২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যমালয়!

এক ঘণ্টার মধ্যে একই হাসপাতালে যদি তিনটি শিশুর মৃত্যু হয় তবে ওই হাসপাতালকে চিকিৎসালয় না বলে যমালয় বললে বোধ করি অত্যুক্তি হবে না। এ বেদনাদায়ক ঘটনার আগে চারদিনের মধ্যে একই হাসপাতালে করুণ মৃত্যু ঘটেছে আরও তিন শিশুর। এসব শিশুর মৃত্যু ঘটেছে মূলত অপচিকিৎসা ও চিকিৎসাহীনতায়।

রাজধানীর লালমাটিয়ার এশিয়ান কার্ডিয়াক এ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল নামের এ চিকিৎসালয়টির সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চিকিৎসাসেবা প্রদানের কোন অনুমতি ছিল না বলে প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমে খবর এসেছে। খোদ রাজধানীতে প্রকাশ্যে এমন গুরুতর অনিয়ম ঘটছিল তা কর্তৃপক্ষের নজরে ছিল না এমনটা ভাবা যায় না। ব্যাপারটি গোপনে হচ্ছিল তা নয়। যখন জানাজানি হলো তখন কয়েকটি নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ ঝরে গেল অবহেলায় ও চিকিৎসাহীনতায়। এর দায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বহন তো করবেই, সরকারী দেখভাল করার কর্তৃপক্ষও দায়িত্ব এড়াবে কিভাবে? এ হাসপাতালটিতে অবহেলায় যে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে তা সবই শিশু। এতে বুঝতে বাকি থাকে না শিশু চিকিৎসা ও পরিচর্যার বিশেষ ব্যবস্থা সেখানে থাকার কথা। গণমাধ্যমে যে খবর এসেছে তাতে হাসপাতালটিতে শিশুর নিবিড় পরিচর্যাসহ (এনআইসিইউ) উপযুক্ত চিকিৎসকও পর্যাপ্ত ছিল না। এক ঘণ্টার মধ্যে তিনটি শিশুর মৃত্যুতেই বোঝা যায় এনআইসিইউ ছিল কতটা দুর্বল। সেখানে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছিলেন মাত্র একজন, তাও আবার খ-কালীন। বিশেষায়িত ঘোষণা থাকলেও তা ছিল নামমাত্র ও লোক দেখানো। এমন বাস্তবতা প্রতারণার শামিল।

খোদ রাজধানীর পাশাপাশি সারাদেশেই ব্যাঙের ছাতার মতো যেখানে-সেখানে গড়ে উঠেছে বেসরকারী হাসপাতাল, কার্ডিয়াক ও প্যাথলজি সেন্টারসহ তথাকথিত কিছু চিকিৎসালয়। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। দালালদের মাধ্যমে রোগী ফুসলিয়ে কৌশলে ভর্তি করানো হয়। চিকিৎসার নামে হয় অপচিকিৎসা। ভেজাল, মেয়াদোত্তীর্ণ বা নকল ওষুধের চলে কারবার। অসুস্থ, আহত মানুষ যেখানে সুস্থতা ও আরোগ্য লাভের আশায় যান সে আশা তো পূরণ হয়ই না, বরং ঘটে উল্টোটা। অপচিকিৎসার ফলে অনেকে মৃত্যুমুখে পতিত হন, আত্মীয়স্বজন হন নাজেহাল। ওই চক্র হাতিয়ে নেয় বিশাল অঙ্কের অর্থ। রাজধানীর এশিয়ান কার্ডিয়াক এ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালটিতে যেমন ঘটেছে।

এমন অমানবিক, বেআইনী কর্মকা- দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে ঘটলেও শাস্তির দৃষ্টান্ত কিন্তু খুব একটা উল্লেখযোগ্য নয়। দুয়েকটি ঘটনা প্রকাশ পেলে কিছুদিন গণমাধ্যমে আলোড়ন তোলে। আলোচনা-সমালোচনায় হয় সরগরম। তারপর চলে যায় দৃষ্টির আড়ালে। যথাযথ আইনী প্রক্রিয়ার অভাবে বা আইনের দুর্বল প্রয়োগের ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিবিশেষ পার পেয়ে যায়। আবার আইনের ফাঁক গলিয়েও বেরিয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত আছে। এ অবস্থা শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ায় বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে। যার প্রভাব পড়ে সরাসরি সমাজে। অপরাধ সংঘটনে অপরাধীরা হয় উদ্বুদ্ধ। এ বাস্তবতা দুঃখজনক। এমন অবস্থা কারও কাম্য নয়।

মানুষের জন্য অত্যাবশ্যকীয় চিকিৎসাসেবার মতো মহান পেশাকে যারা বিতর্কিত করছে, চিকিৎসাসেবা প্রত্যাশী মানুষকে যারা প্রতারিত করছে তাদের বিরুদ্ধে শুধু লোক দেখানো আটক বা গ্রেফতার নয়, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরী। যদি প্রচলিত আইনে নিশ্চিত করা সম্ভব না হয় তবে প্রয়োজনে আইন সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়নের ব্যাপারটি সরকার ভেবে দেখতে পারে।