১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাস ভাড়া আদায় নিয়ে রাজধানীর সব রুটে অরাজকতা

আনোয়ার রোজেন ॥ ‘যাত্রীদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বেশি কেউ আদায় করবেন না। বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ৭ টাকা। মিনিবাসে সর্বনিম্ন ভাড়া পাঁচ টাকা। বাড়তি ভাড়া আদায় করলে সংশ্লিষ্ট পরিবহন চালকসহ সুপারভাইজারের বিরুদ্ধে নেয়া হবে আইনানুগ ব্যবস্থা।’ যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে এই উদ্যোগ। মঙ্গলবার সকালে কমলাপুর এলাকায় পরিবহন মালিক সমিতি ও বিআরটিএ পক্ষ থেকে এভাবেই মাইকিং চলছিল। কিন্তু তা বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কিনা? খতিয়ে দেখার কেউ নেই। মজার বিষয় হলো, যেখান থেকে মাইকে এ রকম ঘোষণা আসছিল ঠিক এর বিপরীত দিক থেকেই গুলশানের উদ্দেশে একটু পর পর ছেড়ে যাচ্ছিল ৬ নম্বর বাস। এসব বাসের যাত্রীর সবাই বাড়তি ভাড়া নেয়ার অভিযোগ করেন। তাদের বক্তব্য, কমলাপুর থেকে মতিঝিল শাপলা চত্বর পর্যন্ত দুই কিলোমিটারেরও কম রাস্তায় সাত টাকা ভাড়া দাবি করা হচ্ছে। মগবাজার পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে ১৫ টাকা। নতুন ভাড়া অনুযায়ী ১৫ টাকা নিতে হলে অন্তত প্রায় ১০ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিতে হবে। অথচ চার কিলোমিটার রাস্তার জন্য এই টাকা গুনতে হচ্ছে যাত্রীদের।

কমলাপুর থেকে বাহন, মিডওয়ে পরিবহনে সায়েন্স ল্যাবরেটরি পর্যন্ত ২০ টাকা আদায় করা হচ্ছে! এক টাকা বাড়তি ভাড়া নিতে হলে অন্তত ১০ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করতে হবে। অথচ এসব বাসে ভাড়ার তালিকাই চোখে পড়েনি। গাজীপুর পর্যন্ত চলা বলাকা পরিবহনে তালিকা নেই। গাজীপুর পরিবহনের চিত্র একই। ভাড়া আদায় নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে বাস সংশ্লিষ্টদের ব্যাপক বাগ্বিত-া দেখা যায়। তবে বাসচালক আলী জানান, এখনও কর্তৃপক্ষ এই রুটে নতুন ভাড়া আদায় করছে না। যাত্রীদের কাছে গন্তব্য প্রতি এক টাকা বাড়তি চাওয়া হচ্ছে। যারা ইচ্ছে করে দিচ্ছেন তাদের কাছ থেকে নেয়া হচ্ছে। যারা দিচ্ছেন না তাদের কাছে দাবি নেই বলে জানান তিনি।

সব মিলিয়ে রাজধানীতে বাস ও মিনিবাসের যাত্রীদের পকেট কেটে নেয়া হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। প্রায় এক সপ্তাহেও গাড়িতে ঝোলানো হয়নি সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা। বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানির পক্ষ থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে ভাড়ার তালিকা টাঙানোরও অভিযোগ পাওয়া গেছে। চার হাজারের বেশি বাস ও মিনিবাস নিয়ন্ত্রণে বিআরটিএ মাত্র তিনটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেই দায় এড়াতে চাচ্ছে। এক নবেম্বর থেকে অটোরিক্সার ভাড়া বাড়ানোর কথা রয়েছে। আগেই যাত্রীদের কাছ থেকে অন্তত ২০ গুণ বাড়তি ভাড়া নিয়ে রাজধানীতে চলতে ১৩ হাজার অটোরিক্সা। এক নবেম্বর থেকে সরকার ঘোষিত ভাড়া ও জমা কার্যকর হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন খোদ অটোরিক্সা মালিক ও শ্রমিক নেতারাই। মঙ্গলবার বাসে বাড়তি ভাড়া নেয়ার সময় হাতেনাতে বাস সংশ্লিষ্টদের ধরে যাত্রীদের টাকা ফেরত দিতে বাধ্য করেছেন সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

এদিকে যাত্রী কল্যাণ সমিতি অভিযোগ করে বলেছে, বাস-মিনিবাসে যাত্রীদের কাছ থেকে সর্বনিম্ন ১০০ ভাগ ও সর্বোচ্চ ৬০০ ভাগ পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। সংগঠনের মহাসচিব মোজাম্মেল হক জনকণ্ঠকে বলেন, রাজধানীতে চার হাজারের বেশি বাস ও মিনিবাস চলছে। বাস ও নিউম্যান হলারে গড়ে প্রতিদিন ৩০০ কোটি টাকা বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। অটোরিক্সাসহ সকল গণপরিবহনে প্রতিদিন ৫০০ কোটি টাকা বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেন তিনি। তিনি বলেন, বাড়তি ভাড়া আদায় বন্ধে যাত্রীসহ পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সচেতন করতে হবে। ভাড়া অরাজকতা বন্ধে সরকারের কঠোর হওয়া ছাড়া বিকল্প কিছু নেই বলেও মনে করেন তিনি।

বিদ্যুত ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষিতে গেল ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকা ও চট্টগ্রামে বাস-মিনিবাসসহ অটোরিক্সা বাড়তি ভাড়া নির্ধারণ করে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। গেল বৃহস্পতিবার থেকে নতুন ভাড়া কার্যকর হয় ঢাকায়। নানা কারণে চট্টগ্রামে পাঁচ অক্টোবর থেকে কার্যকর শুরু হয়েছে।

নতুন করে প্রতি কিলোমিটারে বাস ভাড়া এক টাকা ৭০ পয়সা ও মিনিবাসে এক টাকা ৬০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। সর্বনিম্ন ভাড়া অপরিবর্তিত থাকছে। এছাড়া এক নবেম্বর থেকে বাড়বে অটোরিক্সার ভাড়া। অটোরিক্সায় প্রথম দুই কিলোমিটারে দিতে হবে ৪০ টাকা। মালিকদের জমা বাড়িয়ে ৬০০ টাকার স্থলে করা হয়েছে ৯০০টাকা। তবে আন্তঃজেলা রুটে বাসের ভাড়া বাড়বে না। সর্বশেষ ২০১১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা ও চট্টগ্রামে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল।

ভাড়া নির্ধারণ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুই সিটিতে আগে কিলোমিটার প্রতি বাস ভাড়া ছিল এক টাকা ৬০ পয়সা। মিনিবাসের কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ছিল এক টাকা ৫০ পয়সা। এখন উভয় বাসেই ১০ পয়সা করে বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া বাসে ৭ টাকা ও মিনিবাসে ৫ টাকা সর্বনিম্ন ভাড়া বহাল থাকছে। ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ)-এর আওতায় হওয়ার মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদীসহ পাঁচ জেলায় ঢাকা-চট্টগ্রামের বাস ও মিনিবাসের সমান ভাড়া আদায় করা হবে।

সিএনজি চালিত অটোরিক্সার ক্ষেত্রে দুই সিটি কর্পোরেশনে প্রথম দুই কিলোমিটারের ভাড়া ২৫ টাকার স্থলে ৪০ টাকা করা হয়েছে। সর্বনিম্ন ভাড়াও তাই। পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া সাত টাকা ৬৪ পয়সার স্থলে ১২টাকা করা হয়েছে। যানজট বা অন্য কোন কারণে রাস্তায় বিরতিকালীন সময়ে প্রতি মিনিটের ভাড়া এক টাকা ৪০ পয়সার স্থলে ২টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানান, সরকার নির্ধারিত অটোরিক্সার ভাড়া মেনে চলতে মিটার মেরামতের জন্য পরিবহন মালিকরা সময় চেয়েছেন। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাদের এক নবেম্বর পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছে। এদিন থেকেই ভাড়া কার্যকর করার কথা জানান তিনি।

অটোরিক্সা মালিক ও শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা বলছেন, সরকার নির্ধারিত জমা মেনে চলতে মালিকদের কখনই বাধ্য করা যায়নি। এবারও সম্ভব হবে না। মালিকরা জমা বাড়িয়ে নিলে চালকরা বাধ্য হলে মিটার ছাড়া চুক্তিতে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করে। এ ব্যাপারে সরকারকে আরও কঠোর হওয়ার পরামর্শ তাদের।

মতিঝিল থেকে চিড়িয়াখানা পর্যন্ত চলা নিউ ভিশন পরিবহনের বাসে নতুন ভাড়ার তালিকা ঝুলতে দেখা গেছে। বাস কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষরিত তালিকায় দেখা গেছে, মতিঝিল থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত দেখানো হয়েছে প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার রাস্তা। ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ টাকা। নতুন ভাড়া অনুযায়ী আসে ১১ টাকা ৫৫ পয়সা। আর চিড়িয়াখানা পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার রাস্তায় ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২৬ টাকা। এখানে ভাড়া আসে ২৫ টাকা ৬ পয়সা। মতিঝিল থেকে চিড়িয়াখানা পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার রাস্তা নিয়ে সন্দেহের কথা জানিয়েছেন যাত্রীরা। কমলাপুর থেকে মিরপুর রুটে চলা স্বকল্প পরিবহনে মগবাজার পর্যন্ত ১৫ টাকা দাবি করা হচ্ছে। অথচ গাড়িত সরকারী ভাড়ার তালিকা নেই। ছালছাবিল ও অনাবিল পরিবহনে বাসাবো থেকে নতুন বাজার পর্যন্ত ২৫ টাকা আদায় করা হচ্ছে যাত্রীদের কাছ থেকে। তবে তুরাগ পরিবহনের ভাড়া খুব একটা বাড়েনি। আট নম্বর বাসে নেয়া হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। আরামবাগ থেকে সিটি সার্ভিসে মোহাম্মদপুর পর্যন্ত কখনও ২০-২৫ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। ঢাকা পরিবহন, বিকল্প পরিবহন, ইটিসিসহ মিরপুর গাড়ি বিভিন্ন পরিবহনের বিরুদ্ধে ভাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ঢাকা থেকে মাওয়া, গাজীপুর, সাভার, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, কুমিল্লা, ভুলতা, গাউছিয়া, কালিয়াকৈরসহ আশপাশের জেলা উপজেলায় বাড়তি বাস ভাড়া নেয়ারও অভিযোগ মিলেছে। যদিও ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ)-এর আওতায় হওয়ার রাজধানীর আশপাশে ছয় জেলার বাস ভাড়াও কিলোমিটার প্রতি ১০ পয়সা করে বেড়েছে। বাস ও মিনিবাসে নেয়া হচ্ছে সমান ভাড়া। তা নিয়ন্ত্রণ বা দেখভালের কেউ নেই।

বিআরটিএ সচিব শওকত আলী জনকণ্ঠকে বলেছেন, নির্ধারিত ভাড়া আদায় নিশ্চিত করতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। অভিযোগ পেলেই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানান তিনি। সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ জনকণ্ঠকে বলেন, বাড়তি ভাড়া আদায় বন্ধে আমরা সকল পরিবহন মালিকদের নির্দেশ দিয়েছি।

মন্ত্রীর নির্দেশে বাসের বাড়তি ভাড়া ফেরত পেলেন যাত্রীরা ॥ মন্ত্রীর নির্দেশে বাসের বাড়তি ভাড়া ফেরত পেলেন যাত্রীরা। পাশাপাশি সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে কাছে বাস যাত্রীদের সবাই বিভিন্ন পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেন। তখন বিআরটিএ কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেটকে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বলেন মন্ত্রী। তারপর তালিকা অনুযায়ী প্রত্যেক যাত্রীর কাছ থেকে ইটিসি পরিবহন আরও একটি সিটিং সার্ভিস বাসে জনপ্রতি দুই টাকা করে বাড়তি ভাড়া নেয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এবার ফেসে গেলেন বাস চালকসহ হেলপার। অতপর মন্ত্রীর নির্দেশে সব যাত্রীকে দুই টাকা করে ফেরত দিতে বাধ্য করা হয়। পাশাপাশি গুনতে হয় জরিমানাও।

মঙ্গলবার মিরপুর বিআরটিএ কার্যালয়ে সামনে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী আকস্মিক অভিযানে যান। তখন চারটি বাসে ওঠে যাত্রী সহ চালকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে না এ ব্যাপারে সবার কাছে খোঁজখবর নেন। এ ছাড়াও বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল থামিয়ে লাইসেন্সের বিষয়ে চালকের সঙ্গে কথা বলেন মন্ত্রী নিজেই। অভিযান শেষে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, বাস ও মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হলেই ব্যবস্থা। এ নিয়ে কোন আপোস নেই। কেউ নিজেদের ইচ্ছেমতো যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া নেবে এটা চলতে দেয়া যায় না।

তিনি বলেন, বাড়তি ভাড়া আদায় বন্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে। ইতোমধ্যে পরিবহন মালিক সমিতি থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্টদের সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা মেনে চলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। দুপুর পর্যন্ত বিআরটিএ কার্যালয়ের সামনে মোবাইল কোর্টের অভিযানে ১১টি মামলা ১৩ হাজার টাকা জরিমানা ও ২টি গাড়ি ডাম্পিংয়ে পাঠানো হয়।