্পাপ শিশুদের। মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে রাজধানীর লালমাটিয়ায় অনুমোদনহীন এ হাসপাতালে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে বিক্ষুব্ধ স্বজনরা হাসপাতালের স্টাফদের মারধর ও ভাংচুর করেছে। তবে এ বিষয়ে থানায় কোন মামলা বা জিডি হয়নি। আতঙ্কে অন্য অভিভাবকরা তাদের বাচ্চাদের ওই হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নিয়েছে। এ নিয়ে শুক্রবার রাত থেকে শনিবার দিনভর উত্তেজনা বিরাজ করে। পরে পুলিশের সহযোগিতায় স্বাস্থ্য অধিদফতর হাসপাতালটি বন্ধ ঘোষণা করে সিলগালা করে দিয়েছে।

স্বজনরা অভিযোগ করেছেন, লালমাটিয়ার বি-ব্লকের ৩/৩ এশিয়ান কার্ডিয়াক এ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে শুক্রবার রাত নয়টা থেকে দশটার মধ্যে তিন শিশুর মৃত্যু হয়। এ নিয়ে গত ৪ দিনে হাসপাতালটিতে ৬ শিশুর মৃত্যু হয়। ভুল চিকিৎসা, চিকিৎসকদের অবহেলায় এসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেন তারা। নিহত শিশুদের স্বজনদের সঙ্গে হাসপাতালের স্টাফদের হাতাহাতি হয়। শিশুদের স্বজনরাও স্টাফদের মারধর করেছে। শনিবার সকালে হাসপাতালটিতে গিয়ে কোন চিকিৎসককে পাওয়া যায়নি। আতঙ্কিত অভিভাবকরা অসুস্থ শিশুদের দ্রুত হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নিচ্ছেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডাঃ শামিউল ইসলাম শনিবার জনকণ্ঠকে বলেন, মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে তিন শিশুর মৃত্যু খবর পেয়ে তারা হাসপাতাল পরিদর্শনে যান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ২০১৩ সালে রেজিস্ট্রেশন নিয়েছিল গাইনি ও হার্টের চিকিৎসা দেয়ার বিষয়ে; কিন্তু পরে তারা লাইসেন্স নবায়ন করেনি। ফলে হাসপাতালটি অবৈধ। এছাড়া তাদের আইসিইউ, এনআইসিইউ ও পেড্রিয়াটিক (নবজাতক) বিষয়ে কোন অনুমোদন নেয়া ছিল না। এতে হাসপাতালের পুরো কার্যক্রমই অবৈধ। পরে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালটি শনিবার সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

হাসপাতালে কথা হয় শিশু রোগীর স্বজন ওয়াসিমের সঙ্গে। তিনি জানান, অসুস্থ ভাতিজাকে নিয়ে তিনি শিশু হাসপাতালে যান। সেখান থেকে এক দালালের মাধ্যমে ওই হাসপাতালে ভর্তি করান। চার দিনেও তার ভাতিজার তেমন কোন উন্নতি হয়নি। এক ঘণ্টায় তিন শিশু মারা যাওয়ায় বাধ্য হয়ে তার ভাতিজাকে সেন্ট্রাল হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন।

চিকিৎসক না থাকা এ হাসপাতালের এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন এক শিশুর স্বজন এহসান উদ্দিন বলেন, তারা শিশুটিকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তারা শুনেছেন চার দিনে এই হাসপাতালে ছয় শিশু মারা গেছে। শুক্রবার রাতে মারা যাওয়া তিন শিশুর দু’জন এসেছিল মাতুয়াইল থেকে এবং একজন এসেছিল চাঁদপুর থেকে। মৃত তিন শিশুর মধ্যে দু’জনের শ্বাসকষ্ট ও একজন ছিল অপরিণত বয়সে জন্ম নেয়া। পরে তারা তিনজনই মারা গেছে।

এনআইসিইউর নার্স জয়া জানান, শনিবার সকালে তিন শিশু চিকিৎসাধীন ছিল। দুপুরে তাদের হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জয়ার দাবি, হাসপাতালে চিকিৎসার সব ব্যবস্থা আছে। মৃত তিন শিশুর মধ্যে দু’জনের শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। একজন ছিল অপরিণত শিশু। পরে তারা মারা গেছে। তাদের নাম ও বিস্তারিত ঠিকানা জানাতে পারেননি তিনি।

নার্স জয়া জানান, এনআইসিইউতে নবজাতক বিশেষজ্ঞ শিশির রঞ্জন দাস নামে এক চিকিৎসক চিকিৎসা দেন। তিনি ওই হাসপাতালের সর্বক্ষণিক চিকিৎসক নন। সকালে ও রাতে যখন সময় পান, হাসপাতালে এসে চিকিৎসা দেন। বাকি সময় হাসপাতালের অন্য চিকিৎসক ও নার্সরা চিকিৎসা দেন। শিশির রঞ্জন দাস সরকারী কোন হাসপাতালের সঙ্গে জড়িত, জয়া তা জানেন না বলে জানান।

সকাল থেকে হাসপাতালে পুলিশ মোতায়েন ছিল। হাসপাতালে নিয়োজিত মোহাম্মদপুর থানার এসআই কামরুজ্জামান জানান, তারা ভাংচুর ও হামলার খবর পেয়ে হাসপাতালে এসেছেন। কিন্তু তারা সেখানে পৌঁছার আগেই মারা যাওয়া শিশুদের স্বজনরা লাশ নিয়ে গেছেন। তারা কোন মামলা বা অভিযোগ করেননি, যে কারণে পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি। তিনি আরও জানান, হাসপাতালের মালিক ৭-৮ জন। তাদের মধ্যে কয়েকজন ডাক্তারও আছেন। তাদের বিষয়ে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম চলছে।

মোহাম্মদপুর থানার ওসি জামাল উদ্দিন জনকণ্ঠকে জানান, শিশুর স্বজনরা কেউ মামলা বা জিডি করেনি। উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। সিদ্ধান্ত পাওয়া গেলে পুলিশ তদন্ত করে আইনী ব্যবস্থা নেবে।

তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার জানান, শুক্রবার রাত নয়টা থেকে দশটার মধ্যে হাসপাতালে ৩ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তারদের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। কেউ অভিযোগ না করলেও হাসপাতালের মালিক ও ডাক্তারদের খোঁজা হচ্ছে। তারা জানতে পেরেছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে দালালের মাধ্যমে শিশু রোগী ওই হাসপাতালে নেয়া হয়। সম্প্রতি হাসপাতালের মালিকানা বদল হয়েছে।

সরেজমিন হাসপাতালে দেখা যায়, চিকিৎসকের অভাব ও নানা অব্যবস্থাপনায় শিশু মৃত্যুর অভিযোগে অন্য রোগীর অভিভাবকরাও আতঙ্কিত হয়ে অন্যত্র চলে গেছে। হাসপাতালটির প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে।

ভবনের কেয়ারটেকার আবদুল জলিল জানান, তিনি শুনেছেন গত এক সপ্তাহের মধ্যে এখানে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই হাসপাতালটির মালিক নাজিম উদ্দিন নামে এক ব্যবসায়ী। তবে পরিচালনা করেন মনসুর আহমদ।

নির্বাচিত সংবাদ