১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মক্কায় হাজীদের বাড়িভাড়া নিয়ে মোটা অঙ্কের বাণিজ্যের অভিযোগ

  • দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস ধর্মমন্ত্রীর

বাবুল হোসেন, মক্কা থেকে ॥ মক্কায় সরকারের বাড়তি কোটায় আসা হাজীদের বাড়ি ভাড়া নিয়ে মোটা অঙ্কের বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।

শেষ সময়ে আসা এসব হাজীদের জন্য পাহাড়ের টিলার ওপরে কম মূল্যের বাড়ি ভাড়া করে বাড়তি অর্থের লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ হারাম শরীফ থেকে কাছের সমতলের একাধিক বাড়ি এর চেয়ে কম মূল্যে ভাড়া নিয়েছে অনেক হজ এজেন্সির মালিক। প্রচার রয়েছে হজ কমিশনের কতিপয় অর্থলোভী কর্মকর্তা, হাবের প্রভাবশালী নেতা ও ধর্মমন্ত্রীর আশপাশে থাকা কয়েক নেতা যোগসাজশ করে মোটা অঙ্কের বাড়তি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। লুটপাটের এই অঙ্ক ৩০ কোটি টাকার ওপর হতে পারে। এ প্রেক্ষিতে এক সপ্তাহ আগে ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান একটি তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটির দেয়া রিপোর্টে অনিয়ম পাওয়া গেছে। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পেয়ে ধর্মমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

জানতে চাইলে মদিনায় অবস্থানরত ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, ‘হাজীদের নিয়ে কাউকে বাণিজ্য করতে দেয়া হবে না। কেউ অনিয়ম করে পার পাবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাজীদের বিষয়টি বিদেশে থেকেও নিয়মিত খোঁজ নিয়েছেন। এ ব্যাপারে সরকার জিরো টলারেন্স। হাজীদের নিয়ে যারা নয়-ছয় করবে তাদের কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। তিনি বলেন, যেসব এজেন্সির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে, তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ মোটা অঙ্কের জরিমানা করা হবে।

ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, হজ এজেন্সিগুলো টাকা নেয়ার পরও সময়মতো অনলাইনে আবেদন না করায় চলতি মৌসুমে ৫ হাজার হজযাত্রীর হজ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত প্রচেষ্টায় বাড়তি কোটায় ৫ হাজার মুসল্লি সৌদি আরবে পৌঁছে হজের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছেন। এসব হাজীকে যৌথভাবে হাব নেতৃবৃন্দ বাড়ি ভাড়া থেকে শুরু করে সবকিছু দেখভাল করার প্রস্তাব দিলেও হাবের সাবেক সভাপতি ও লাব্বাইক ট্রাভেল এর মালিক জামাল উদ্দিন। ধর্মমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে এককভাবে এসব হাজীদের সমতলে বাড়ি ভাড়া ও দেখভাল করার দায়িত্ব নেন তিনি। তবে লাব্বাইক ট্রাভেলসের মালিক জামাল উদ্দিন অভিযোগ অস্বীকার করে জনকণ্ঠকে জানান, তিনি কেবল মক্কায় ও মদিনায় হাজীদের বাড়ি ভাড়ার ব্যাপারে রেট দিয়ে সহায়তা করেছেন। আর বাড়ি ভাড়ার চুক্তি করেছে হজ মিশন।

অভিযোগে জানা গেছে, হারাম শরীফ থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরের মিসফালা এলাকায় বাইরে তাকওয়া এলাকায় জেলার দোর খোদাই পাহাড়ের টিলার ওপর ৮টি বাড়িতে এসব হাজীদের আবাসনের ব্যবস্থা করেছেনে জামাল। হাবের এক সভায় সমতলে বাড়ি ভাড়া করার বিষয়টি নিশ্চিতও করা হয়েছিল। হাবের বর্তমান সভাপতি ইব্রাহিম বাহারের নেতৃত্বে হাজীদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব থাকলেও উমরাহর নামে মানবপাচারের অভিযোগে তাকে কমিটির বাইরে রাখা হয়েছে। এই সুবাদে হাবের সাবেক এই নেতা ও মন্ত্রণালয়ের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে পুরো বাড়ি ভাড়া প্রক্রিয়া নয়-ছয় হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাহাড়ের টিলার ওপরে এসব বাড়ি ভাড়া কোনমতেই ৪০০ রিয়েলের বেশি হওয়ার কথা নয়। অথচ এসব বাড়ি ভাড়া করা হয়েছে ৮৩০ রিয়েল করে। হাবের সাবেক সহ-সভাপতি আফতাব উদ্দিন চৌধুরী জানান, হারাম শরীফ থেকে এর চেয়ে কাছের সমতলে বাড়ি করা হয়েছে মাত্র ৬০০ রিয়েল করে। হাবের মক্কার একাধিক সূত্র জানায়, দোর খোদাই এলাকার আল-রাজী ব্যাংকের কাছে সমতলে ৬০০ রিয়েলে হাজীদের জন্য পিক আওয়ারে বাড়ি ভাড়া নেন হাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ওয়ার্ল্ড ভিউ ট্রাভেলসের মালিক আজাহারুল ইসলাম চৌধুরী। আর এস ট্রাভেলসের মালিক ও হাবের নির্বাহী সদস্য জিয়াউল হক মজুমদার এর চেয়ে কম ৫০০ রিয়েলে বাড়ি ভাড়া নিয়েছেন একই এলাকার সমতলে হারামের কাছে। পাহাড়ের টিলার ওপর হাজীদের বসবাস অযোগ্য মানহীন প্রতিটি বাড়ি ভাড়ার পেছনে বাড়তি ব্যয় হয়েছে সরকারের ৩০০-৪০০ রিয়েল হারে। প্রায় দ্বিগুণ বাড়তি টাকায় পাহাড়ের টিলার ওপরে বাড়ি ভাড়া করার কারণে একদিকে সরকারের মোটা অঙ্কের অর্থ গচ্চা গেছে, অন্যদিকে পাহাড়ের টিলায় থাকা হাজীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। পাহাড় থেকে ওঠানামায় কষ্টসাধ্য বলে হাজীরা হারাম শরীফে গিয়ে ঠিকমতো ইবাদত বন্দেগী করতে পারেনি। হজের সময় অনেকের তাওয়াফ ও সাঈ করা হয়নি। পাহাড়ের আশপাশে খাবারের রেস্তরাঁ ছাড়াও পানীয় জলের কোন ব্যবস্থা না থাকায় চরম দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন হাজীরা। ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করতে না পেরে এবং মাত্রাতিরিক্ত মানসিক চাপে ১৩ নম্বর বাড়িতে নাটোর গুরুদাসপুরের আবু জাহিদ নামে এক হাজীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। মদিনায় ১৫০ রিয়েলের বাড়ি ভাড়া নেয়া হয়েছে ১৮০ রিয়েল করে। এসব নিয়ে হাবের ভেতরে বাইরে এবং মক্কার বাংলাদেশ হজ মিশনসহ হাজীদের মধ্যে চলছে নানা কানাঘুষা। হজের আগে ঢাকায় হাবের ১০ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি মক্কায় বাড়ি ভাড়ার ব্যাপারে যৌথভাবে কাজ করার দাবি জানালেও পরে কম সময়ের অজুহাতে হাবের সাবেক সভাপতি জামাল উদ্দিনের একক সিদ্ধান্তে এসব বাড়ি ভাড়া নেয়া হয়। এককভাবে দায়িত্ব নিয়ে বাড়ি ভাড়া করা হলে হাজীদের দুর্ভোগসহ অনিয়ম-দুর্নীতি হতে পারে এমন আশঙ্কায় হাবের আফতাব উদ্দিন চৌধুরী ঢাকার হোটেল রাজমনিতে অনুষ্ঠিত ওই সভার সিদ্ধান্তে স্বাক্ষর করেননি। এই ক্ষেত্রে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অর্থলোভী একাধিক কর্মকর্তা জামালকে সমর্থন দেন। পরে মন্ত্রণালয়ের এসব কর্মকর্তার সহায়তায় মক্কায় সমতলে বাড়ি ভাড়ার ব্যাপারে ধর্মমন্ত্রীকে শতভাগ নিশ্চয়তাও দেন জামাল। অথচ হজে আসার পর সবকিছু ঘটেছে উল্টো এবং হাব নেতার আশঙ্কাই সত্য হয়েছে বলে দাবি হাব নেতৃবৃন্দের। এসব নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় মক্কায় এসে ক্ষুব্ধ ধর্মমন্ত্রী ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত সচিব শহীদুজ্জামানকে প্রধান করে ৩ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। এদিকে হজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্কের অবসানে মক্কার বাংলাদেশ হজ মিশনে হাবের সহ-সভাপতি আবুল কাশেমের সভাপতিত্বে এক সভা হয়েছে। সভায় হাব মহাসচিব শেখ আব্দুল্লাহসহ নির্বাহী কমিটির একাধিক সদস্য বাড়ি ভাড়া ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে নিন্দা জানান। সভায় লাব্বাইক ট্রালেলসের মালিক জামাল উদ্দিন, ফ্যান ব্রাইটের মালিক রুহুল আমিন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও সরকারের বাড়তি কোটায় হাজীদের সুবিধা নেয়ায় ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করা হয়।