২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিশাল জলাশয়ে পাখির অভয়ারণ্য ঘুম ভাঙে কলকাকলিতে

  • বরেন্দ্র জনপদ বরেন্দা

ডি এম তালেবুন নবী

সবুজের মহাসমুদ্র। গাড় সবুজের এই সমুদ্র কিন্তু সারা বছর সবুজ থাকে না। মৌসুমের সঙ্গে রং বদল হয়ে ভিন্ন মাত্রাতে গিয়ে পৌঁছে। আর মাত্র দেড় মাসের মধ্যে গাড় সবুজে পরিবর্তিত সোনালী বর্ণে। কাস্তে হাতে কোপ দেবে শ্রমিকরা। বিশাল বরেন্দ্র ভূমির সবুজ আর সোনালী মহাসমুদ্রের মধ্যে নিঝুম দ্বীপের আদলে গড়ে উঠা এলাকাটিতে এখন দোল খাওয়া বাতাসের সৃষ্ট সবুজের ঢেউ আছড়ে পড়ছে বরেন্দ্রর এই নিঝুম দ্বীপে। সেই নিঝুম দ্বীপের নাম বরেন্দা। বরেন্দ্র ভূমির উপর গড়ে উঠেছে গ্রামটি। তবে বর্তমানে বরেন্দাকে অনেকে ডেকে থাকে পাখির গ্রাম বলে। পাখির কারণেই গ্রামটি এখন দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।

বরেন্দার অবস্থান রানীমাতা ইলামিত্রের নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডভুক্ত আদি বরেন্দ্র ভূমির একটি বিচ্ছিন্ন গ্রাম। কিছুদিন ধরে গ্রামের বনজ ও বাঁশঝাড়ে অবস্থান নিয়েছে একাধিক

প্রজাতির পাখি। তবে নানা ধরনের বক পাখির সংখ্যা আধিক্য সবচেয়ে বেশি। তাই একে বক পাখির অভয়ারণ্য বললেও ভুল হবে না। গ্রামের মানুষের সকালের ঘুম ভাঙ্গে পাখির কলকাকলিতে। আমনুরা থেকে নাচোলমুখী পাকা সড়কের মাইল পাঁচেক পেরিয়ে ছোট বাজারের উত্তর দিকে তাকালেই গ্রামটিকে চোখে পড়বে। পাকা সড়কের খুবই কাছাকাছি গ্রামটির অবস্থান। তারপরও একটি কাঁচা রাস্তা ধানী জমির মধ্য দিয়ে এঁকে বেঁকে চলে গেছে।

গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কৃষক। তাই সকাল হওয়া মাত্র গ্রামটি পুরুষ শূন্য হয়ে পড়ে। এখন আমন মৌসুমের সময় হওয়ার কারণে তারা কেউ জমিতে সেচ দিতে কিংবা আগাছা উপড়াতে নতুবা কিছু কিছু এলাকায় পোকার আক্রমণ হওয়ায় রাসায়নিক কীটনাশক স্প্রে করতে মাঠে চলে যান। মজার ব্যাপার সকালের কিচিরমিচির করে ঘুম জাগানিয়া পাখিরাও কৃষকদের গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারাও বিদায় নিয়ে চলে যায় আহার সংগ্রহ করতে। বহু কষ্টে রফিকুল ইসলাম ও নূরুন নবী নামের দুজনের দেখা মিললে তাদের বর্ণনায় উঠে আসে পাখিদের সম্পর্কে নানান তথ্য। এই সময়ে পাখির সংখ্যা অনেকটাই কমে এসেছে। তবে বক ও কক শ্রেণীর পাখিরা গাছে গাছে বাসা বেঁধে ডিম পেড়ে বাচ্চা ফুটিয়ে দূরে চলে গেছে। তবে মার্চ এপ্রিল আসলেই পাখিরা আবার গ্রামে ফিরতে শুরু করে। গ্রামের ২১টি বাঁশঝাড়ও বিভিন্ন ধরনের অর্ধ সহস্রাধিক বনজ গাছের নিয়ন্ত্রণ যেন পাখির হাতে। তিন শ্রেণীর বক ও স্যাইমকালের উপস্থিতি গ্রামে সবচেয়ে বেশি। গ্রামবাসীরা জানিয়েছে, একশ্রেণীর পাখি আছে ছোট ছোট পানকড়ির মতো আর অন্যরা আকার আকৃতিতে বড় রং বেরঙের বতক ও হাঁসের আকৃতির। গ্রামের অতি সাধারণ মানুষ বক ছাড়া অন্য কোন পাখির নাম বা আসা যাওয়ার নির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে তেমন একটা কিছু বলতে না পারলেও তারা পাখি রক্ষায় বহিরাগতদের আক্রমণ রুখে দিয়েছে অনেক আগেই। শতাব্দী পুরনো গ্রামটি পুরান ঐতিহ্য অনেকটাই ধরে রেখেছে। থানা বা জেলা শহর এক সময়ে যেতে সপ্তাহ পেরিয়ে যেত।

পুরো গ্রামে এক সময়ে নিম্নবর্ণের হিন্দু ও উপজাতিরা ছিল। দেশ বিভাগের পর মুর্শিদাবাদ ও মালদহ অঞ্চলের মুসলমানরা গ্রামে আসতে শুরু করে। বর্তমানে পুরো গ্রামে দেড় হাজার পরিবারের প্রায় অর্ধেক নিম্নবর্ণের হিন্দুদের দখলে। পাখিদের এই অভয়ারণ্যের যে কোন দুর্যোগ মোকাবেলায় গ্রামবাসীর ঐক্য অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বাঁশঝাড়ের বাঁশ ও যে কোন ধরনের বনজ গাছ কাটা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এসব গাছ ও বাঁশঝাড়ে পাখিরা আশ্রয় নিয়ে বসবাস ও ডিমপাড়াসহ বংশবৃদ্ধি করে থাকে। তাই পাখিপ্রেমিক গ্রামবাসী গাছ কাটা একেবারে বন্ধ করে দিয়েছে। পাশাপাশি কেউ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে পাখি শিকার হতে গ্রামে ঢোকার সাহস করে না। এমনকি কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে খাম বা জখম হয়ে কোন পাখি পড়ে গেলে তার চিকিৎসার ব্যবস্থাও করে থাকে গ্রামের মানুষ। কোন পাখি মারা গেলে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। এসব তত্ত্বাবধানে ও পাখিদের নিরাপত্তা দিতে গ্রামবাসী একটি ২১ সদস্যের কমিটি রয়েছে। যার সভাপতি হলেন আব্দুল কাদের ও সেক্রেটারি মনিরুজ্জামান। আব্দুল কাদের জানান, তারা পাখিদের এই অভয়ারণ্যে আরও বিস্তৃত ও নিরাপদ করতে চাইলেও বাইরে থেকে এখন পর্যন্ত তাদের প্রেরণা দিতে সরকারী বা বেরসকারী কোন সংস্থা এগিয়ে আসেনি।

পাখিদের এই নির্ভরযোগ্য অভয়াশ্রম গড়ে উঠার পেছনে অন্যতম কারণ গ্রামের মধ্যকার প্রায় ১০ একরের একটি বিশাল জলাশয় বা রামসাগর। প্রচ- খরা মৌসুমে এখানকার উত্তাপ ৪০ ডিগ্রী সেলসিয়াস অতিক্রম করে থাকে। এ সময়ে পাখি ঝাঁকে ঝাঁকে জলাশয়ে ও আশপাশে আশ্রয় খুঁজে পায়। সারাদিন অবগাহন ও প্রয়োজনীয় পানি খেয়ে উড়ে যেত। কিছু পাখি আশ্রয় নিত আশাপাশের গাছাপালাতে। এইভাবেই আস্তে আস্তে বিশাল জলাশয়ের কারণে পাখিরা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে গ্রামটির গাছপালাতে। যা প্রতিবছরই বেড়ে চলেছে। তবে শীতের চেয়ে গ্রীষ্ম মৌসুমের পাখির কলকাকলিতে ভরে থাকে গ্রামটি। আগেই বলেছি জনপদটি একেবারেই বিচ্ছিন্ন ও নিঝুম। এই নিঝুমতার মাত্রা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একই ধরনের থাকে সারা বছর জুড়েই। কর্মজীবী অতি সাধারণ মানুষের মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গে পাখিরাও একই সময়ে খাদ্যের সন্ধানে বিশাল বরেন্দ্র অঞ্চলের মাঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ নওগাঁ ও রাজশাহীর বিশাল বরেন্দ্র অঞ্চল এসব পাখির বিচরণভূমি। আমন মৌসুমে কয়েক মাস ধরে পোকা মাকড়, তার পরের তিন মাস অর্থাৎ ধান কাটা শুরু হলে জমিতে পড়ে থাকা ধান খেয়ে জীবন ধারণ করে এসব পাখি। বরেন্দ্র অঞ্চলে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উন্নয়নমূলক কর্মকা- ও সেচ সুবিধা সম্প্রসারণের কারণে বছরে তিনের অধিক ফসল উৎপন্ন হয়ে থাকে। বহু কৃষকের জমির পোকার আক্রমণ হলে পাখির ঝাঁক নেমে পড়ে সেই জমিতে। পোকা সাবাড় করে ফিরে উড়ে যায় অন্যত্র। ফলে পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়ে এসব নানা প্রজাতির পাখির ঝাঁকের কদর বা গ্রহণযোগ্যতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে বড় বড় পা ওয়ালা শামক্যাল ও বক পাখি শুধু ক্ষতিকর পোকা নষ্ট করে না, আমন উঠার সময় ইঁদুরের উপদ্রব থেকেও রক্ষা করে কৃষককে। এ কারণে এরা এখন প্রাকৃতিকভাবেই অজান্তে কৃষকবান্ধব পাখি সেজে কৃষকের মন জয় করেছে। এসব কারণে কৃতজ্ঞতা জানাতে অনেক কৃষক সন্ধ্যায় বাড়ি না ফিরে অনেক সময়েই ভিড় জমায় পাখির গ্রাম বরেন্দাতে। এসব পাখি দিন শেষে পৌঁছে যায় নিজ ঘরে। পাখির সঙ্গে নিশি কক সারারাত নানান ধরনের শব্দ করে গ্রামবাসীদের জাগিয়ে থাকে। আগে নির্জন বিচ্ছিন্ন গ্রামে রাতের অন্ধকারে চোর ডাকাতের উপদ্রব ছিল। এখন কোন অজানা অচেনা ব্যক্তি গ্রামে প্রবেশ করলেই এসব পাখি নানান আওয়াজ তুলে গ্রামবাসীকে সজাগ করে তুলে। গ্রামের মধ্যে যাবার সময় একটি বাঁশঝাড়ের কাছে দুই বৃদ্ধার দেখা মিলে। তারা গরুর গোবর জ্বালানির জন্য ঘেটে দিচ্ছিল। পাখির কথা জিজ্ঞেস করতেই খানিক চুপ থেকে পরে আমাদের পরিচয় জানার পর জবাব দেয়া শুরু করে। তারা মনে করেছিলেন তাদের বন্ধু পাখি বা আপনজনের ক্ষতি করার জন্য হয়ত বাইরে থেকে এরা এসেছে প্যান্ট শার্ট পরে মোটরসাইকেল নিয়ে। লক্ষীবালা জানান, বরেন্দা গ্রামের উত্তর পশ্চিম ও দক্ষিণপাড়া মহল্লায় পাখি সবচেয়ে বেশি। এক সচেতন গ্রামবাসী নূরুন নবী তার ৪ কাঠা জামির উপর গড়ে উঠা বাঁশঝাড়ে সহস্রাধিক বক বাস করে। এসব পাখি এখন অপেক্ষা করছে ছানা বা বাচ্চা ফোটার। বাচ্চা ফুটলেই খাদ্য সরবরাহের জন্য বাবা মা মুখিয়ে আছে। তাই তারা দিনের বেলা বাইরে থাকলেও সন্ধ্যায় এসে ডিমপাড়া বাসা পাহারা দিচ্ছে। নূরুন নবী জানালেন তার বাড়ির কাজ করার জন্য কাঁচা বাঁশের প্রয়োজন থাকার পরও তা কাটতে পারছে না। কাটলেই বকদের ডিম ও বাসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সারা গ্রামজুড়ে নুরুন নবীরা ছড়িয়ে রয়েছে। একই অনুভূতি সবার মধ্যে বিরাজমান হওয়ার কারণেই পক্ষীকূল নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। এখন শুধু প্রয়োজন সরকারী তত্ত্বাবধান ও ১০ একরের গভীর খাস জলাশয়টি যেন কেউ দখল করে নিতে না পারে। অপর পক্ষে এই গ্রামে বনজ গাছ কিংবা বাঁশবনের জমি প্রয়োজনে কেনাবেচা হচ্ছে না পাখির কারণে। কারণ জমির মালিক হলেও পাখির ক্ষতি করতে পারবে না। এ যেন গ্রামবাসীদের একটা অলিখিত চুক্তি। তাদের সবার কাছে গাছে বসে থাকা পাখিগুলো আপন সন্তানের মতো। তাই স্নেহের একটুও ঘাটতি নেই কারও মধ্যে পাখি নিয়ে।

আরও একটি বক অভয়ারণ্য ॥ একেবারে বিপরীত মুখী অবস্থান। এখানে শুধু নানান ধরনের বক পাখির বিচরণভূমি ও আশ্রয় স্থল। এলাকাটি বরেন্দ্র ভূমির মতো নিরিবিল নয়। দূরত্বের দিক দিয়েও অনেক দূরে। দুটি পাখি আশ্রমের মধ্যে দূরত্ব ৮০ কিলোমিটারের বেশি হবে। ভূপ্রকৃতিগতভাবেও ভিন্নতা রয়েছে। এসব বক পাখির অবস্থান সদর উপজেলার চরাঞ্চলে। খরস্রোতা পদ্মার চরে এরা খাদ্য সংগ্রহ করে থাকে। প্রায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে শুধু বক আর বক। মনে হবে সাদা চাদরের সামিয়ানা। বিচিত্র ঢঙ্গে আকাশের বুকে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে বেড়ানোর পর জঙ্গী বিমানের স্টাইলে নেমে আসে বাঁশঝাড়, কদম, পিঠালী শিমুলসহ বনজ গাছপালাতে। চরাঞ্চলের সবুজ প্রকৃতিকে নিবিড় বন্ধনে বেধে ফেলেছে বকগুলো। তাই প্রতিদিন হাজারো মানুষ ছুটে আসছে তাদের দেখার জন্য। মেলোন গ্রামের ওয়াহেদুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে সাবেক ইউপি সদস্য সাইদুর রহমান ও হায়াত আলী বাড়ির পাশের গাছপালাতে অবস্থান নেয়ার কারণে এলাকাটি এখন বক পাখির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পর থেকেই এসব বক পাখির আনাগোনা শুরু হয়। পাঁচ বছরে এদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে বিশাল আকার নিয়েছে। গ্রামের মানুষ এদের আপন করে নিয়ে পাহারা বসিয়েছে যেন কোন শিকারী বধ করতে না পারে। সবচেয়ে আনন্দের খবর খুবই কাছাকাছি বিজিবির বাখের আলী ক্যাম্পের অবস্থান। তারা এসব বক পাখি রক্ষায় গ্রামবাসীকে সহযোগিতা দিচ্ছে। সকাল সন্ধ্যা হাজার বকের কলকাকলিতে মুখর থাকে মোল্লান গ্রাম।