২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সৌদি আরবে কেমন আছেন বাংলাদেশী নারীকর্মীরা

  • জেদ্দাসাইটে অন্তত চার শ’ আটক?

ফিরোজ মান্না ॥ নিজের ভাগ্য ও পরিবারের দুরবস্থা পরিবর্তনের জন্য মমতাজ বেগম সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছেন। কিন্তু মমতাজের ভাগ্যের চাকা সামনের দিকে ঘোরেনি বরং চাকা উল্টো দিকেই ঘুরছে। সে আরও বেশি বিপদসঙ্কুল অবস্থার মধ্যে দিনযাপন করছেন। রংপুর শহরের বাহারকাতের পাড়ার বাবা মরহুম জহুরুল হকের পাঁচ ছেলেমেয়ের মধ্যে মমতাজ সবার ছোট। বিয়েও হয়নি। পরিবারের অসচ্ছলতা দূর করার জন্য গত ২২ সেপ্টেম্বর সরকারী ব্যবস্থাপনায় সৌদি আরবে যান। এখন তিনি বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন। ‘জেদ্দা সাইট’ নামের একটি ভবনে মমতাজের মতো আরও অনন্ত চার শ’ বাংলাদেশী নারীও সেখানে আটক রয়েছেন। এই বন্দীশালায় প্রতিদিন চলে অমানুষিক নির্যাতন। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বেশ কয়েক নারী কৌশলে পালিয়ে দেশে ফিরেছেন। নির্যাতনের বিষয়টি উল্লেখ করে মমতাজের ভাই মোঃ মনিরুজ্জামান তার বোনকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সচিব বরাবর একটি আবেদন করেছেন।

মনিরুজ্জামান তার আবেদনে উল্লেখ করেন, কোটা অনুযায়ী রংপুরে তিনজন নারী কর্মী সৌদি আরব যাওয়ার সুযোগ পান। এরা হলেন মনিরা বেগম, হানিফা বেগম ও তার বোন মমতাজ বেগম। একুরা, মনসুর আলী, আল ফাততীন নামে তিনটি এজেন্সির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ২০ হাজার নারী কর্মী সৌদি আরবে যাচ্ছেন। মমতাজদের নিয়ে যায় একুরা এজেন্সি। সৌদি খরচে গত ২২ সেপ্টেম্বর তারা সৌদিতে পৌঁছান। একই ফ্লাইটে ২৮ বাংলাদেশী মহিলা কর্মী সৌদি যান। তাদের জেদ্দা সাইট নামে দুটি বহুতল ভবনে তোলা হয়। তার বোন মমতাজ জেদ্দা এয়ারপোর্টে নেমেই প্রথমে একটি মোবাইল সিম কেনেন। ওই সিমটি তার কাছে দুই দিন ছিল। সৌদি আরব থেকে কয়েক দফা মমতাজ বাড়িতে কথাও বলেছেন। যার নম্বর +৯৬৬৫৯০৩৬৩৫৯৫। দুই দিন পরে মোবাইলটি এজেন্সির লোকেরা ছিনিয়ে নেয়। এখন এই ফোনে ফোন করলে পুরুষ মানুষের কণ্ঠ শোনা যায়। দুই দিনে তার বোন জেদ্দা সাইটের যে বর্ণনা দিয়েছেন তা শুনে আমাদের গা শিউরে ওঠে। সেখানে প্রতিদিন দফায় দফায় সৌদি পুরুষরা এসে নারীদের ওপর পাশাবিক নির্যাতন চালায়। যদি কেউ কোন প্রতিবাদ করে তখন তার ওপর চলে মারধর। মনিরুজ্জামান বলেন, এ অবস্থায় আমার অবিবাহিত বোন মমতাজ দেশে ফেরার জন্য আমাদের জানান। আমরা বিএমইটি, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ নানা জায়গায় দৌড়ঝাঁপ করেও বোনকে দেশে আনতে পারিনি। বিষয়টি নিয়ে এ মাসের প্রথম দিনই প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সচিব বরাবর একটি আবেদন করেছি। ওই আবেদন করার পরও কোন সাড়া পাইনি।

বিষয়টি জানার জন্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কমংসংস্থান সচিব খন্দকার ইফতেখার হায়দারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারী ব্যবস্থাপনায় সৌদি খরচে ২০ হাজার নারী কর্মী পাঠানো হচ্ছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ তাদের ইন্টারভিউ নিয়েছে। তারাই বাছাই করেছে। মন্ত্রণালয় শুধু সহযোগিতা দিয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েক হাজার নারী কর্মী দেশটিতে চলে গেছেন। অনেকে কাজে যোগ দিয়েছেন। আবার অনেকে কাজে এখনও যোগ দিতে পারেননি। তবে তারা অল্প সময়ের মধ্যে কাজে যোগ দিতে পারবেন। আমরা বেশ কয়েকটি অভিযোগ পেয়েছি। কিন্ত এমন ভয়াবহ অভিযোগের কোন খবর আমরা পাইনি। যদি এমন কোন ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে দূতাবাসের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে প্রায় সাড়ে তিন লাখ নারী কর্মী কাজ করছেন। বেশিরভাগই কাজ করেন গৃহকর্মী হিসেবে। তাঁদের অভিযোগ, নারী কর্মীদের বিপদ আপদে সহযোগিতায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কোনো শেল্টার হোম কিংবা হটলাইন সেবা নেই। ফলে গৃহকর্তা কিংবা কারখানায় নির্যাতনসহ নানাভাবে বঞ্চনার শিকার হলেও দূতাবাস থেকে তাঁরা কোন সহযোগিতা পাচ্ছেন না। নির্যাতনের মাত্রা সহ্যের বাইরে চলে গেলে একপর্যায়ে তাঁরা দেশে ফিরতে বাধ্য হন। কখনও কখনও অন্যায়ভাবেও তাঁদের চাকরিচ্যুত করা হয়। নারী কর্মীরা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়ে অমানবিক জীবনযাপন করছেন। গৃহকর্তা ঠিকমতো খাবার দেন না, দিনের পর দিন কাজ করিয়ে বেতন দেন না। অর্থনৈতিক বঞ্চনা ছাড়াও চলে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন। প্রতিবাদ করলে বাড়ে নির্যাতনের মাত্রা। নিয়োগকর্তারা নারী কর্মীর সঙ্গে ক্রীতদাসের মতো আচরণ করে। ফলে এখন অনেক নারী কর্মী দেশে ফিরে আসছেন। এই ঘটনা ঘটে বেশিরভাগ মধ্যপ্রাচ্যের দেশে। সৌদিতে তো এটা ভয়াবহ আকারে হওয়ায় দেশটি থেকে নারী কর্মী নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে নিস্ব হাতে ফিরে আসেন।

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর সাদুহাটি গ্রামের মরহুম ফিরোজ আহমেদের মেয়ে শাহিনা ইয়াসমিন সংসারের সচ্ছলতা আনতে গৃহকর্মীর ভিসায় সৌদি গিয়েছিলেন। তাকেও এমন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরতে হয়েছে। নির্যাতন সইতে না পেরে শাহিনাসহ ১৩ নারী কর্মী দেশে ফিরে এসেছেন।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সূত্র জানিয়েছে, ১৯৯১ থেকে ২০১৪ সালের নবেম্বর পর্যন্ত তিন লাখ ৪৩ হাজার ৮৪৫ নারী কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্য সবচেয়ে বেশি গেছেন লেবাননে, যার সংখ্যা ৮৯ হাজার ৮৮১। ২০১৪ সালে মোট কর্মীর প্রায় ৮৪ শতাংশ গেছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে এ হার ১৮ শতাংশ।

নারী কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, বিদেশের মাটিতে প্রায় সাড়ে তিন লাখ নারী কর্মী কাজ করলেও তাঁদের সমস্যা এবং সহযোগিতার জন্য নেই কোন শেল্টার হোম, দ্রুত সহযোগিতা পাওয়ার জন্য নেই হটলাইন। অনেক দেশেই নারীকর্মীরা নির্যাতনের শিকার হয়ে সহযোগিতা চাইলেও পাচ্ছেন না। নারী কর্মীদের তাৎক্ষণিক সহযোগিতার জন্য সরকারের উচিত দ্রুত হটলাইন এবং শেল্টার হোম খোলার উদ্যোগ নেয়া। কারণ, বিদেশে নারী কর্মীর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে, সেই সঙ্গে প্রবাসে নারী কর্মীর সমস্যাও বাড়ছে।