২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জঙ্গী হুমকি বানোয়াট ওরা দেশ ধ্বংস করতে চায়

  • মমতাজ লতিফ

কিছুদিন আগে, সম্ভবত খালেদা জিয়ার লন্ডন যাত্রার পরদিন, বিএনপির এক সিনিয়র নেতা বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, ‘শীঘ্রই একটা বড় ঝড় উঠবে, যা কেউ সামাল দিতে পারবে না।’ এদিকে বাতাসে একটা ষড়যন্ত্রের গুজব ছড়িয়ে পড়েছে- শেখ হাসিনার অবর্তমানে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরের বিএনপিপন্থী কোন একটি মধ্যম পর্যায়ের দল ক্যু সংঘটন করতে পারে, যার মাধ্যমে বর্তমান সরকারকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করার চেষ্টা হতে পারে। লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকার নিবন্ধ সূত্রে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের কোন এক প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তা বলেছেন এটি যে অসম্ভব নয় তা তিনি খুব জোরালোভাবে বলেছেন। শোনা যায় শেখ হাসিনাকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। এরই মধ্যে অভাবিতভাবে অস্ট্রেলিয়া দলের বাংলাদেশে জঙ্গী হামলার আশঙ্কায় ক্রিকেট খেলতে না আসার সিদ্ধান্তকে প্রতিষ্ঠিত করতে সেদিনই এক নিরীহ ইতালীয় নাগরিককে হত্যা করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালী, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা বাংলাদেশ ভ্রমণে তাদের দেশের নাগরিকদের ওপর রেড এলার্ট জারি করে! একই সঙ্গে প্রায় আরেকটি ঘটনাও ঘটে। সুইডিস বিজ্ঞানীরা প্রায় দুই-তিন হাজার বছর ধরে ব্যবহৃত পৃথিবীর এক নম্বর খাদ্যশস্য ধান বা চালকে ক্যান্সারের উৎস আর্সেনিকের আধার হিসেবে গণ্য করে এক ফতোয়া জারি করে! আর্সেনিক তো জানতাম পানিতে থাকে। আর্সেনিক যদি উৎপন্ন ফসলের দেহে থাকে তাহলে গম, ভুট্টা, সব সবজি ও সব ফলেই তো থাকার কথা, অন্তত: যুক্তি তো তাই বলে। আর্সেনিক চালেই শুধু থাকবে তা হয় নয়, থাকলে গমেও থাকবে। এদিকে বাংলাদেশ যে ধান বা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে সেটিকে কি কোন মহল প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাচ্ছে? যা হোক, এই অপঘটনাগুলোর উল্টোদিকে আমরা আরও কি কি ইতিবাচক ঘটনা ঘটতে দেখছি সেগুলোও ব্যাখ্যা করছি-

প্রথমত : বিগত চার-পাঁচ বছর যাবত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন কৃষি ও কৃষকবান্ধব মুক্তিযুদ্ধের আদর্শপন্থী জোট সরকার বিপুল জনসংখ্যার দেশকে খাদ্যে অর্থাৎ ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছে, যা একটি অসামান্য কীর্তি হিসেবে দেশে-বিদেশে স্বীকৃতি লাভ করেছে। কৃষি গবেষণায় বাংলাদেশ বিভিন্ন প্রকার ভিটামিনযুক্ত ধান যেমন আবিষ্কার করেছে, তেমনি একর প্রতি বেশি উৎপাদন হয় এমন ধান আবিষ্কার করেছে। এমনকি ধানের সঙ্গে সঙ্গী ফসল চাষও সম্ভব হচ্ছে। শুধু তাই নয়, লবণাক্ততা সহনীয় ধান পর্যন্ত আবিষ্কার করেছে আমাদের নোবেল না পাওয়া মাঠ-ঘাটের কৃষক এবং দেশপ্রেমিক কৃষি বিজ্ঞানীর দল এদেরই একটি নোবেল প্রাইজ পাওয়া উচিত ছিল যারা একটি খাদ্যে পরনির্ভরশীল দেশকে, জাতিকে নিজের খাদ্য নিজে উৎপন্ন করে খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশে পরিণত করেছে। এমন আন্তরিক কৃষিমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী তো বলা চলে পুরো দুনিয়ায় বিরল!

দ্বিতীয়ত : বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বিশ্বসভায় গণ্য হয়েছে, যেখানে বিশ্বনেতৃত্ব শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আস্থাবান হয়েছে। যারা ২০১৪-১৫ সালে বিএনপি নেত্রীর স্বজাতির ওপর পেট্রোলবোমা হামলার বর্বরতার দৃশ্য দেখেছে তারা তাকে আর যাই হোক রাজনৈতিক নেতার স্থান দিতে বর্তমানে আর অতটা আগ্রহী নয়।

তৃতীয়ত : বর্তমান সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এ সরকার তথ্য প্রযুক্তি ক্ষেত্রের উন্নয়নে সাসটেইনেবল তথ্য প্রযুক্তি পুরস্কার ও পরিবেশবান্ধব নীতি কৌশল গ্রহণের ফলে পরিবেশ পুরস্কার চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ লাভ করে বাংলাদেশকে পৃথিবীতে ভিন্ন এক মাত্রায় নিয়ে গেছে, যা অতি অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের শত্রু ও যুদ্ধাপরাধী মিত্রদের ঈর্ষা এবং প্রতিহিংসায় জ্বলে ওঠার একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এতে সন্দেহ নেই।

চতুর্থত : শীঘ্রই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে প্রায় পৌঁছে যাচ্ছে। যে কৃতিত্ব ঐ যুদ্ধাপরাধী দল এবং তার মিত্রদের রোষের শিকার করেছে এই মুক্তিযুদ্ধপন্থী সরকারকে এবং মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে।

পঞ্চমত : এই সরকারের ওপর জনমানুষের আস্থা বিদেশী সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে- দেশের ষাট ভাগের বেশি মানুষ বর্তমান সরকারের ওপর আস্থাশীল, অনেকগুলো ক্ষেত্রে সরকারের ওপর ৮০% পর্যন্ত মানুষ সন্তুষ্ট। এটিও শত্রুপক্ষকে মহারুষ্ট করেছে।

ষষ্ঠত : ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য করতে দু’জন আধুনিক প্রজন্মের মানুষ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন, যারা দেশপ্রেমিক ও আন্তরিক এবং দুর্নীতিবিরোধী। তাদের ইতিবাচক কাজের ফল শীঘ্র পাওয়া যাবে বলে ঢাকাবাসী আশা করছে।

সপ্তমত : ঢাকা, চট্টগ্রামে ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, গণপরিবহন, আন্তঃজেলা নৌ, স্থল, রেল পরিবহন ব্যবস্থায় বর্তমান সরকার আর ৩/৪ বছর ক্ষমতায় থাকলে যে পরিবর্তন আসবে তারপর হয়তো ক্যু করা, পেট্রোলবোমায় মানুষ মেরে বা পশ্চিমা দুনিয়ার কাছে কাঁদুনী গেয়েও যুদ্ধাপরাধী মিত্রদের ক্ষমতা দখল সম্ভব হবে না। তাদের ভয় এখানেই।

এবার মিলিয়ে দেখা যাক, পশ্চিমা দেশগুলো বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে শেখ হাসিনার কঠোর জঙ্গীবিরোধী অবস্থান থাকা সত্ত্বেও কতরকমের বিমাতাসুলভ আচরণ করেছে, করছে-

১. প্রথম তো বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে ‘দুর্নীতির ষড়যন্ত্র’ তত্ত্ব আবিষ্কার করে। এ নিয়ে অর্থ না দেয়া সত্ত্বেও নানারকম ধানাই-পানাই করতে শুরু করলে এক পর্যায়ে শেখ হাসিনা দৃঢ়ভাবে বিশ্বব্যাংকের অর্থ না নেয়ার সম্মানজনক ঘোষণাটি দেন। স্মর্তব্য, আজ পর্যন্ত তারা কানাডার কোর্টে দুর্নীতির কোন প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। তবে, আমাদের জাতির কিছুটা ক্ষতি তারা করেছে। যেমন- জাতি সে সময় নিজ উদ্যোগে পদ্মা সেতু তৈরির জন্য শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই দান-অনুদান দিতে প্রস্তুত হয়েছিল, দাবি করেছিল, অর্থমন্ত্রীর শেষ চেষ্টা গ্রহণের জন্য সে আগ্রহটি স্তিমিত হয়ে পড়ে। আমরা অনেক আগেই এ সেতু নির্মাণের কাজটি শুরু করতে সক্ষম হতাম, যা দেশী-বিদেশী চক্র ইচ্ছাকৃতভাবে সময়ক্ষেপণ করে আমাদের দেরি করে দিয়েছে, যদিও তাদের দুর্নীতির দাবি প্রমাণ করতে পারেনি।

২. যুক্তরাষ্ট্র বহু দেশকে গার্মেন্টসে জিএসপি সুবিধা দিয়েছে। বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক নারী যেভাবে সব ধরনের অর্থনৈতিক ও জীবিকার ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করছে, শুধু সেই বিবেচনায়ই এটি বাংলাদেশ পাবার কথা। তবে, এক্ষেত্রে তারেকের বা খালেদার পক্ষে বড় বড় দেশী অর্থনীতিবিদ এবং পশ্চিমা খালেদা-তারেকপন্থী লবিস্টদের জোর লবিতে পদ্মা সেতুর মতো জিএসপি না দেয়ার ঘটনাটি ঘটেছে বলেই মনে করার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে।

৩. এগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরকে এক নম্বরে উঠে আসা বন্ধ করতে তৎপর দেশী-বিদেশী শ্রমিক স্বার্থ দেখার সংস্থা, আইএসআই ইত্যাদির সঙ্গে দেশীয় লবিস্ট আছে।

৪. সাম্প্রতিক জঙ্গী হুমকি সম্পর্কে প্রশ্ন উঠেছে। তারেক-খালেদার দ্বারা নিয়োজিত লবিস্ট অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ইত্যাদি দেশের কোন অস্তিত্বহীন সংস্থা বা বানোয়াট নামসর্বস্ব সংস্থা কি উপমহাদেশে পশ্চিমা স্বার্থের ওপর জঙ্গী হামলার হুমকিটি দিয়েছে? নতুবা ক্রিকেট খেলা শুরু হবার মাত্র দু’দিন আগে কেন অস্ট্রেলিয়া এ হুমকির কথা জানাল? তারাও কি তারেক-খালেদার পাতা ফাঁদে অজান্তে বা জেনে পা দিল? ভারত ও বাংলাদেশের আইটি বিশেষজ্ঞদের অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের কাছে প্রেরিত এই হুমকির উৎস, বক্তব্য, হুমকিদাতার পরিচয় উদ্ঘাটনে এখনই কাজ শুরু করা উচিত। কেননা, এই হুমকিগুলো খুব সম্ভব বানোয়াট। সেজন্য এর প্রকৃত ইন্ধনদাতার নাম ও পরিচয় উদ্ঘাটন জরুরী। জানা দরকার সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করছে কারা? কেন এসব জঙ্গী হামলার হুমকি একযোগে এসব দেশে এসেছে ঠিক খালেদার লন্ডন পৌঁছার পরপরই? খাগড়াগড় ঘটনার পর থেকে র‌্যাব প্রায় প্রতিদিন জেএমবি, হিজবুত, শিবির-জামায়াত জঙ্গী গ্রেফতার করছে। তাহলে জঙ্গী হুমকিটি হঠাৎ খালেদার লন্ডন সফরের সময় হলো কেন? সেটি তড়িঘড়ি করে করতে হয়েছে অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ খেলা বন্ধ করতে, তাই নয় কি? এ ঘটনার সঙ্গে ২০০৪-এর ২১ আগস্ট গ্রেনেট হামলা নিয়ে এফবিআই, বাংলা ভাইদের নিয়ে তৎকালীন পশ্চিমা কর্মকর্তা এবং পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাদের, কানাডার তদন্ত দলের কর্মতৎপরতার অদ্ভুত ও আশ্চর্যজনক আচরণের অবিশ্বাস্য মিল কেন দেখা যাচ্ছে? এ প্রশ্ন বাঙালী জনগণের অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সরকারের প্রতি।

তারেক দেখেছে বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীরা ক্রিকেট পাগল, আইটিতেও খুবই আগ্রহী। সুতরাং শেখ হাসিনার ‘জঙ্গীদের প্রতি জিরো টলারেন্স’কে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য ‘জঙ্গী হুমকি’ তৈরি করে কয়েকটি প্রধান পশ্চিমা দেশের সরকারকে ভীতসন্ত্রস্ত করা আইটি দিয়েই সহজ-এতো তার জানা কথা। অন্যদিকে, ক্রিকেট পাগল তরুণ-তরুণীরা খেলা বন্ধ হওয়ায় যদি শেখ হাসিনার প্রতি বিরূপ হয় তো একটি বড় খেলায় তারেকের জেতা হলো! আমার গভীর সন্দেহÑ এই জঙ্গী হুমকি, নিরীহ ইতালীয় নাগরিক হত্যাকারী হিসেবে আইএসের দাবি সবই ভুয়া কোন আইডি ব্যবহার করে করা হয়েছে। সেজন্য ভারত-বাংলাদেশের আইটি বিশেষজ্ঞরা এগুলোর উৎস অনুসন্ধান করুক, তাহলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। তাছাড়া, বিশ্ব ক্রিকেট আসরও বন্ধ করতে হবে, সেজন্য বাংলাদেশকে পাকিস্তানের মতো জঙ্গীরাষ্ট্র প্রমাণও তো করতে হবে!

জনগণ, তরুণ-তরুণীদের খাদের কিনারে নেবার কাজ ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত হয়েছে। বিডিআর বিদ্রোহের মাধ্যমে চেষ্টা করা হয়েছে। হেফাজতে ইসলামকে দিয়ে খালেদা-তারেক-জামায়াত ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ঢাকা পতনের একবার প্রাণপণ চেষ্টা করেছে। এরপর পেট্রোলবোমায় দগ্ধ করে গরিব স্বজাতিকে পুড়িয়ে মেরেও দেশকে খাদের কিনারে আনতে চেষ্টা করেছে খালেদা-তারেক, যুদ্ধাপরাধী জামায়াত-শিবির, জঙ্গী দল। সেই বাংলাদেশকে ধরে রেখেছে মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের দলের জোট ও নেত্রী শেখ হাসিনা এবং মুক্তিযুদ্ধপন্থী জনগণ। এবার মুক্তিযুদ্ধের শত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে যথার্থ হাতিয়ার ব্যবহার করতে হবে। গত কদিন আগে রংপুরে একজন জাপানীকে হত্যা করা হয়েছে। জাপান- চীন বাংলাদেশের বড় বন্ধু। জাপানের বিনিয়োগের জন্য কয়েকশত একরের জমি ইপিজেড হিসেবে নির্ধারণ করেছে সরকার। তাছাড়া অনেক পণ্য শুঙ্কমুক্ত আমদানির পরিমাণ বাড়াতে চলেছে জাপান। তার খেসারত দিতে কি এই জাপানীকে খুন করা হলো? শেখ হাসিনার বিদেশী বন্ধুর সংখ্যা কমাতে কি ওরা এবার বিদেশী ব্যক্তি হত্যা করতে শুরু করল? গোয়েন্দা, পুলিশ, র‌্যাব, আর্মি- সব বাহিনী এবং জনগণকে সতর্ক হতে হবে। সত্যিই, আবার একটি ‘ঝড়’ এলো বোধহয়!

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক