১৩ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চট্টগ্রামে মাজারে জোড়া খুন ও ট্রিপল মার্ডারের রহস্য উদ্ঘাটন

  • অর্থ যোগাড়ে ছিনতাইয়ে নেমেছে জেএমবি সদস্যরা

মাকসুদ আহমদ, চট্টগ্রাম অফিস ॥ চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকায় মাজারে জোড়া খুনের ঘটনার ক্লু উদঘাটনসহ ৫ জেএমবি সদস্য গ্রেফতারের ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ছিনতাইয়ের ঘটনায় জেএমবি জড়িত এমন তথ্য বেরিয়ে এসেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের তথ্যে। তবে ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত হওয়ার পেছনে জেএমবি সদস্যদের অর্থ সঙ্কট ও কালেকশনের উদ্দেশ্য রয়েছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পুলিশের সোমবার রাতের অভিযানে চট্টগ্রাম অঞ্চলের জেএমবির বিস্ফোরক প্রধান জাবেদ গ্রেনেড বিস্ফোরণে মারা গেছে। গ্রেফতার হয়েছে আরও ৫ জঙ্গী।

আবার কর্ণফুলী নদীর ওপারে থাকা নগরীর সবচেয়ে দূরবর্তী থানা এলাকায় জেএমবির আস্তানা গড়ে তোলা হলেও থানা পুলিশ কিছুই জানে না। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় কর্ণফুলী থানা পুলিশের নজরদারি না থাকলেও উর্ধতন কর্তৃপক্ষ কোন ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে জেএমবির চট্টগ্রাম অঞ্চলের জেএমবির সামরিক প্রধান হিসেবে খ্যাত জাবেদ অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়ক এলাকায় গ্রেনেড বিস্ফোরণে নিহত হওয়ার ঘটনাটিও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে প্রশাসনকে। মঙ্গলবার সকালে সিএমপি কমিশনারের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত প্রেস ব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) এবং গোয়েন্দা বিভাগের ডেপুটি কমিশনার প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অনেক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার পেছনে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, ৫ জেএমবি সদস্য গ্রেফতার ঘটনায় ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের জেএমবির বিস্ফোরক বিভাগের প্রধান জাবেদ নিহত হওয়ার ঘটনায় পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তারা সঠিক তথ্য দিতে পারেননি। কারণ, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন, অর্থ ও ট্রাফিক) একেএম শহিদুর রহমান প্রেস ব্রিফিংয়ে জাবেদ গ্রেনেড বিস্ফোরণে নিহতের তথ্য দিয়েছেন। কিন্তু অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম এ্যান্ড অপারেশন) দেবদাস ভট্টাচার্য্য জেএমবি সদস্য জাবেদ নিহতের ঘটনাস্থলটি নির্দিষ্ট করতে পারেননি। তবে প্রেস ব্রিফিংয়ে চুপসে ছিলেন গোয়েন্দা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার কুসুম দেওয়ান। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গোয়েন্দা বিভাগের যে টিম অপারেশন চালিয়েছে তাদের বক্তব্য শুনতে দেয়া হয়নি। এমনকি কর্ণফুলী থানা এলাকায় জেএমবির আস্তানা গড়ে উঠা প্রসঙ্গেও ওই থানা পুলিশের বিরুদ্ধে উর্ধতন কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জানা গেছে, ঢাকায় ইতালীয় ও রংপুরে জাপানী নাগরিক হত্যার ঘটনায় পুলিশ বিভাগের উপর ব্যাপক চাপ পড়েছে। পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ ছাড়াও থানা পুলিশের পক্ষ থেকে বিভাগীয় শহরগুলোতে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব আবাসিক এলাকা ও প্রাতিষ্ঠানিক এলাকায় বিদেশীদের অবস্থান রয়েছে ওসকল এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ ছাড়াও আবাসিক হোটেল, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদেশী শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেয় সেসব এলাকায়ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ফলে চট্টগ্রামে গত কয়েকদিন নগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে পাঁচ জঙ্গী সদস্যকে গ্রেফতার এবং অস্ত্র, গ্রেনেড, বিপুল পরিমাণ গুলি, ম্যাগাজিন, গ্রেনেড তৈরির সরঞ্জামাদি, ছুরি, বিপুল পরিমাণ জিহাদী বই, মোবাইল, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল আটক করেছে চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

এ বাপারে গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার বাবুল আকতার জানান, দুই বিদেশী নাগরিক হত্যার ঘটনায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর ফলে ছিনতাইকারী থেকে শুরু কের জঙ্গী পর্যন্ত বেশ কয়েক সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের তথ্য অনুযায়ী ও উদ্ধারকৃত সরঞ্জামের ভিত্তিতে জেএমবির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উদঘাটিত হয়েছে। ফলে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে আরও কিছু তথ্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে।

গোয়েন্দা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নগরীতে পনের দিনের মধ্যে জোড়া খুন ও ট্রিপল খুনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটা ঢিলেঢালা অবস্থানে পৌঁছে যায়। এ দু’টি খুনের ঘটনা উদঘাটন করতে গিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ তাদের নজরদারি বাড়িয়ে দেয়। ফলে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ৫ অক্টোবর সকাল দশটার দিকে মাদারবাড়ি এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় মাহবুবুর রহমান ওরফে খোকন ও মোঃ শাহজাহান ওরফে কাজলকে। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে নগরীর বায়েজিদ থানাধীন অক্সিজেন এলাকার কুয়াইশ সড়কে অভিযান চালিয়ে বিকেল ৩টার দিকে বুলবুল আহমেদ সরকার ওরফে আপেল মেহেদী, মোঃ সুজন ওরফে বাবুকে আটক করা হয়। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে কর্ণফুলী থানাধীন খোয়াইজ নগর এলাকায় অভিযান চালায় মহানগর গোয়েন্দা বিভাগ।

ওই এলাকায় উদঘাটিত হয় লাল মিয়া কন্ট্রাক্টর সড়কে থাকা হাজী নুর আহমদ টাওয়ারের নিচতলায় এক জঙ্গী আস্তানার। ওই আস্তানা থেকে আটক করা হয় তৌফিকুল ইসলাম ওরফে জাবেদ রানাকে। এই জাবেদই হচ্ছে চট্টগ্রাম অঞ্চলের জেএমবির বর্তমান বিস্ফোরক বিভাগের প্রধান। এ ভবন থেকেই উদ্ধার করা হয় গ্রেনেড, অস্ত্র, গোলাবারুদসহ গ্রেনেড তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম ও একটি পিস্তল, কার্তুজ এবং জেহাদী বই। এ সময় পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে জাবেদ ঝাপিয়ে পড়ে গ্রেনেডের উপর। মূলত জাবেদ ওই সময় একটি গ্রেনেডের পিন খুলে আত্মাহূতি দেয়ার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়। নিষ্ক্রিয় ও তাজা গ্রেনেডসহ উদ্ধারকৃত সরঞ্জাম নিয়ে তাকে মহানগর ডিবি অফিসে নিয়ে আসা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, তারা নিষিদ্ধ ঘোষিত জেএমবি সদস্য। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে জাবেদ চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিস্ফোরক বিভাগের প্রধান। আসামি ফুয়াদ চট্টগ্রাম অঞ্চলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড, আদর্শগত কারণে এবং তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে গত ২৪ সেপ্টেম্বর সদরঘাট থানাধীন শাহ কর্পোরেশনের টাকা ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করে। ছিনতাই কাজে মোট ৮ সদস্য অংশ নেয়। এর মধ্যে ৪ জন দুইটি মোটরসাইকেলে অপারেশন টিম হিসেবে এবং অপর ৪ জন রেসকিউ টিম হিসেবে কাজ করে। ঘটনায় শাহ কর্পোরেশনের ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা ছিনতাইকালে তারা গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায়। গ্রেনেডের আঘাতে জেএমবির সদস্য রবিউল ও রফিক ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করে এবং শাহ কর্পোরেশনের ম্যানেজার সত্য গোপাল চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ঘটনায় আরও অংশ নিয়েছিল ফারদিন, পিয়াস, সজিব, হাবিব, কালাইয়া প্রকাশ মটু ও ফুয়াদ নামের কয়েক জঙ্গী।

এদিকে, গত ৪ সেপ্টেম্বর বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন বাংলাবাজার এলাকায় ল্যাংটা ফকির ও তার খাদেম খুনের ঘটনায় গ্রেফতারকৃত আসামি বাবু জড়িত ছিল বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে। তবে মাজার সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম ইসলাম বিরোধী, ওই সকল ইসলাম ও শরিয়ত বিরোধীদের খুন করলে জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায় এমন বিশ্বাস ছিল বাবুর। ফলে বাবু একাই মাজারে প্রবেশ করে ঘুমন্ত অবস্থায় ল্যাংটা ফকির ও তার খাদেমকে খুন করে এবং গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে পালিয়ে যায়।

গ্রেফতারকৃত জাবেদ জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে স্বীকার করে যে, তাদের ব্যবহৃত আরও কিছু গ্রেনেড বায়েজিদ থানাধীন কুয়াইশ এলাকায় রয়েছে। তার তথ্যানুযায়ী ওই এলাকায় গোয়েন্দা টিম ওইসব গ্রেনেড উদ্ধারে গেলে জাবেদের সহযোগীরা পুলিশকে উদ্দেশ্য করে গ্রেনেড ছুড়ে মারে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে থাকা জাবেদ গ্রেনেড বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হয়। সে সঙ্গে আহত তিন পুলিশ সদস্য। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে চমেক হাসপাতাল থেকে পুলিশ সদস্যরা কর্মস্থলে ফিরে এলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় জাবেদের মৃত্যু হয়।

উল্লেখ্য, গত ৪ সেপ্টেম্বর বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন বাংলাবাজারস্থ মাজারে ল্যাংটা ফকির ও তার খাদেম খুন হন। এরপর গত ২৪ সেপ্টেম্বর সদরঘাট থানাধীন মাঝিরঘাট এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় গ্রেনেড বিস্ফোরণে দুই ছিনতাইকারীসহ একটি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।