১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পরিবেশ সঙ্কট ॥ শৃঙ্খলে পুঁজিবাদ

  • মিলু শামস

মাটি খুঁড়ে যক্ষ্মপুরির শ্রমিকদের সংগ্রহ করা সোনাকে রক্তকরবীর নন্দিনীর মনে হয়েছে, ‘অনেক যুগের মরা ধন, পৃথিবী তাকে কবর দিয়ে রেখেছিল।’ শুনে অধ্যাপক বলেছেন, ‘আমরা সেই মরা ধনের শব সাধনা করি, তার প্রেতকে বশ করতে চাই। সোনার তালের তাল-বেতালকে বাঁধতে পারলে পৃথিবীকে পাব মুঠোর মধ্যে।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘রক্তকরবী’ লিখেছিলেন উনিশ শ’ চব্বিশ সালে। আজকাল অনেকে তার এ লেখার পরিবেশ সংবেদনশীল বয়ান উপস্থাপন করছেন। বলতে চাচ্ছেন দূরদর্শিতা দিয়ে তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন প্রায় এক শ’ বছর পরের পৃথিবীর পরিবেশ সঙ্কটের স্বরূপ। আজ পৃথিবীর বায়ুম-লের উষ্ণতা বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে। সমুদ্র পিঠের উচ্চতা বাড়ায় ঘন ঘন বন্যা ও খরা হচ্ছে। মানুষের সৃষ্ট পরিবেশ দূষণের কারণেই প্রকৃতি যে একদিন বিরূপ হয়ে উঠবে সে কথা এক শ’ বছর আগেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। এ ব্যাখ্যায় অতিরঞ্জন এবং আদিখ্যেতা কিছুটা হলেও নিশ্চয়ই আছে। তারপরও নাটকের পাত্রপাত্রীর এক দুটো সংলাপ চমকে দেয়। যেমন নন্দিনী রাজাকে বলছে- ‘আচ্ছা রাজা, বলো তো, পৃথিবীর এই মরা ধন দিনরাত নাড়াচাড়া করতে তোমার ভয় হয় না?’ কোন্ ভয়ের কথা বলছে রাজা জানতে চাইলে নন্দিনী বলে- ‘পৃথিবী আপনার প্রাণের জিনিস আপনি খুশি হয়ে দেয়। কিন্তু যখন তার বুক চিরে মরা হাড়গুলোকে ঐশ্বর্য বলে ছিনিয়ে নিয়ে আসো তখন অন্ধকার থেকে একটা কানা রাক্ষসের অভিসম্পাত নিয়ে আসো।’ অবাক রাজার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে ‘অভিসম্পাত?’ নন্দিনী বলে, ‘হ্যাঁ খুনোখুনি কাড়াকাড়ির অভিসম্পাত।’

খানিক ন্যাকা ন্যাকা মনে হলেও নন্দিনীকে দিয়ে আলগোছে একটি কথা বলিয়েছেন তিনি- ‘খুনোখুনি কাড়াকাড়ির অভিসম্পাত।’ মাটির নিচের তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদের দখল নিয়ে পৃথিবীর ক্ষমতাবানদের খুনোখুনি তো চলছেই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উপনিবেশের সুবিধাভোগী শ্রেণীর অধিবাসী। হয়ত সে জন্যই ‘খুনোখুনি কাড়াকাড়ি’র আসল কারণ শেষ পর্যন্ত তিনি পরিষ্কার করে বলেন না বা বলতে পারেন না। মানুষের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ‘খুনোখুনি কাড়াকাড়ি’ শুরু কলম্বাসের তথাকথিত আমেরিকা ‘আবিষ্কার’-এর মধ্য দিয়ে, যে সময়টা পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থারও সূচনাকাল। যক্ষ্মপুরির রাজা খনি থেকে সোনা সংগ্রহ করেছিলেন, কলম্বাসও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ইউরোপে ‘সোনার পাহাড় নিয়ে যাওয়ার’। তিনি যখন আমেরিকাকে ইউরোপীয় বাণিজ্য নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করেন ইউরোপের নেতৃত্বে তখন স্পেন ও পর্তুগাল। ইউরোপে ‘সোনার পাহাড়’ নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি রাখতে কলম্বাস ও তার উত্তরসূরিরা যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিলেন তাতে চৌদ্দ শ’ তিরানব্বই থেকে পনের শ’ সালের মধ্যে হিস্পানীওয়ালা জনসংখ্যা অর্ধেকে নেমে গিয়েছিল। কলম্বাস যেখানে প্রথম নেমেছিলেন সে সময় তা ‘হিস্পানীওয়ালা’ নামে পরিচিত ছিল। এখনকার নাম ‘হাইতি’ ও ‘ডোমেনিকান প্রজাতন্ত্র’। হিস্পানীওয়ালা অভিযান শেষে একে একে এগোতে থাকেন অন্যান্য দ্বীপে। শুধু মানুষ নয়, এসব অভিযান ধ্বংস করেছে প্রাচীন সমৃদ্ধ সভ্যতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রাকৃতিক পরিবেশ, যেসব সভ্যতা ইউরোপ থেকে পুরো বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে উঠে বিকশিত হয়েছিল। উদ্ভিদের চার শ’ প্রজাতি তাদের জানা ছিল, যা সে সময়ের এশিয়া বা ইউরোপের জানা ছিল না। পরিবেশ বিপর্যয়ের শুরু সে সময় থেকেই।

পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় এরপর আবির্ভাব ঔপনিবেশিক শক্তির। দেশের পর দেশে প্রতিষ্ঠিত উপনিবেশ ইউরোপে আনল অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত। কখনও তা সোনা-রুপা হিসেবে। কখনও মসলা, চা-চিনিসহ কৃষিসামগ্রী রূপে। এতে উপনিবেশগুলোর সামাজিক ও প্রতিবেশগত রূপান্তর ঘটতে থাকে। ওদিকে বিভিন্ন দেশ থেকে আনা কৃষিসামগ্রী রূপান্তর ঘটায় ইউরোপের কৃষির, যা পুঁজিবাদের পরের ধাপ শিল্প বিপ্লবের দিকে যাওয়ার পথ নিশ্চিত করে। শিল্প বিপ্লব বদলে দেয় অনেককিছু।

বিখ্যাত পরিবেশবিদ ব্যারি কমোনার উনিশ শ’ বিরানব্বই সালে প্রকাশিত ‘মেকিং পিস উইথ দ্য প্লানেট’-এ বলেছেন, ‘বিশ্বের সম্পদ আর জনসংখ্যা কোথায় কতটুকু থাকবে, তা নির্ধারণ করে দিল উপনিবেশবাদ। বেশিরভাগ সম্পদ জড়ো হলো বিষুব রেখার উত্তরে আর বেশির ভাগ মানুষ জড়ো হলো রেখার দক্ষিণে,’ প্রত্যক্ষ উপনিবেশের যুগ পেরিয়ে পরোক্ষ উপনিবেশবাদের যুগে পরিবেশের ওপর অত্যাচার চলল কয়েক গুণ বেশি মাত্রায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের ক্ষমতার কেন্দ্রে ব্রিটিশের বদলে আমেরিকা। আরও স্পষ্ট করে বললে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এ যুক্তরাষ্ট্র পাঁচ শ’ বছর আগের আমেরিকা নয়। ইউরোপিয়ান কলম্বাসের দস্যুবৃত্তির উত্তরসূরি ইউরোপেরই সম্প্রসারণ। সুতরাং এদের হাতে পরিবেশ পঞ্চমুখে বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হবে তাই স্বাভাবিক। আর স্বাভাবিকভাবেই উঠে এসেছে এই পরিসংখ্যানÑ ‘গত চার হাজার বছরে মানুষ প্রকৃতি থেকে যে পরিমাণ সম্পদ আহরণ করেছে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি সম্পদ লুট করেছে গত দু’শ’ বছরে।’ যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ দার্শনিক নেউইস মামফোর্ড পরিসংখ্যান দিয়ে বলছেনÑ ‘আজ তৃতীয় দুনিয়ার গড়পড়তা একজন মানুষ যে পরিমাণ বাণিজ্যিক শক্তি খরচ করেন তার চল্লিশ গুণ বেশি খরচ করেন উত্তর আমেরিকার গড়পড়তা একজন মানুষ। উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোতে জনপ্রতি শক্তি ব্যবহার সাহারা এলাকার জনপ্রতি শক্তি ব্যবহারের আশি গুণ। বস্ত্রকল, বাষ্প ইঞ্জিন, রেলপথ, ইস্পাত, রসায়ন ও বিদ্যুত শিল্প হয়ে শিল্পায়ন পৌঁছালো ব্যাপক গাড়ি ব্যবহারে; তারপর পেট্রোরসায়ন, জেট বিমান, কম্পিউটারের বিস্তৃতি। গত ক’বছর আগে পৃথিবীতে যে পরিমাণ সামগ্রী তৈরি হয়েছে তার সাতভাগের মাত্র একভাগ হতো উনিশ শ’ পঞ্চাশ সালে। গত ক’বছর আগে পৃথিবীতে যে পরিমাণ খনিজ দ্রব্য আহরিত হয়েছে তার মাত্র এক -তৃতীয়াংশ হতো উনিশ শ’ পঞ্চাশ সালে। মাত্র তিরিশ-চল্লিশ-পঞ্চাশ বছরের মধ্যে এত পাল্টে গেল।’

আজ মানুষের সঙ্গে মানুষ এবং প্রকৃতির সম্পর্কের একমাত্র নির্ধারক হয়েছে মুনাফা। মুনাফাভিত্তিক বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় প্রান্তের দেশগুলোকে উন্নত দেশগুলো ব্যবহার করছে নিজেদের প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর কাজে। সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের জন্য পুঁজিবাদ উন্মাদের মতো পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। পরিবেশ দূষিত ও বিষাক্ত করছে। গাছপালা, নদীনালা, পাহাড় সমুদ্র সবখানে চলছে এ প্রক্রিয়া। পাশাপাশি কলকারখানা, পরিবহন ও অন্যান্য যন্ত্রের ব্যবহার থেকে কার্বনসহ যেসব বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয় তাতে পৃথিবীর উত্তাপ বাড়ছে। ক্রমাগত উষ্ণায়নে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুসহ হিমালয়, আল্্পস ইত্যাদির বরফ গলায় সমুদ্রে পানির উচ্চতা বাড়ছে। এই বৃদ্ধি প্রতিহত করতে না পারলে উপকূলবর্তী এলাকাগুলো দ্রুত তলিয়ে যাবে। কয়েক হাজার দ্বীপ বিলুপ্ত হবে। একদিকে বরফ গলছে অন্য দিকে আফ্রিকা, ব্রাজিল, দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া, চীন ইত্যাদি এলাকার ব্যাপক বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়ায় অক্সিজেনের পরিমাণ দ্রুত কমছে। অনেক প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে। হচ্ছে মানুষের অস্তিত্বও হুমকির মুখে। কিন্তু যাদের কারণে উষ্ণতা বাড়ছে এবং অক্সিজেন কমছে- প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার ব্যাপারে সেই শিল্পোন্নত দেশগুলো প্রায় নির্বিকার। তবে গত ক’বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশে নিয়মিত বড় আকারে সামুদ্রিক ঝড়, বন্যা ইত্যাদি হচ্ছে তাতে তাদের মধ্যেও কিছুটা নড়াচড়া শুরু হয়েছে। নিজেদের কৃতকর্মের নেতিবাচক দিকগুলো এতকাল অনুন্নত বা প্রান্তের দেশগুলোয় চাপিয়ে দিলেও শেষ বিচারে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে তারা নিজেরাও বাঁচতে পারবে না। এটাই হচ্ছে ট্র্যাজেডি।

পুঁজিবাদের মূল শত্রু শ্রমিক শ্রেণী। কিন্তু এ ব্যবস্থা সব কিছু মিলিয়ে যেসব দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হয়েছে তার সমাধান তাদের পক্ষে করা সম্ভব নয়। এখন শুধু শ্রমিক শ্রেণী নয়, তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বী। মুনাফার কাছে আত্মসমর্পণ করে নিজেরাও নিরূপায় হয়ে পড়েছে ক্রমশ। পরিবেশ বিপর্যস্থ হলে শুধ শ্রমিক বা গরিব দেশের মানুষ নয়, পুঁজিবাদী দুনিয়ার রাঘববোয়ালরাও নিশ্চিত ধ্বংস হবে।

পুঁজিবাদের ভেতর সামাজিক উৎপাদন এবং ব্যক্তিগত মালিকানার মধ্যে যে মৌলিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয় তার সমাধান পুঁজিবাদী কাঠামোয় সম্ভব নয়। এ মৌলিক দ্বন্দ্ব থেকে সৃষ্টি হয় আরও হাজারো দ্বন্দ্ব। এ দন্দ্বগুলো সমাধানের অযোগ্য হলে পুঁজিবাদ উৎখাত হয়ে সমাজতন্ত্রের ভিত্তি প্রস্তুত হয়। কার্ল মার্কস এমনই বলেছেন। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ে উল্লসিত পুঁজিবাদ ‘পুঁজিবাদই বিশ্বের সর্বশেষ বা চূড়ান্ত ব্যবস্থা’ বলে যেভাবে গলা চড়িয়েছে এবং চড়াচ্ছে তা বুঝি এবার সত্যি হবে পরিবেশ ধ্বংসের কারণে। মুনাফার লোভে যেভাবে বিপজ্জনক ধ্বংসের প্রান্তে যাচ্ছে পরিবেশ তাতে পৃথিবী ধ্বংস হতে বেশি সময় লাগবে না। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাতেই সে কাজ সম্পন্ন হবে। সুতরাং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনই আর থাকবে না।