২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এমপি লিটনের বিরুদ্ধে মামলা করে নিরাপত্তাহীনতায় সৌরভের পরিবার

  • শিশুটির চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে স্বজনরা হিমশিম

নিজস্ব সংবাদদাতা, গাইবান্ধা, ৫ অক্টোবর ॥ সুন্দরগঞ্জের এমপি লিটন গুলি ছুঁড়ে অসহায় একটি দরিদ্র শিশুকে আহত করার ঘটনার চারদিন অতিক্রান্ত হলেও এখন পর্যন্ত পুলিশ তাকে গ্রেফতার করছে না। আইনানুযায়ী তাকে গ্রেফতারে বাধা না থাকলেও সরকারী দলের এমপি হিসেবে পুলিশ তাকে গ্রেফতারে যথেষ্ট আন্তরিকতা করছে না বলে এলাকার সর্বস্তরের মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। সুন্দরগঞ্জ থানা পুলিশ বলছে, তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার প্রতি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তার সন্ধান পেলেই যে কোন মুহূর্তে গ্রেফতার করা হবে বলে সুন্দরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ ইসরাইল হোসেন জানান। এদিকে, শিশু সৌরভের চিকিৎসা নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে তার পরিবার। খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছে তারা। ঢাকার ধানম-িতে তার একটি বাড়ি রয়েছে। সেই বাড়িতেই তিনি অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে। লিটন যে লাল রংয়ের পাজেরো জিপ থেকে গুলি চালিয়েছিল সেটি নিয়ে পালিয়ে গেছে। সব সময় ব্যবহৃত একটি কালো দামি জিপ সুন্দরগঞ্জের বাড়ির সামনে রয়েছে। তার দোতলা বাড়ির দরজায় এখন তালা ঝুলছে।

এদিকে সুন্দরগঞ্জ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ তার হটকারি কর্মকা-ে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে এবং দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় অবিলম্বে দল থেকে তার অপসারণ দাবি করেছে। সুন্দরগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি মাসুদুল ইসলাম চঞ্চল, সাংগঠনিক সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম, স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি গোলাম কবির মুকুল, সদস্য গোলাম মর্তুজা টুকু সোমবার এক বিবৃতিতে জানান, এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগে থেকে সুন্দরগঞ্জের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এই এলাকার জামায়াত-শিবিরের যে কোন অপতৎপরতাকে দলীয়ভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। সে সময়গুলোতে আওয়ামী লীগ এই উপজেলায় অত্যন্ত সক্রিয় সংঘবদ্ধ ও শক্তিশালী ছিল। ২০০০ সালে লিটনের রাজনীতিতে প্রবেশের পর থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে জামায়াত-শিবিরের কোন কর্মসূচী প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি। এমপি লিটনের দুর্বল নেতৃত্ব এবং হটকারি কর্মকা-ের কারণেই ২০১৩ সালের গত ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াত-শিবির নারকীয় ঘটনা সংঘটিত করে। যা আওয়ামী লীগ সামান্যতমও প্রতিহত করতে পারেনি।

তারা আরও বলেন, লিটনের স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন বিশেষ করে শ্যালকরা জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তার স্ত্রী সৈয়দা খুরশিদ জাহান স্মৃতিও তাদের গোপনে মদদ দিয়ে আসছেন। এমপি লিটন যে অনিয়ম দুর্নীতিতে লিপ্ত তার অন্যতম প্রমাণ হলো এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর তার ব্যক্তিগত এপিএস হিসেবে স্ত্রী সৈয়দা খুরশিদ জাহান স্মৃতিকে নিয়োগ দেয়া। তিনি এই দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই এমপির পক্ষে দলের সকল কর্মকা-ে নিজের নিয়ন্ত্রণ দাপটের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেন। স্মৃতি তার আপন ৪ ভাই ও জেঠাতো দুই ভাই কাবিখা, কাবিটা, টিআর, এডিবি, জেলা পরিষদের অর্থ বণ্টনসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত করেন। এতে পরিবারতন্ত্র কায়েম হয় এবং সুন্দরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গসংগঠনসমূহের ত্যাগী নেতাকর্মীরা বঞ্চিত হতে শুরু করে। সেই সঙ্গে দলও জনবিচ্ছিন্ন এবং দুর্বল হয়ে পড়ে ও সুন্দরগঞ্জ আওয়ামী লীগ দ্রুত জনপ্রিয়তা হারাতে শুরু করে।

তবে সুন্দরগঞ্জ ছাত্রলীগের সভাপতি সামিউল ইসলাম সামু, সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলামও অবশ্য ভিন্ন মন্তব্য করেছেন। তারা বলেন, জামায়াত অধ্যুষিত এলাকার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় এমপি লিটনের নেতৃত্ব অত্যন্ত অপরিহার্য। তারা আরও বলেন, গুলি ছোঁড়ার ঘটনাটি অসতর্কতাবশত তার গাড়িতে ঢিল ছোঁড়া হলে এবং বেশকিছু লোক গাড়ির দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করলে এমপি গুলি ছোঁড়া শুরু করেন। তখন অসতর্কতাবশত ওই কিশোর সৌরভের পায়ে গুলি লেগে থাকতে পারে। পাশাপাশি তারা দাবি করেন আন্দোলনের নামে যে সমস্ত রাজনৈতিক নেতা এমপির বিরুদ্ধে কথা বলছেন তারা অন্যায়ের সুযোগ পাননি বলে এমপির বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছেন।

এদিকে, সৌরভের পিতা-মাতা সরকারী দলের এমপির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে হুমকি ও চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এদিকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সৌরভের চিকিৎসার খরচসহ তাদের রংপুরে চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। কেননা সৌরভের দরিদ্র পিতা সাজু মিয়া বাসনপত্র গ্রামে গ্রামে ফেরি করে বিক্রি করে অতি কষ্টে সংসার চালাতো। তার দিন আনা দিন খাওয়া অবস্থা। সে উঁচু সুদে নেয়া টাকা এবং আত্মীয়-স্বজনের সাহায্য সহযোগিতায় অতি কষ্টে এতোদিন চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহ করে আসছিল। সৌরভের চিকিৎসা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকায় তার পক্ষে রংপুরে থেকে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে মামলা করায় নানা দিক থেকে তাকে হুমকি দেয়া হচ্ছে। তদুপরি এখন পর্যন্ত এমপি গ্রেফতার না হওয়ায় পরিবারটি এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

গাইবান্ধার-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের ছোঁড়া গুলিতে শুক্রবার ভোরে সৌরভ মিয়া (৯) নামে এক শিশু গুরুতর আহত হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় সৌরভ রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

কলেজের সভাপতির পদ হারালেন এমপি লিটন ॥ নিজস্ব সংবাদদাতা গাজীপুর থেকে জানান, শিশুকে গুলি করে আহত করার ঘটনায় গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন কলেজের সভাপতি পদ থেকে প্রত্যাহার করেছে। সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ, তথ্য ও পরামর্শ দফতরের পরিচালক মোঃ ফয়জুল করিম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধির ৬ নম্বর ধারা মোতাবেক গাইবান্ধার ধুবনী কঞ্চিবাড়ি কলেজ, সুন্দরগঞ্জ মহিলা কলেজ ও সুন্দরগঞ্জ ডি ডব্লিউ কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতির পদ থেকে মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন এমপিকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন উপাচার্য। এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের কপি সংশ্লিষ্ট কলেজে পাঠানো হয়েছে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

তিন কলেজের সভাপতি পদ গেল ॥ সুন্দরগঞ্জে এক অসহায় শিশু সৌরভের দু’পায়ে গুলি করার জের। এ ঘটনায় গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ৩টি কলেজের সভাপতি পদ থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ, তথ্য ও পরামর্শ দফতরের পরিচালক মোঃ ফয়জুল করিম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধির ৬ নম্বর ধারা মোতাবেক গাইবান্ধার ধুবনী কঞ্চিবাড়ী কলেজ, সুন্দরগঞ্জ মহিলা কলেজ ও সুন্দরগঞ্জ ডি ডব্লিউ কলেজের গবর্নিং বডির সভাপতির পদ থেকে মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন এমপিকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের কপি সংশ্লিষ্ট কলেজে পাঠানো হয়েছে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।