১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পুরাকীর্তি রক্ষায়-

শত শত বছরের ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং শিল্পশৈলীর নিদর্শন নিয়ে গড়ে ওঠা দেশের প্রাচীন নগরী চট্টগ্রাম এবং এর আশপাশের অসংখ্য পুরাকীর্তি, স্থাপত্যনিদর্শন সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। এখনও যেগুলো টিকে আছে সেগুলোর সংরক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে। মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ন ও অবহেলায় চট্টগ্রামের এই ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর আজ এই অবস্থা। কিছুদিন আগে নগরীর পাহাড়ে আবিষ্কৃত ধ্বংসাবশেষ, যা একটি প্রাচীন দুর্গের নিদর্শন ছিল, তাও রক্ষা করা যায়নি। এসব রক্ষায় প্রতœতত্ত্ব বিভাগ, গণপূর্ত বিভাগসহ দায়িত্বশীল কোন সংস্থার উদ্যোগ বা প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়নি। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, চট্টগ্রামে বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমলের কিছু নিদর্শন এখনও টিকে আছে। কিন্তু যথাযথ সংরক্ষণ করা না হলে এ স্মৃতিচিহ্নগুলোও হয়তো একসময় হারিয়ে যাবে। প্রতœসম্পদের মধ্যে কোন জাতি তার আত্মপরিচয় খুঁজে পায়। আমাদের হাজার বছরের ইতিহাসে লুকিয়ে আছে অনেক প্রতœসম্পদ। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এই প্রত্মসম্পদ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সবার এগিয়ে আসা দরকার।

বাংলার মধ্যযুগের ইতিহাসে হোসেনশাহী আমল এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলটি বেশ আলোচিত। এই অঞ্চলের সম্প্রসারণ, ধর্ম, সাহিত্য, শিল্পকলা ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে তাৎপর্যময় অগ্রগতি সাধিত হয় এই আমলে। চট্টগ্রামের সবচেয়ে প্রাচীন স্থাপনার অন্যতম হলো শহরের বদর আউলিয়ার দরগাহ। মাজারটি প্রায় ৭০০ বছরের পুরনো। নগরীর পোস্তার পাড়ে রয়েছে হোসেন শাহের আমলের একটি শিলালিপি। পোস্তার পাড় জামে মসজিদটির দেয়ালে এ শিলালিপিটি বাঁধানো ছিল। মসজিদটি এখন নেই, তবে নতুন আদলে দেয়ালে শিলালিপিটি সংরক্ষণ করা হয়েছে। হাটহাজারীর জোবরা গ্রামের আলাওল মসজিদ, হাটহাজারীর নুসরত শাহ মসজিদ, মিরসরাইয়ের ছুটি খাঁর মসজিদ এ অঞ্চলের সুলতানি আমলের ইতিহাস বহন করছে। ১৬৬৬ সালে নির্মিত আন্দরকিল্লা মসজিদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মোগলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের কাহিনী। এসবের যা অবশিষ্ট এখনও আছে তার সংরক্ষণ করা জরুরী।

দেশ প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনের সম্ভার বলা হলেও এই সম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে আমরা ততটা দায়িত্বশীল নই। স্থানীয় পর্যায়ে দায়িত্বশীলদের অবহেলার কারণে অধিকাংশ প্রতœস্থাপনা ধ্বংসের প্রহর গুনছে। অনেক স্থানে প্রশাসন, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি, ভূমিদস্যুদের ছোবলে হারিয়ে যেতে বসেছে প্রতœসম্পদ সমৃদ্ধ এলাকা। তবে একথাও সত্য যে, কোন কোন স্থানে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান প্রতœসম্পদ রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। অনেক প্রতœস্থাপনা বেসরকারীভাবেও সংরক্ষণ করা হচ্ছে। উয়ারী-বটেশ্বর অথবা বিক্রমপুরের মতো কিছু এলাকায় ব্যক্তি উদ্যোগে খনন অথবা সংরক্ষিত হওয়ার উদাহরণও আছে। তবে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সারাদেশের শহর-বন্দর, গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য প্রতœসম্পদ ও সংশ্লিষ্ট এলাকা রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব। এক্ষেত্রে সরকার ও প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরকে আরও উদ্যোগী হতে হবে। বেসরকারী উদ্যোগগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করেও প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর যৌথভাবে এসব সম্পদ রক্ষা করতে পারে। একই সঙ্গে চট্টগ্রামে হোসেনশাহী আমলের যে প্রত্মসম্পদ হারিয়ে যেতে বসেছে, তার সংরক্ষণের ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া জরুরী। তবে প্রতœসম্পদ রক্ষায় প্রধান ভূমিকা রাখতে পারে স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণ। এ দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রাণ প্রতœসম্পদ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সবাই এগিয়ে আসবেন, এই প্রত্যাশা সবার।