২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ধর্মীয় মতপার্থক্য প্রাধান্য পাচ্ছে খিজির খান হত্যায়

গাফফার খান চৌধুরী ॥ ধর্মীয় মতপার্থক্যের কারণেই বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা মুহম্মদ খিজির খানকে নিজ বাসায় গলা কেটে হত্যা করা হয়। তবে হত্যাকা-ের সঙ্গে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক দ্বন্দ্ব আছে কিনা সে বিষয়েও গভীর তদন্ত চলছে। হত্যার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে চলছে ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামতের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। যদিও মঙ্গলবার রাত আটটায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত হত্যাকা-ের ঘটনায় কোন মামলা হয়নি। তবে বাড্ডা থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। এমনকি ঘটনার সঙ্গে জড়িত কেউ আটক হয়নি। যদিও অনেককেই জিজ্ঞাসাবাদ করেছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশ। তদন্তে দৃশ্যমান কোন অগ্রগতির কথাও জানা যায়নি। হত্যাকা-ের বিচার চেয়ে এলাকায় বিক্ষোভ হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই বিদেশী হত্যা, এক ফাদারকে হত্যাচেষ্টা এবং সর্বশেষ পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যানকে বাসায় ঢুকে হত্যার ঘটনায় নতুন করে দেশে-বিদেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। দেশকে জঙ্গী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতেই এমন অপতৎপরতা চালানো হচ্ছে বলে সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে।

সোমবার রাত পৌনে ৮টায় রাজধানীর বাড্ডা থানাধীন মধ্যবাড্ডার গুদারাঘাট এলাকার জ- ব্লকের ১০/১ নম্বর ৬ তলা নিজ বাড়ির দ্বিতীয় তলায় বাড়ির সবাইকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে খিজির খানকে গলা কেটে হত্যা করা হয়।

ডাক্তারদের বক্তব্য ॥ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডাঃ প্রদীপ বিশ্বাস সাংবাদিকদের বলেন, খিজির খানের গলায় সাড়ে ৭ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যরে এবং দু’ ইঞ্চি প্রস্থের একটি জখমের চিহ্ন রয়েছে। মাঝারি আকারের ধারালো অস্ত্র দিয়ে পোঁচ দেয়ায় তার গলার বড় রক্তনালী (ক্যারোটিক ভ্যাসেল) কেটে যায়। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। তার শরীরে আর কোথাও কোন ক্ষতের চিহ্ন নেই। হত্যাকারীদের সঙ্গে খিজির খানের ধস্তাধস্তিরও কোন আলামত পাওয়া যায়নি।

মুরিদদের বক্তব্য ॥ মুরিদ পারভেজ (২০) বলছিলেন, সারাদেশে নকশ বন্দিয়ার ২০টি খানকা শরীফ রয়েছে। মুরিদদের নির্দিষ্ট পোশাক রয়েছে। মুরিদদের পোশাক হিসেবে নীল লুঙ্গি, সাদা পাঞ্জাবি আর মাথায় সাদা পাতলা কিস্তি টুপি। প্রতি বৃহস্পতিবার রাত ৮টা থেকে রাত ১১টা, সাড়ে ১১টা পর্যন্ত খানকা শরীফে বয়ান হতো। এছাড়া প্রতি চন্দ্র মাসের ১১ তারিখে মাসিক মাহফিল বসত। সেখানে পবিত্র কুরআন, সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনা করা, হালাল রোজগার করা, হালাল খাবার খাওয়াসহ ইসলামের নানা দিকনির্দেশনা সম্পর্কে বয়ান দিতেন খিজির খান।

পাশাপাশি ইসলামের কথা বলে বা ইসলামকে পুঁজি করে বিভিন্নভাবে যারা অর্থ উপার্জন করেন তাদের বিরোধী ছিলেন। এদের ধর্ম ব্যবসায়ীও বলতেন। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের বয়ান করতেন। তবে পেট চালানোর জন্য যে ব্যক্তি ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করতেন, তাদের বিষয়ে খিজির খানের কোন বিরোধিতা ছিল না। কিন্তু সামর্থ্যবান অথচ ধর্মের নামে বা ধর্মকে পুঁজি করে যারা অর্থ উপার্জন করেন তার বরাবরই বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি। তারই কারণে খিজির খানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হতে পারে। খিজির খানের এমন বক্তব্য দিতেন বলে জানিয়েছেন আরেক মুরিদ ওরিয়ন গ্রুপের কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম। খিজির খানের মুরিদদের অনেকের সঙ্গে কথা বলেও এমন বিষয়ই জানা গেছে। পরিবারের তরফ থেকেও এমনটাই দাবি করা হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, খিজির খানের হাজার হাজার মুরিদ রয়েছে।

পুলিশের সংবাদ সম্মেলন ॥ মঙ্গলবার দুপুরে পুলিশের গুলশান জোনের উপ-কমিশনার এসএম মোস্তাক আহমেদ খান তার কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ব্যক্তিগত শত্রুতা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং ধর্মীয় মতপার্থক্যকে সামনে রেখে খিজির খান হত্যার তদন্ত চলছে। তদন্তের ক্ষেত্রে সবকিছুই গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। সার্বিক দিক পর্যালোচনা করে ধর্মীয় মতপার্থ্যকের বিষয়টিকে তদন্তের ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

খিজির খান হত্যাকা-ের সঙ্গে ২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর সন্ধ্যা সোয়া ছয়টায় রাজধানীর ওয়ারী থানাধীন রামকৃষ্ণ (আর কে) মিশন রোডের বাড়িতে জবাই করে ইমাম মাহদীর প্রধান সেনাপতি ও বিশ্ব ত্রাণকর্তা দাবিদার লুৎফর রহমান ফারুক (৫৫) ও তার ছেলে সানোয়ারুল ইসলাম মনির (৩০), বাড়িতে থাকা খাদেম মঞ্জুর আলম (২৮), মুজিবুল সরকার (৩২), শাহীন (২৪) ও রাসেলকে (৩৭) গলা কেটে হত্যা এবং ২০১৪ সালের ২৭ আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁও থানাধীন পূর্ব রাজাবাজারের নিজ বাড়িতে বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল আই-এর শান্তির পথে ও কাফেলা নামক ইসলামী অনুষ্ঠানের উপস্থাপক মাওলানা নুুরুল ইসলাম ফারুকীকে জবাই করে হত্যার সঙ্গে মিল রয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশের আল কায়েদা ও সদ্য নিষিদ্ধ আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নামের আদলে বিভিন্ন নামে ব্লগার ও সম্প্রতি দুই বিদেশী হত্যার দায় স্বীকার করে বিবৃতি এসেছে। তবে গোপীবাগের সিক্স মার্ডার ও তেজগাঁওয়ে নুরুল ইসলাম ফারুকী হত্যা এবং সর্বশেষ খিজির খান হত্যার দায় স্বীকার করে মঙ্গলবার রাত আটটা পর্যন্ত কোন বিবৃতি প্রকাশিত হয়নি।

নামাজে জানাযা ও দাফন ॥ মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় খিজির খানের লাশ আলিফ মেডিক্যাল সার্ভিসের একটি লাশবাহী সাদা এ্যাম্বুলেন্সে করে মধ্যবাড্ডার বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় শত শত মুরিদ ও স্থানীয়রা ভিড় জমায়। বাড়িতে রীতিমতো কান্নার রোল পড়ে যায়।

খিজির খানের ভাতিজা মাহফুজ জানান, খিজির খানের ভাই মালয়েশিয়া থেকে এবং বড় ছেলে চীন থেকে ঢাকার ফেরার পর মধ্যবাড্ডায় প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় জানাজা হয় মতিঝিল পিডিবি কার্যালয়ে। বুধবার সকালে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ফিলিপনগর হাইস্কুল মাঠে শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর পিতার কবরের পাশে খিজির খানকে দাফনের কথা রয়েছে।

বিক্ষোভ ॥ লাশ বাড়িতে পৌঁছার পর পূর্ব বাড্ডার ডিআইটি প্রজেক্টে অবস্থিত মহানগর মহাবিদ্যালয় ও ডিগ্রী কলেজের ছাত্রছাত্রীরা পোস্টার হাতে খিজির খানের বাড়ির সামনে হাজির হয়। তারা হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ করে। খিজির খান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। রাজউকের প্রায় দেড় বিঘা জমির ওপর নির্মিত কলেজটি খিজির খান প্রতিষ্ঠা করেছেন বলে শিক্ষক শিক্ষার্থীরা জানান।