২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এবার শিক্ষক নিয়েগ পদায়ন নিয়ে বিতর্কে বুয়েট

  • প্রতিবাদে সোচ্চার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা

বিভাষ বাড়ৈ ॥ বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না বুয়েটের। প্রতিক্রিয়াশীলদের তৎপরতা নিয়ে সমালোচনার মধ্যেই বুয়েটে এবার শিক্ষক নিয়োগ, পদায়নে অনিয়ম, দুর্নীতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েও এক নারী শিক্ষককে কাজে যোগদানে বাধা প্রদানের কেলেঙ্কারির মধ্যেই বিধি লঙ্ঘন করে ১৭১ নম্বর সিরিয়ালে থাকা বিতর্কিত একজন জুনিয়র শিক্ষককে রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব দেয়া নিয়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। এদিকে শিক্ষকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ আনা হয়েছে আরেক ইনস্টিটিউটের অধ্যাপকের বিরুদ্ধে। শিক্ষা জীবনে কোন প্রথম শ্রেণী না থাকলেও সহকারী, সহযোগী এমনকি অধ্যাপক পদে এ শিক্ষক কিভাবে চলে এলেন তার তদন্ত করে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপাচার্যের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন শিক্ষকরা।

বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও পদায়নে অব্যাহত এ অনিয়মের ঘটনাকে ‘লজ্জাজনক’ অভিহিত করে এর প্রতিবাদে সরব হয়েছেন বুয়েটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বুয়েটের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অনাকাক্সিক্ষক এ ঘটনা নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে প্রতিষ্ঠানটিতে। শিক্ষকরা উপাচার্যের কাছে এক শিক্ষকের যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও অধ্যাপকের পদে চলে আসার ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে যেখানে অনার্স ও মাস্টার্স দুটোতেই প্রথম শ্রেণী থাকা বাধ্যতামূলক সেখানে কোন প্রথম শ্রেণী ছাড়াই একজনের অধ্যাপক পর্যন্ত চলে আসা চরম অনিয়ম। একজন ছাত্র শিক্ষা জীবনে সর্বোচ্চ গ্রেড পেয়েও যেখানে অনেক সময় প্রতিযোগিতার কারণে বুয়েটে ছাত্র হিসেবে প্রবেশ করতে পারে না সেখানে সারাজীবন দ্বিতীয় বিভাগ পাওয়া একজনের অধ্যাপক পদে যাওয়া নিতান্তই অগ্রহণযোগ্য। জানা গেছে, নিয়োগ পদায়নে অব্যাহত অনিয়মের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বেশ কিছুৃদিন ধরেই শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। এ নিয়ে শিক্ষকরা বেশ কয়েকদিন বৈঠক করেও আপত্তি জানিয়েছেন। কিন্তু কোন কিছুতেই ফল না পাওয়ায় এখন আন্দোলনের চিন্তা করছেন ক্ষুব্ধ শিক্ষকরা। অনিয়মের প্রতিবাদে শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীরাও যোগ দেয়ার চিন্তা করছেন। অনিয়মের প্রতিবাদ জানাচ্ছে ছাত্র সংগঠনগুলো। প্রায় তিন মাস ধরে বিতর্ক চলছে এক নারী শিক্ষককে নিয়োগ দিয়েও তাকে যোগদানে বাধা নেয়ার ঘটনা নিয়ে। একাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও ইতোমধ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েও নীলোপল অদ্রিকে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগে যোগদানে বাঁধা প্রদানের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় লজ্জাজনক ঘটনার জন্ম দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। যোগ্যতাবলে নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এমনকি সিন্ডিকেটের অনুমোদনের পর নিয়োগপত্র পেয়েও মাসের পর মাস ধরে কর্তৃপক্ষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন শিক্ষক। ভুক্তভোগী ওই নারী শিক্ষকের যোগদানে বাগড়া বাঁধিয়েছেন বিভাগের চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন। অথচ আপত্তির কোন সুযোগই নেই। যোগদানের বিপক্ষে কোন যুক্তি নেই উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারের কাছেও, তবু নেই সঙ্কটের সমাধান। ঘটনাকে ‘লজ্জাজনক’ অভিহিত করে সরব হয়েছেন বুয়েটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ঘটনা গড়িয়েছে উচ্চ আদালত পর্যন্ত। ভুক্তভোগী এ নারী শিক্ষক বুয়েটের এ কর্মকা-ের বিরুদ্ধে আদালতে রিট করেছেন। ইতোমধ্যেই আদালত এ শিক্ষকের পদে অন্য যে কারও নিয়োগ স্থগিত করেছে। এছাড়া উপাচার্য, বিভাগীয় প্রধানসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে রুল জারি করেছে আদালত। রিটের পূর্ণাঙ্গ শুনানি হবে আগামী ১০ নবেম্বর। ভুক্তভোগী এ শিক্ষক নীলোপল অদ্রি জনকণ্ঠকে বলছিলেন, আমি এখনও আশাকরি দ্রুত বিষয়টির সুরাহা হবে। আমার এক সময়ের যারা স্যার তারাই এখন আমার কলিগ। আমি তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক কোন মনোভাব পোষণ করিনি কখানও। কিন্তু জানি না কি কারণে চেয়ারম্যান স্যার বা অন্যরা এমন করছেন। আমি জানি না কি আমার অপরাধ বা অযোগ্যতা। তবে আমি খুব কষ্ট পাচ্ছি।’

এদিকে এ বিতর্কের মধ্যেই জটিলতা চরম আকার ধারণ করেছে রেজিস্ট্রার নিয়োগ ও একজন অধ্যাপকের নিয়োগ পদায়নে অনিয়ম নিয়ে। শিক্ষকরা জানতে পেরেছেন আর্কিটেকচার বিভাগের অধ্যাপক ড. নায়েব মোঃ গোলাম জাকারিয়াকে রেজিস্ট্রার করা হচ্ছে। শনিবার সকালে তার নিয়োগ প্রক্রিয়াও প্রায় চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে শিক্ষকরা এর প্রতিবাদ জানান। ক’দিন ধরেই আপত্তির পরেও জ্যেষ্ঠতার দিক থেকে ১৭১ নম্বরে থাকা একজন শিক্ষককে রেজিস্ট্রার করার উদ্যোগ নিয়ে প্রতিবাদের মুখেই চলছে নিয়োগ প্রক্রিয়া। শিক্ষকরা বলেছেন, কেবল জুুনিয়রই নন, শিক্ষক সমিতির রেজুলেশন আছে এ ধরনের একটি প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালন শেষে ওই শিক্ষককেই আরেকটি একই ধরনের পদে বসানো যাবে না। বরং অন্যদেরও দায়িত্ব দিতে হবে। অথচ এখানে তাও মানা হচ্ছে না। এ শিক্ষককে টানা একই ধরনের পদে দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। প্রথমে ৫ বছর শের-ই বাংলা হলের সহকারী প্রাধ্যক্ষ, এরপরই দুই বছর ছাত্র কল্যাণ পরিষদের সহকারী পরিচালকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এখন আবার রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকরা উপাচার্য অধ্যাপক খালেদা ইকরামের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন এআরই-এর অধ্যাপক ড. মোঃ মাহবুব আলম তালুকদারের নিয়োগে গুরুতর অনিয়মের বিষয়ে। লিখিক অভিযোগপত্রে শিক্ষকরা বলেছেন, ড. মোঃ মাহবুব আলম তালুকদার শিক্ষা জীবনে কোন প্রথম বিভাগ/শ্রেণী অর্জন করেননি। অথচ শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্তির জন্য অনার্স ও মাস্টার্সে উভয় ক্ষেত্রেই প্রথম শ্রেণী থাকা বাধ্যতামূলক। শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, অদৃশ্য কারসাজিতে এখানে পরপর তিনটি নিয়োগে অর্থাৎ সহকারী, সহযোগী ও অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

বুয়েটে এহেন চরম অনিয়মে শিক্ষকরা ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ। শিক্ষকরা উপাচার্যের কাছে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে চিঠিতে বলেছেন, এই অনিয়মে দায়ী ব্যক্তিবর্গকে চিহ্নত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষকরা জানিয়েছেন, আমরা মৌখিকভাবে অভিযোগ দেয়ার পর উপাচার্য লিখিত অভিযোগপত্র জমা দিতে বলেছিলেন। লিখিত অভিযোগপত্রে শিক্ষকদের দাবির প্রেক্ষিতে উপাচার্য অধ্যাপক খালেদা ইকরাম তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন।