২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন ॥ ‘আমার স্মৃতিকথা’

  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

জন্ম ও পারিবারিক কথা

(৪ অক্টোবরের পর)

আমার দাদা ১৮৯৯ সালে স্কুলের শিক্ষকতা ছেড়ে সাব-ডেপুটি কালেক্টর হন এবং ১৯০৬ সালে ডেপুটি কালেক্টর পদে পদোন্নতি পান। ১৯২৮ সালে তার অবসরে যাওয়ার কথা ছিল। তবে সে সময় তিনি সুনামগঞ্জ মহকুমা হাকিম ছিলেন এবং সেখানে তখন মহাবন্যা দেখা দেয়। বন্যার সময় কর্মদক্ষতা প্রদর্শনের সুবাদে তিনি ১৯৩২ সাল পর্যন্ত সেই পদে বহাল থেকে অবশেষে অবসর নেন। তিনি সিলেটের তিনটি মহকুমা সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলবীবাজারে প্রথম মুসলমান মহকুমা হাকিম ছিলেন এবং এই পদে মোট দশ বছর দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিটি দফতরে মুসলমান এলিট গোষ্ঠীর সহায়তায় একটি মসজিদ স্থাপন করেন। ১৯৩৬ সালে তিনি করোনেশন মেডেল পান এবং খান বাহাদুর খেতাব লাভ করেন। তিনি বৃদ্ধ বয়সে ১৯৫৩ সালের ৩ জুন ইন্তেকাল করেন। তার প্রথম কন্যার জন্ম হয় ১৮৯৮ সালের ২৮ জুলাই এবং তার পরে আমার আব্বার জন্ম হয় ১৯০০ সালের ২ জুন। কাকতালীয়ভাবে আমার দুই বড় আব্বার নাম আবদুল কাদের। দাদার পিতা এবং শ্বশুর দু’জনেরই এই নাম ছিল। আমার দাদাকে আমি অন্ততপক্ষে চৌদ্দটি বছর বেশ ভালভাবেই দেখেছি। আমার বয়স যখন ছয়/সাত তখন থেকেই তার চরিত্র এবং আচরণ বুঝতে শুরু করি। তিনি কড়া মেজাজের ছিলেন এবং একটি রুটিন অনুযায়ী জীবনযাপন করতেন। আমার যখন থেকে জ্ঞান হয়েছে তখন থেকেই তাকে প্রায় রোজ সকালে একবার দেখতাম। তিনি প্রায় প্রতিদিনই আমাদের বাড়িতে সকালবেলা আসতেন এবং অনেকক্ষণ বসতেন। একটা রিকশা করে প্রায় এক মাইল রাস্তা পেরিয়ে আমাদের বাড়িতে আসতেন। আমাদের বাড়িতে এসে তার কাজ ছিল তার মামলা-মোকদ্দমার তদ্বির করা। প্রতিদিনই কিছুক্ষণ আমাদের বাড়িতে বসে তিনি তার নির্দিষ্ট রিকশায় চড়ে বন্দর বাজারে যেতেন এবং তার একজন কর্মচারী চাঁদ মিয়া তখন বিভিন্ন বাড়ি বা দোকান থেকে খাজনা আদায় করতো। তিনি একখানে (তার নির্দিষ্ট ভাড়াটিয়া এক সোনারের দোকানে নির্দিষ্ট একটি চেয়ারে) বসে তার কর্মচারীকে দিয়ে নানা কাজ সম্পাদন করাতেন। সর্বশেষে তার কর্মচারী যখন দৈনিক কাঁচা বাজার সম্পন্ন করতো তখন তিনি বাড়ির দিকে রওনা হতেন। এই কর্মচারী আজীবন আমার দাদার সেবা করে এবং তার মৃত্যুর পর দাদাবাড়িকে সচল রাখে। তার মেয়ে সালেহা সমাজে একজন প্রতিষ্ঠিত জন হিসেবে শাহপরাণ (র.) মাজারের সন্নিকটে বহর মৌজায় বসবাস করতো। এই বহর মৌজায় এক সময় মোটামুটিভাবে আমার দাদার রায়ত বা বর্গাদাররা চাষবাস করতো। বন্দর বাজারে রঙমহল, সিনেমা হল থেকে শুরু করে মশরফিয়া হোটেল পর্যন্ত সমুদয় এলাকা ও দোকানপাটের জমিদার ছিলেন আমার দাদা। এর খানিকটা তার উত্তরাধিকারীরা নানা সময়ে বিক্রি করেন এবং বাকিটা জমিদারি উচ্ছেদের সময় সরকারের দখলে চলে যায়। যেসব এলাকা জমি খাজনায় কারো কাছে ভাড়া ছিল সেগুলোর মালিকানা সরকারে বর্তে, শুধু ভাড়াটিয়া ঘরবাড়ি জমিদারের কর্তৃত্বে থাকে।

সিলেট শহর এবং শহরতলীতে পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি ছাড়াও তার বিস্তর জমিজমা ছিল এবং এসবের দেখাশোনা করতেন তার ভাই রশিদ সাহেব এবং বন্ধু ও পরামর্শক বাবু চুড়ামনি। ১৯৪৯ সালে আমি আমার দাদার আয়কর রিটার্ন প্রণয়নের দায়িত্ব পাই। আমার আব্বা এই কাজে আমাকে সাহায্য করেন। তখন আমি জানলাম যে, আমার দাদা তখন পেনশন পেতেন বছরে প্রায় ৫০০০ টাকা আর তার ভাড়ায় দেয়া ঘরবাড়ি, দোকানপাট ইত্যাদি এবং জমিজমা থেকে আয় ছিল আরো ৫০০০ টাকা। তিনি লাখপতি হিসেবে সমাজে পরিচিত ছিলেন। এর বড় অংশ ১৯৫৪-৫৫ সালে জমিদারি উচ্ছেদের ফলে সরকারের দখলে চলে যায়। মনে রাখা ভাল যে, জমিদারি বিলোপ আইন (ঝঃধঃব অপয়ঁরংরঃরড়হ অপঃ) যদিও ১৯৫১ সালে পূর্ব বাংলা আইন পরিষদে পাস হয়, এর কার্যকারিতা জনবলের অভাবে পরবর্তী তিন-চার বছরেও শুরু হয়নি। তাই বলা যেতে পারে যে, তিনি তার জীবিতাবস্থায় ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত উচ্চবিত্ত পেনশনপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও জমিদার হিসেবেই জীবনযাপন করেন। তবে তার শ্রেষ্ঠতম গৌরবের বিষয় ছিল যে, তিনি তার চার ছেলে ও এক মেয়েকে উচ্চশিক্ষা দিয়ে (সকলেই ¯œাতক বা তদূর্ধ্ব পর্যন্ত পড়াশোনা করেন) মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত দেখে যেতে সক্ষম হন। তার মেয়ে সাহেরা খাতুন এবং পাবলিক প্রসিকিউটর আমজাদ আলীর মেয়ে খায়রুননেসা খানম ১৯৩৮ সালে সিলেটের প্রথম মুসলিম মহিলা গ্র্যাজুয়েট হন। সিলেটের প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট ছিলেন ১৯০৩ সালে আখালির সারদা দাস। সেই পরিবার পরবর্তীতে বিলেতে বসবাস করেন। আমি ১৯৫১ সালে সারা প্রদেশে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে (ইন্টারমিডিয়েট আর্টসে) প্রথম স্থান অধিকার করায় আমার দাদা মহাখুশি হন এবং আমাকে তার ছাত্রজীবনের নোট দেখতে আহ্বান করেন।

এই পুরো সময়টিতে তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা হিসেবেই জীবনযাপন করেন এবং দেশ শাসনের সঙ্গে তার সংযুক্তিটি সহজেই বোঝা যেত। তিনি কাপড়-চোপড়ে বেশ পরিপাটি ছিলেন। বাড়িতে তিনি লুঙ্গি পরলেও অন্দরমহলের চৌহদ্দির বাইরে গেলেই শার্ট, প্যান্ট, কোট চাপাতেন। তার মেজাজ বেশ কড়া বলেই মনে হতো এবং তার সঙ্গে আড্ডা মোটেই জমতো না। আমার বুবু অবশ্য অন্য কথা বলেন। তিনি ছিলেন দাদার প্রথম নাতনি (তার জন্মের তের বছর আগে আমাদের এক ফুপাতো বোন জন্ম নিয়েছিলেন এবং তার এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি এবং তার মা পরলোকগমন করেন)। এছাড়া বুবু তার জীবনের প্রথম চারটি বছর দাদাবাড়িতেই কাটান। দাদা প্রতিদিনই সকাল বেলা একবার আমাদের বাড়িতে আসতেন এবং অনেকক্ষণ বসে তার বিভিন্ন কাজকর্ম সম্পাদন করতেন। তার একটি নিয়ম ছিল যে, প্রতিদিন তিনি আমাদের ভাইবোনদের একটি করে পয়সা দিতেন। তার আর একটি বিষয় ছিল যে, পরিচ্ছন্নতা নিয়ে তাকে বাতিকগ্রস্ত বলা চলে।

তার অবসর জীবন একটি নিয়মিত রুটিন মতো চলতো। তার শহর ভ্রমণ মোটামুটিভাবে দুপুর বেলায় শেষ হয়ে যেত। তিনি বাড়ি ফিরে নিয়মিতভাবে গোসল করে খাওয়া-দাওয়া সম্পন্ন করতেন। তিনি সাদা চাউলের ভাত খেতেন। যদিও বাড়িতে সবাই লাল চাউল ব্যবহার করতেন। আর যে চাউল তার বর্গাদাররা সরবরাহ করতো সেটাও ছিল লাল। তিনি দুধভাতের খুব পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। আমি কখনও খাওয়ার সময় দাদাবাড়িতে থাকলে তার খাবারটি আমি খেতাম এবং তা নিয়ে দিদি প্রায়ই নানা মন্তব্য করতেন। তার বিভিন্ন মন্তব্য ছিল এই রকমের : “এই যে, ইনার জন্যে তো সাদা ভাত লাগবে”, “তাকে তো আবার দুধভাত দিতে হবে” অথবা “এই তো ছোট সাহেবের খাবার ঠিক করতে হবে”। অপরাহ্নে আমার দাদা দিবানিদ্রা যেতেন। আবার বিকেলে কাপড়-চোপড় পরে তার অফিস কামরায় বসতেন অথবা বারান্দায় একটি ইজি চেয়ারে আশ্রয় নিতেন। আত্মীয়-স্বজন বা কার্যোপলক্ষে কেউ এলে তাদের সঙ্গে গল্প করতেন হয় তার অফিস কামরায় অথবা বারান্দায়। তিনজন ধার্মিক ব্যক্তি যারা বিভিন্ন মসজিদে ইমাম ছিলেন তারা প্রায়ই তার সঙ্গে মিলিত হতেন। বিভিন্ন সময় দাদা নিয়মিতভাবে মিলাদের আয়োজন করতেন এবং এসব ইমাম সেখানে তা পরিচালনা করতেন। দাদা ১৯৪৮ সালে একটি অসিয়তনামা নিবন্ধন করেন। সেখানে এই ইমামদের জন্য তিনি তাদের মাসোহারা নির্ধারণ করে দেন। এই অসিয়তনামা অত্যন্ত প্রগতিশীল মনের একটি মানুষের পরিচয় দেয়। তিনি স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি তার চার সন্তানের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দেন। তিনি সেখানে বলেন, তার সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ তিনি যে কোনভাবে ব্যবহার করতে পারেন। বাকি সম্পত্তিতে তার পরিবারের অধিকার আছে। তিনি বলেন, তিনি চান তার একমাত্র মেয়ে যাকে তিনি ঠিক অন্য ছেলেমেয়েদের মতো পড়াশোনা করিয়েছেন তিনি যেন তার ভাইদের সঙ্গে সমান অংশ পেতে পারেন। এই অসিয়তনামায় তিনি তার প্রত্যেক সন্তানের সম্মতিসূচক দস্তখতও নিয়ে নেন। ঈদুল আযহা উপলক্ষে ঈদের দিন বা তার পরের দিন রাতে তিনি আত্মীয়-স্বজন এবং ঘনিষ্ঠজনের জন্য একটি নৈশভোজের আয়োজন করতেন।

তার সম্বন্ধে একটি কাহিনী না বললেই নয়। তিনি দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে মোটেই যুক্ত ছিলেন না; কিন্তু তাতে নিশ্চয়ই সায় দিতেন। কারণ তার সায় না থাকলে আমার আব্বা এই বিষয়ে নেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারতেন না। ১৯৪৯ সালে ব্রিটিশ পাউন্ডের অবমূল্যায়ন হয় এবং তার সঙ্গে সব ব্রিটিশ উপনিবেশ ও অন্যান্য দেশে টাকার অবমূল্যায়ন হয়। শুধুমাত্র পাকিস্তান তাদের রুপির অবমূল্যায়ন করলো না। এতে পেনশনারদের কিছুটা সমস্যা দেখা দেয়। তাদের পেনশন প্রায় ৯ শতাংশ কমে যায়। আমার দাদা এই হ্রাসপ্রাপ্ত পেনশনে খুবই ক্ষুব্ধ হন এবং তাদের পুরো পেনশন পুনর্বহাল করার উদ্দেশ্যে একটি দুই পৃষ্ঠার মেমো তৈরি করেন। এই মেমো ছাপিয়ে তিনি সব উচ্চমহলে পাঠিয়ে দেন। ঠিক এই সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান সিলেট ভ্রমণে আসেন এবং তার ভ্রমণসূচি ও সিলেটে তার কার্যসূচি প্রণয়নে আমার আব্বা প্রধান ভূমিকা পালন করেন। তিনি তখন তার ছেলেকে হুকুম দেন যে, লিয়াকত আলীর সঙ্গে তার পেনশন বিষয়ক আলোচনার জন্য একটি মোলাকাত করে দিতে হবে। আব্বা এই বিষয় নিয়ে সিলেটের তদানীন্তন জেলা প্রশাসক এম খুরশিদের সঙ্গে আলোচনা করেন। খুরশিদ সাহেবের দাদার সঙ্গে বেশ ভাল পরিচয় ছিল। তিনি তখন আব্বাকে বললেন, তিনি এই বিষয়টি সুরাহা করবেন। খুরশিদ সাহেব যখন দাদাকে নিশ্চিত করলেন, তার ফরিয়াদটি তিনি নিজেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করবেন এবং তুলে ধরবেন তখনই আব্বার ওপর দাদার চাপাচাপি বন্ধ হলো। চলবে ...