২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জাপানী নাগরিক হত্যায় দুইজন রিমান্ডে

শংকর কুমার দে ॥ ইতালীয় ও জাপানী- দুই বিদেশী হত্যাকা-ের ঘটনায় বাংলাদেশে অবস্থানরত সোয়া দুই লাখ বিদেশী নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের অবস্থান ও কর্মস্থল চিহ্নিত করছে সরকার। যুদ্ধাপরাধের বিচারে ক্ষুব্ধ হয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে দুই বিদেশী হত্যাকা-ের ঘটনায় জামায়াত জড়িত থাকতে পারে বলে মনে করেন ভারতের গোয়েন্দারা। জাপানী নাগরিক হত্যাকা-ের তদন্তে রংপুরে গেছেন জাপানী পুলিশের চার সদস্য। দুই বিদেশী হত্যাকা-ের ঘটনায় সীমান্তে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। রংপুরে জাপানী নাগরিক কোনিও হোসি হত্যা মামলায় স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিব-উন নবী খান সোহেলের ছোট ভাই রংপুর মহানগর বিএনপির সদস্য রাশেদুন নবী খান বিপ্লব এবং কোনিওর বাড়িওয়ালা জাকারিয়া বালার শ্যালক হীরাকে গ্রেফতার দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। সরকারের পক্ষ থেকে দুই বিদেশী নাগরিক হত্যাকা-ের তদন্তের অগ্রগতি, নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জঙ্গী তৎপরতাসহ সার্বিক পরিস্থিতি অবহিত করা হয়েছে কূটনীতিকদের। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

সূত্র জানান, বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রায় সোয়া দুই লাখ বিদেশী নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের অবস্থান ও কর্মস্থল চিহ্নিত করছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল মঙ্গলবার পদ্মায় বিদেশী কূটনীতিকদের সামনে বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলে ধরতে প্রেস ব্রিফিংয়ে যাওয়ার আগে সংবাদ মাধ্যমকে বিদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে তাদের বাসস্থান ও কর্মস্থল চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া চলছে। তাদের যাতায়াতের পথ, বিনোদনের স্থান ও সামাজিক যোগাযোগের অবস্থানে বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ঢাকার গুলশানে কূটনীতিক এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি গোয়েন্দা কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর গুলশানের কূটনীতিক পাড়ায় সিজার তাভেলা নামের এক ইতালীয় এনজিও কর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর ছয় দিনের মাথায় রংপুরের এক গ্রামে একই কায়দায় খুন হন জাপানী নাগরিক কোনিও হোসি। দুটি ঘটনার পরই আইএস হত্যার দায় স্বীকার করে বলে খবর দেয় জঙ্গী তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘সাইট ইন্টিলিজেন্স গ্রুপ’। এই পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে বাংলাদেশে জঙ্গী উত্থানের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। সরকার বলে আসছে, দুই খুনের সঙ্গে আইএসের সম্পৃক্ততার কোন প্রমাণ মেলেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন, আইএস বা তেমন কোন জঙ্গী সংগঠনের তৎপরতা বাংলাদেশে নেই।

জাপানী হত্যায় দুইজন রিমান্ডে ॥ রংপুরে জাপানী নাগরিক কোনিও হোসি হত্যা মামলায় দুইজনকে গ্রেফতার দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। যে দুইজনকে তারা হচ্ছেন, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিব-উন নবী খান সোহেলের ছোট ভাই রংপুর মহানগর বিএনপির সদস্য রাশেদুন নবী খান বিপ্লব এবং কোনিওর বাড়িওয়ালা জাকারিয়া বালার শ্যালক হীরা। গত ৩ অক্টোবার হত্যাকা-ের দিনই মোট ৬ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছিল পুলিশ। পুলিশের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার সকালে বিপ্লব ও হীরাকে রংপুরের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানানো হয়। আদালতের বিচারক আবু তালেব দশ দিনের হেফাজতের আবেদন মঞ্জুর করেন বলে কাউনিয়া থানার ওসি রেজাউল করিম জানান।

হত্যাকা-ের সংশ্লিষ্টতা ॥ রংপুরের কাউনিয়া থানার পুলিশ বলেছেন, জিজ্ঞাসাবাদে আমরা হত্যাকা-ের বিষয়ে এই দুজনের সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক তথ্য পেয়েছি। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে হয়ত আরও তথ্য পাওয়া যাবে। শনিবার বেলা ১১টার দিকে কাউনিয়া উপজেলার আলুটারি মহিষওয়ালা মোড়ে ৬৬ বছর বয়সী ওই জাপানীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনজন মুখোশধারী তাকে গুলি করে মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায় বলে পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। হত্যাকা-ের দিন পুলিশ বিপ্লব ও হীরা ছাড়াও রংপুর মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আনিছুর রহমান লাকু, বাড়িওয়ালা জাকারিয়া (৫৮), স্থানীয় রিক্সাচালক মোন্নাফ আলী ও আলুটারি গ্রামের খোকা মিয়ার ছেলে মুরাদ হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে। এছাড়া অজ্ঞাত পরিচয় তিনজনকে আসামি করে কাউনিয়া থানায় একটি মামলা করে পুলিশ।

জাপানী পুলিশের প্রতিনিধি দল ॥ জাপানী নাগরিক কোনিও হোসি হত্যার তদন্তে জাপানী পুলিশের চার সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল রংপুরে পৌঁছেছে। মঙ্গলবার সকালে রংপুর পুলিশ সুপারের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হয়েছেন তারা। কোনিও হোসি হত্যার তদন্তের জন্য সোমবার দুপুরে ঢাকায় পৌঁছে জাপান পুলিশের প্রতিনিধিদলটি।

ত্রৈমাসিক সভায় পুলিশের আইজি ॥ মঙ্গলবার পুলিশ সদর দফতরে বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক বলেছেন, বাংলাদেশে ইসলামী জঙ্গী সংগঠন আইএসআইএসের কোন সাংগঠনিক অস্তিত্ব নেই। ব্যক্তিগতভাবে কেউ তাদের আদর্শে বিশ্বাসী হতেও পারে। তবে আমরা এ দেশকে জঙ্গী রাষ্ট্র হতে দেব না। শক্ত হাতে দৃঢ়তার সঙ্গে ওই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা হবে। আমাদের দেশকে নিয়ে সকল ষড়যন্ত্র নসাৎ করা হবে। মঙ্গলবার দুপুরে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ত্রৈমাসিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর ’১৫) অপরাধ পর্যালোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে এ কথা বলেন। সভায় সকল পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি, পুলিশের অন্যান্য ইউনিটের প্রধানগণ এবং পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের উর্ধতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। আইজিপি বলেন, অতীতে বাংলাদেশ পুলিশ জঙ্গীবাদ, চরমপন্থী নাশকতাকারী এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সাফল্য দেখিয়েছে। সেই সাফল্য ধরে রাখতে হবে। দেশে জেএমবি, হুজিসহ ভিন্ন নামে জঙ্গীবাদের উত্থান না ঘটে সেজন্য জঙ্গীদের অপতৎপরতার ব্যাপারে সর্তক ও সজাগ থাকতে হবে। তিনি বলেন, ইতালি ও জাপানের দুইজন নাগরিক হত্যার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত ও গ্রেফতার করা হবে। তিনি খুনীদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার জন্য সংশিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। সভায় পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অতিরিক্ত ডিআইজি (স্পেশাল ক্রাইম এ্যান্ড প্রসিকিউশন) মোঃ জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া বিগত প্রান্তিকের (তিন মাস) সার্বিক অপরাধ পরিস্থিতি তুলে ধরেন। দেশব্যাপী অপহরণ, খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, নারী ও শিশু পাচার, অস্ত্র উদ্ধার, মাদকদ্রব্য উদ্ধারসহ সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা সম্পর্কে সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। অপরাধ পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত প্রান্তিকের তুলনায় আলোচ্য প্রান্তিককে মোট মামলার সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। আলোচিত সময়ে পুলিশ কর্তৃক বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধারের পরিমাণ বেড়েছে। পুলিশের কার্যকর ভূমিকার ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অপহৃত ভিকটিম উদ্ধার হয়েছে। তবে দস্যুতা, খুন এবং ধর্ষণ মামলা কিছুটা বেড়েছে। সভায় বাংলাদেশ সিআইডির অতিরিক্ত আইজিপি শেখ হিমায়েত হোসেন, অতিরিক্ত আইজিপি (এডমিন এ্যান্ড অপস্) মোঃ মোখলেসুর রহমান, র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, অতিরিক্ত আইজিপি (এইচআরএম) মোঃ মইনুর রহমান চৌধুরী, অতিরিক্ত আইজিপি (ফিন্যান্স এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) মোঃ আবুল কাশেম, ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোঃ আছাদুজ্জামান মিয়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সীমান্তে নজরদারি ॥ দুই বিদেশী নাগরিক খুন হওয়ার পর দেশের সীমান্ত এলাকা বেনাপোলে দেশী-বিদেশীদের চলাচলে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সরকারের ‘বিশেষ নির্দেশে’ সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে। যে সকল বিদেশী নাগরিক বেনাপোল চেকপোস্ট দিয়ে বাংলাদেশে আসছেন এদেশে তাদের অবস্থানের ঠিকানা নির্ভুলভাবে লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে ঠিকানাটি ঢাকা অফিসে পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া এদেশ থেকে যারা ভারতে যাচ্ছেন তাদের পাসপোর্ট ও ভিসা সম্পূর্ণ যাচাই-বাছাই করে দেশত্যাগের অনুমতি দিতে আমাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বেনাপোলসহ যশোর জেলার বিভিন্ন সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। সীমান্ত পথে অপরাধীরা যাতে দেশ ত্যাগ করতে না পারে সে জন্য সর্বক্ষণিক সতর্কতা ও নিরাপত্তাও জোরদার করা হয়েছে।