২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সৌদিয়া ও বিমানের কর্তাদের এক হাত নিলেন বিমানমন্ত্রী

  • হাজীদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা

স্টাফ রিপোর্টার ॥ হাজীদের পরিবহনে সৌদিয়া ও বিমানের চরম গাফিলতি ও ব্যর্থতায় ভীষণ ক্ষুব্ধ বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। মিডিয়ায় এ নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি কতটা সত্যি তা নিজের চোখে দেখতে রবিবার সকালে গিয়ে হাজির হন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। তারপর তিনি যা দেখলেন আর যা বললেন, তাতেও সবাই অবাক। বিমানবন্দরের বেল্ট এরিয়ায় ঢুকতেই তিনি হাজীদের প্রশ্নবাণে জর্জরিত। যতক্ষণ তিনি সেখানে ছিলেনÑ শুধুই শুনেছেন হাজীদের চরম দুর্দশার কথা। কেন এ দুরবস্থা তার সঠিক ব্যাখ্যা বা জবাব দিতে পারেননি উপস্থিত কোন কর্তাই। বাধ্য হয়েই সৌদিয়া, বিমান ও সিভিল এভিয়েশানের উর্ধতন কর্তাদের একহাত নিলেন মন্ত্রী।

ঘটনার এখানেই শেষ নয়, হাজীদের এমন করুণ অবস্থার জন্য বিমান সব দায় চাপায় জেদ্দা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও সৌদি সরকারের হজ ব্যবস্থাপনার ওপর। সে জন্যই প্রতিটি হজ ফ্লাইট কয়েক ঘণ্টা বিলম্ব হচ্ছে। বিমানের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন মোসাদ্দিক আহমেদের এমন ব্যাখ্যায় পাল্টা প্রশ্ন রাখেন মন্ত্রীÑ তাহলে ঢাকায় হাজীদের সেবার দায়দায়িত্ব কার?

এ সময় বিগত কয়েক দিন ধরে লাগেজের জন্য বিমানবন্দরে আটকা পড়ে থাকা হাজীদের ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করানোসহ সার্বিক সেবা প্রদানের কড়া নির্দেশ দেন রাশেদ খান মেনন।

রবিবার সকাল ১০টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভ্যন্তর ঘুরে পদে পদে অব্যবস্থাপনা দেখে একপর্যায়ে আবেগতাড়িত হয়ে হাজী ও সাংবাদিকদের কাছে করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং বলেনÑ সৌদিয়া ও বিমানের শিডিউল বিপর্যয় ও হাজীদের ভোগান্তিতে দায় এড়ানোর কোন সুযোগ নেই। মন্ত্রীর বিমানবন্দর পরিদর্শনের কথা শুনে ভুক্তভোগী হাজীরা তাকে ঘিরে ধরেন। এ সময় তিনি হাজীদের অন্তহীন ভোগান্তির কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং বিমানের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালককে সমস্যাগুলো সমাধানের নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি হাজীদের দ্রুত লাগেজ পাওয়ার ব্যবস্থা করতে এবং প্রয়োজনে বিলম্বিত সময় তাদের হজ ক্যাম্পে কিংবা হোটেলে রাখারও নির্দেশ প্রদান করেন।

এ সময় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব খোরশেদ আলম চৌধুরী, বিমানের ভারপ্রাপ্ত এমডি এম মোসাদ্দেক আহমেদ, সিভিল এভিয়েশানের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম সানাউল হক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শরীফ মোহাম্মদ ফরহাদসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ঘণ্টাব্যাপী এ পরিদর্শনের সময় ২৪ ঘণ্টার বিলম্বিত ফ্লাইটে আসা বিমানের ৪১৯ জনসহ ৯ শতাধিক হাজী ব্যাগেজের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ভোরে অবতরণ করা ফ্লাইটের হাজীরা বেলা ১১টা পর্যন্ত তাদের লাগেজ পাননি। বিক্ষুব্ধ হাজীরা জানান, জেদ্দা বিমানবন্দরে তাদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হয়েছে। সকালে বিমানের বিজি-২০২৪ ফ্লাইটে এসে বিমানবন্দরে লাগেজের জন্য অপেক্ষা করছিলেন উত্তরার আব্দুল্লাহ আল-মামুন। দায়িত্বশীল বিমানমন্ত্রীকে নাগালে পেয়ে যারপরনাই বললেন ভুক্তভোগী মামুন। মন্ত্রী মেননকে তিনি বলেন, জেদ্দা বিমানবন্দরে এনে আমাদের ২৪ ঘণ্টা না খাইয়ে ফেলে রাখা হয়েছে। বিমানের কেউ খবর নেয়নি। জেদ্দা এয়ারপোর্টে বাংলদেশের হজ মিশন, এমনকি আমার মোয়াল্লেম আবুল কালাম আজাদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। ভোগান্তির সময় তিনি মোবাইল ফোনটি বন্ধ করে রেখেছেন।

জয়নাল আবেদিন ও তার স্ত্রী হাসিনা বেগম বিজি-২০১৮ ফ্লাইটে জেদ্দা থেকে এসেছেন ১ অক্টোবর। ৪ দিনেও তার লাগেজের হদিস দিতে পারেনি বিমান কর্তৃপক্ষ। বিমানবন্দরে ৪ দিন ধরে হন্যে হয়ে ঘুরছেন তিনি। জয়নাল আবেদিন এ বিষয়ে সরাসরি মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে মন্ত্রী বিমানের ভারপ্রাপ্ত এমডি মোসাদ্দেককে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলেন।

চাঁদপুরের বাসিন্দা আওলাদ হোসেন পাটোয়ারী। জেদ্দা থেকে এসেছেন বিজি-৪০২৪ ফ্লাইটে। হাজী আওলাদ হোসেন পাটোয়ারীর ভাষ্য, বিমানের সেবা খুবই নিম্নমানের। বোর্ডিং কার্ড প্রদান থেকে লাগেজ ডেলিভারি সর্বত্র ছিল বিড়ম্বনা। হাজীদের এমন অন্তহীন অভিযোগ ও তোপের মুখে রাশেদ খান মেনন কারণ ব্যাখ্যা করতে বলেন বিমানের ভারপ্রাপ্ত এমডিকে। এ সময় বিমানের ভারপ্রাপ্ত এমডি এএম মোসাদ্দেক আহমেদ বলেন, আমরা আল্লার মেহমান হাজী সাহেবানদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আন্তরিকভাবে সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে আহসান হোসেন কাজী নামে একজন জিএমকে সমস্যা সমাধানে জরুরীভিত্তিতে পাঠানো হয়েছে। কাজীকে পাঠানোর পরও কেন পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে নাÑ জানতে চাইলে বিমানের কোন কর্মকর্তা সদুত্তর দিতে পারেননি।

একপর্যায়ে মন্ত্রী ছুটে যান বিমানের লস্ট এ্যান্ড ফাউন্ড সেকশানের গোডাউনে। গিয়ে দেখেন ভেতরের পরিস্থিতি সেই আগের মতোইÑ বিড়ালের দৌড়াদৌড়ি, তেলাপোকার ছুটোছুটি, ওপরে মাকড়সার জালে ছেয়ে যাওয়া সিলিং, কয়েক স্থানে আবার সেটা ভাঙ্গাও।

এমন চিত্র দেখে মন্ত্রী ও সচিব চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে একযোগে বলতে থাকেনÑ গত এক বছর আগেও এ রুমের এমন অবস্থা দেখে জিএম আতিক সোবহানকে নির্দেশ দিয়েছিলাম এটা ঠিক করতে। কেন করা হয়নি, জানাতে হবে। এভাবে চলতে পারে না।

সবশেষে মন্ত্রী যান সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের আটকে পড়ে থাকা লাগেজের স্তূপ দেখতে। সেখানে গিয়েও তিনি লাগেজ খুঁজতে আসা যাত্রীদের তোপের মুখে পড়েন। এক যাত্রীর প্রশ্নÑ তিন সপ্তাহ ধরে লাগেজ খুঁজে চলেছি। সৌদিয়ার কেউ আমাদের এতটুকু সাহায্য করছে না। কবে লাগেজ আসবে সেটাও বলতে পারছে না।

মন্ত্রী এটা দেখে ভীষণ চটেন সৌদিয়ার ওপর। তিনি সৌদিয়ার স্টেশন ম্যানেজার সাদিয়ার কাছে জানতে চানÑ কবে নাগাদ পরিস্থিতির উন্নতি হবে। জবাবে সাদিয়া বলেন, আরও সপ্তাহখানেক লাগবে। এতেও সন্তুষ্ট হতে পারেননি রাশেদ খান মেনন। বলেন, এ কথা তো সাতদিন আগেও বলেছেন।

এ সময় মন্ত্রী ও সচিব সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, সৌদিয়ার কত বড় ঔদ্ধত্য। হজযাত্রী পরিবহনের ব্যাপারে বার বার মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে ডাকা হলেও সৌদিয়ার লোক উপস্থিত হয়নি। তারা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশও উপেক্ষা করছে, কাউকে মানছে না। সৌদিয়ার লাগেজের ব্যাপারে জানতে চাইলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শরীফ মোহাম্মদ ফরহাদ জনকণ্ঠকে বলেন, আগে লাগেজ ছিল ৭ হাজারের মতো। এখন সব ডেলিভারি দিতে দিতে সেটা কমে এসেছে। আর হাজার দেড়েক লাগেজ আছে। সেটাও ডেলিভারি হয়ে যাবে। তারপরও যদি গাফিলতি দেখা যায় তাহলে জরিমানা করা হবে।