১৮ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিএনপি কি একটি রাজনৈতিক না পারিবারিক প্রতিষ্ঠান?

  • ওয়াহিদ নবি

হাওয়া ভবন হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়ার আগে তারেক রহমান ‘যুবরাজ’ বলে পরিচিত ছিলেন সে কথা অনেকে ভুলে গেছেন। যুবরাজের মা কী নামে পরিচিত হন তা সবাই জানেন। সাবেক সব ভাইস চ্যান্সেলর, জেনারেল আর ব্যারিস্টার যেভাবে তার কাছে বসে ম্যাডাম সম্বোধন করতে থাকেন তাতে করে অমাত্যবর্গদের চিনতে অসুবিধা হয় না। প্রজাবর্গ তো আছেই। তিনি তিনবারের প্রধানমন্ত্রী।

ইদানীং কাগজগুলো লিখছিল যে, বিএনপির দুর্দিন যাচ্ছে। এটা ভুল রাজনীতির স্বাভাবিক পরিণতি। এই দুর্দিন রাজনৈতিক সংগঠন বিএনপির। কিন্তু বেগম জিয়ার সফরসূচী নিয়ে যেসব কথা লেখা হচ্ছিল কাগজগুলোতে তাতে মনে হচ্ছিল যে, বিএনপির সুদিন যাচ্ছিল। এই বিএনপি পারিবারিক বিএনপি। আসলে বিএনপি সব সময় কি পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ছিল একথা মনে জাগছে? সংগঠনটির অতীত ও বর্তমানের দিকে তাকালে এই কথাই মনে হয়।

আগেরবার লন্ডন সফর বাতিল হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল তাঁর ‘বুয়াকে’ ভিসা দেয়া হয়নি। কাগজে লেখা হয়েছিল যে, তার ছেলের বাড়ি তার জন্য ছোট হবে, তাই তিনি হোটেলে উঠবেন। তাঁর সফরসঙ্গী কারা হবেন এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনার অন্ত ছিল না। সব মিলিয়ে হুলস্থূল ব্যাপার। দেশী ও বিদেশী অনেক নেতা-নেত্রী লন্ডনে এসেছেন কিন্তু এমন হুলস্থূল ব্যাপার দেখেছি বলে মনে হয় না। যেন রাজকীয় ব্যাপার!

বলা হয়েছে, তিনি কয়েকটি কারণে লন্ডনে আসছেন। আগে বলা হয়েছিল যে, তিনি চিকিৎসার জন্য আসছেন। এর আগে তিনি অন্যদেশে গেছেন চিকিৎসার জন্য। যাই হোক, এটা তার ইচ্ছা। টাকা থাকলে একজন যে দেশে ইচ্ছা যেতে পারেন। এ নিয়ে অন্যের বলবার কী থাকতে পারে? দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল যে, তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করবেন। ভাল কথা। তৃতীয় কারণ হিসেবে রাজনীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একে দুই ভাগে ভাগ করেছেন অনেকে। (ক) বিএনপি পুনর্গঠনের লক্ষ্যে তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা। (খ) বিজেপির সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন। আরেকটি সম্ভাব্য কারণের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, আর সেটি হচ্ছে (গ?) বিদেশী নেতাদের কাছে দেনদরবার করা।

একজন ছাড়া বিএনপির সব নেতাকর্মী বাংলাদেশেই থাকেন। অবশ্য প্রবাসীদের কথা এখানে ধরছি না। স্থায়ী কমিটিসহ অনেক কমিটি আছে দলটির বাংলাদেশে। অথচ দলটির পুনর্বিন্যাস হবে লন্ডনে। আন্দোলন কিভাবে করবে দলটি তার সিদ্ধান্ত নেয়া হবে লন্ডনে। কেন হবে লন্ডনে? কেননা তারেক রহমান থাকেন সেখানে। তিনি দলের সহসভাপতি। প্রশ্ন হচ্ছে- এটিই কি তার আসল পরিচয়? তিনি কি সত্যিকারের নির্বাচিত সহসভাপতি? যেভাবে জাঁকজমকের সঙ্গে তার অভিষেক অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেটা কি সঠিক দলীয় নির্বাচনের পরে? হাওয়া ভবন, তার অমাত্যবর্গ ও তাদের খ্যাতি এসব কি দলের জন্য কল্যাণকর? আসল কথা হচ্ছেÑ তারেক রহমান হচ্ছেন বেগম জিয়ার সন্তান। তার পরামর্শই শুধু বেগম জিয়া চান এবং সেই পরামর্শেই বেগম জিয়া চলবেন। কাজেই ধরে নিলে ভুল হবে না যে, বিএনপি দলটি একটি পারিবারিক প্রতিষ্ঠান।

বেগম জিয়ার সামনে কয়েকটি সমস্যা রয়েছে। এর একটি হচ্ছে তার স্বাস্থ্য। অন্যের সাহায্য ছাড়া তিনি ভালভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। চোখের সমস্যা, পায়ের সমস্যা তো রয়েছেই। পত্রিকায় বেরিয়েছিল যে, তিনি সৌদি আরবে অঙ্কলজিস্টকে দেখিয়েছেন। এ রকম স্বাস্থ্য নিয়ে তার একার পক্ষে দলটি পরিচালনা করা সম্ভব কি? এরপর রয়েছে বিভিন্ন মামলা। মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে তিনি রাজনৈতিকভাবে মহাসমস্যায় পড়বেন। তার দল মহাসমস্যায় পড়বে। তিনি বলেছেন যে, বিচার বিভাগ নিরপেক্ষ নয়। যদি তিনি তাই বিশ্বাস করেন তবে দলের অন্য একজন দলপতি নির্বাচন করা প্রয়োজন। তারেক জিয়া দেশে ফিরে বাস্তবতার সম্মুখীন হবেন এমন কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। পত্রিকায় দেখা গিয়েছিল যে, তার পুত্রবধূ নাকি দেশে ফিরে দলটির হাল ধরবেন। যদি এই সংবাদ সত্য হয় তবে এটা ভাবা অসত্য হবে না যে, বিএনপি একটি পারিবারিক প্রতিষ্ঠান। তার পুত্রবধূর কোন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নেই। শুধু জিয়া পরিবারের বলেই তাঁকে দলটির নেতৃত্ব নিতে হবে। জিয়া পরিবারের সদস্য বা সদস্যা না হলে দলের নেতা বা নেত্রী হওয়া যাবে না তা তিনি যতই উপযুক্ত হন না কেন। এটি কি কোন রাজনৈতিক দলের বিশেষত্ব?

অবশ্য বেগম জিয়ার নিজেরও কোন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল না, যখন তিনি দলের নেত্রী হন। এই হচ্ছে ইতিহাস। ইতিহাসের অন্যান্য অধ্যায়ের দিকে একটু তাকালে দেখা যাবে যে, দলটি আসলেই একটি পারিবারিক প্রতিষ্ঠান। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের পর ক্রমে ক্রমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমানের ভূমিকা সম্বন্ধে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য রাখেন তার অনুসারীরা। তাদের বক্তব্যের সারকথা হচ্ছে- আওয়ামী লীগ খারাপ, বঙ্গবন্ধু খারাপ। কাজেই হত্যাকাণ্ড খারাপ নয়। কিন্তু জিয়াউর রহমান এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। যদিও খুনীরা তার সঙ্গে আলোচনা করেছিল এবং তিনি সরকারের কাছ থেকে সেটা গোপন করেছিলেন। তিনি খুনীদের বিচার বন্ধ করেছিলেন কেন এবং তাদের সরকারী চাকরি দিয়েছিলেন কেন- এ প্রশ্নের উত্তর তার অনুসারীরা কোনদিন দেননি।

যাই হোক, সেনাকর্তারা যা করে থাকেন জিয়াউর রহমানও তাই করলেন। সরকারী ক্ষমতা ও সরকারী অর্থ ব্যবহার করে তিনি দল গঠন করলেন, যার নামকরণ শেষ পর্যন্ত হলো বিএনপি। এই দলে এসে জুটল ‘দলছুট, আদর্শছুট আর পেশাছুট’ ব্যক্তিবর্গ। আর এসে জুটল ’৭১-এর দেশদ্রোহী খুনীরা। বিপরীত আদর্শের ভাসানী ন্যাপ আর মুসলিম লীগ এসে জুটল। এদের সবার মিলনক্ষেত্র জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিমালিকানা, যার নাম বিএনপি। দলের সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হলেন পেশাছুট এমন একজন ব্যক্তি, যার কোন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল না। মনে প্রশ্ন জাগে- এসব ব্যক্তিকে একত্রিত করেছিল কি নেপথ্য থেকে কোন গুপ্ত প্রতিষ্ঠান? আজকের বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দিকে চেয়ে দেখলে কি দেখি? বছরের পর বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত এক অসহায় ব্যক্তি।

শোনা যায় যে, তারেক রহমান নাকি সমুদ্র উপকূলের এক ব্যক্তিকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দেখতে চান। কিন্তু বেগম জিয়ার সফরসঙ্গীদের তালিকায় তিনি নেই। সবার মনে প্রশ্ন, সফরসঙ্গীদের মধ্য থেকে কর্মকর্তারা নিযুক্ত হবেন কি? যদি দলের তৃণমূল ব্যক্তিরা পারিবারিক কর্তৃত্ব মেনে নেয় তবে অবশ্য কারও কিছু বলার থাকে না। তবে একটি প্রশ্ন থেকে যায়। গুজব রটেছে যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বেগম জিয়া দেশে ফিরবেন না। তারেক রহমানের ফেরার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় দলের নেতৃত্ব কে নেবেন? বেগম জিয়ার পুত্রবধূ নেবেন কি? যদি নেন তবে দলের লোকেরা সেটি কিভাবে নেবেন? সেক্ষেত্রে একটা কথা সবাই ধরে নেবেন আর সেটি হচ্ছে যে, বিএনপি একটি পারিবারিক প্রতিষ্ঠান।

লেখক : রয়্যাল কলেজ অব সাইকিয়াট্রিস্টের একজন ফেলো