২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আইসিসবিরোধী যুদ্ধে ব্যর্থ আমেরিকা!

  • মুসান্না সাজ্জিল

আমেরিকার আইসিসবিরোধী যুদ্ধ লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছে, হারিয়ে ফেলছে গতি। এক প্রাক্তন মার্কিন জেনারেলের ভাষায় এই যুদ্ধ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে। হয় একে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজাতে হবে, নয়ত ব্যর্থ হিসেবে বাদ দিতে হবে।

অথচ গেল বসন্তে মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড প্রধান জেনারেল লয়েড অস্টিন কংগ্রেসে বলেছিলেন, ‘এই যুদ্ধে আমাদের উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হচ্ছে এবং আইসিস লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে।’ আর এখন চলতি শরতে জেনারেলরা পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবার ‘অচলাবস্থা’ শব্দটা ব্যবহার করেছেন। অবসরপ্রাপ্ত মেরিন জেনারেল এন্থনি জিন্নির ভাষায়, পরিস্থিতিটা একেবারেই ‘লেজেগোবরে।’

অবস্থাটা যে অনেকটাই তা-ই তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সিরিয়ায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর সামনে ভাল বিকল্প তেমন কিছু নেই। সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আইসিসসহ বেশকিছু বিদ্রোহী বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছেন। বিদ্রোহী বাহিনীগুলো আবার আধিপত্যের জন্য নিজেদের মধ্যে লড়ছে। কুর্দী বাহিনী মার্কিন সাহায্য সহায়তায় আইসিসের বিরুদ্ধে লড়ছে। আবার অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো মিত্র তুরস্ক লড়ছে কুর্দীদের বিরুদ্ধে। ওদিকে চার বছর স্থায়ী এই গৃহযুদ্ধের সুযোগে বাশারের দীর্ঘদিনের মিত্র ইরান ও রাশিয়া সিরিয়ার ভিতরে তাদের প্রভাব প্রসারিত করার সুযোগ পেয়েছে। অপরদিকে সিরিয়ার এই চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বৃহত্তম উদ্বাস্তু সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে।

একথা বুঝতে বেগ পাওয়ার কথা নয়, কেন প্রেসিডেন্ট ওবামা ভেঙে পড়া রাষ্ট্র সিরিয়ায় কখনই জড়াতে চাননি। সেই ২০১২ সালেই সিরিয়ার বিদ্রোহীদের অস্ত্রসজ্জিত করার জন্য তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিও প্যানেটা ও সিআইএ প্রধান সাবেক জেনারেল পেট্রাইউস জোর তাগিদ দিয়েছিলেন। ওবামা তাদের কথায় কর্ণপাত করেননি। কিন্তু ২০১৪ সালে আইসিস ইরাকে চলে গেলে এবং পশ্চিমাদের শিরñেদ করতে শুরু করলে ওবামা সেই প্রস্তাবে সাড়া না দিয়ে পারেননি। তবে ইরাক যুদ্ধের কথা মনে রেখে ওবামা আইসিসের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করার জন্য ওই অঞ্চলে মার্কিন স্থল সেনা পাঠানোর বিষয়টি নাকচ করে দেন। অবশ্য একই সঙ্গে তিনি এর বিকল্প হিসেবে আইসিসের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালানোর নির্দেশ দেন এবং এই শক্তিটির বিরুদ্ধে লড়াই করতে সিরিয়ার মডারেট বিদ্রোহীদের অস্ত্রসজ্জিত ও প্রশিক্ষিত করার জন্য পেন্টাগনকে ৫০ কোটি ডলারের এক কার্যক্রম চালু করতে বলেন। ধারণা করা হয়েছিল এই বিদ্রোহীরাই মার্কিন স্থল সেনার ভূমিকা পালন করবে।

আমেরিকার লক্ষ্য ছিল ২০১৫ সালে ৩ হাজার মডারেট বিদ্রোহীকে প্রশিক্ষিত ও অস্ত্রসজ্জিত করা এবং ২০১৬ সালে সেই সংখ্যাকে ৫৪০০তে উন্নীত করা। কিন্তু ২০১২ সালেই মডারেট বিদ্রোহীদের সংখ্যা কমে আসতে শুরু করেছিল। ২০১৫ সালের বসন্ত নাগাদ এমন বিদ্রোহীকে খুঁজে পাওয়া দস্তুরমতো কঠিন হয়ে পড়েছিল। এ অবস্থায় আমেরিকা যখন চাইল যে, মডারেট বিদ্রোহীদের শুধুমাত্র আইসিসের বিরুদ্ধেই লড়তে হবেÑ বাশারের বিরুদ্ধে নয়, তখন এমন বাহিনী গড়ে তোলার ব্যাপারে সাফল্যের সম্ভাবনা আরও কমে এল। কারণ মডারেট বিদ্রোহীদের যতজন যা পাওয়া যেত আমেরিকার ওই শর্তের কারণে তাদের ৯০ শতাংশই সটকে পড়ে।

যাই হোক, ৯০ জন মডারেট বিদ্রোহীর প্রথম গ্রুপটির ট্রেনিং গত মে মাসে শুরু হয়। বেশিরভাগ ট্রেনিং দেয়া হয় তুরস্ক, জর্দান, কাতার ও সৌদি আরবে। তাদের মার্কিন এম-১৬ রাইফেল ব্যবহার শেখানো হয়। জোগানো হয় মার্কিন গুলি। যোগাযোগের জন্য দেয়া হয় আমেরিকান রেডিও। তারপর জুলাই মাসে ৭০ জনের একটি দলকে পাঠানো হয় সিরিয়ায়। এরা পর্যাপ্ত মাত্রায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বলে দাবি করা হলেও, যে ধরনের মিশনে তাদের পাঠানো হয়েছিল তার জন্য তারা মোটেও উপযুক্ত ছিল না। সিরিয়ার উত্তর পশ্চিমের মারিয়ামিন শহরে তৎপরতা চালানোর সময় আইসিস সম্পর্কে কোন খবর সংগ্রহ করতে পারার আগেই এরা আল-কায়েদার দলছুট অংশ নুসরা ফ্রন্টের হাতে আক্রান্ত হয়। কিছু নিহত হয়। বাকিরা পালিয়ে যায়। এই প্রথম গ্রুপটির যেসব সদস্য সিরিয়ায় থেকে এখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের সংখ্যা মাত্র ৯ জন। এই হলো যুক্তরাষ্ট্রের আইসিসবিরোধী যুদ্ধ উদ্যোগের প্রকৃত চিত্র।

বলা হচ্ছে যে, আরও ১২০ জন মডারেট বিদ্রোহী ট্রেনিং নেয়ার পথে আছে। আমেরিকার লক্ষ্য হলো ২০১৮ সালের মধ্যে ১৫ হাজার বিদ্রোহীকে ট্রেনিং দেয়া। সেই লক্ষ্য যদি অর্জিত হয়, তারপরেও আইসিস মোকাবিলায় ওই সংখ্যাটা হবে খুবই কম এবং সময়টাও হবে অনেক বেশি। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার হিসাব অনুযায়ী এ মুহূর্তে আইসিসের যোদ্ধার সংখ্যা ৩০ হাজার। সংস্থার কোন যোদ্ধা নিহত হলে মুহূর্তের মধ্যে সেই শূন্যস্থান পূরণ করার মতো সক্ষমতা তাদের রয়েছে। আগামী ৩ বছরে আইসিসের যোদ্ধার সংখ্যা নিঃসন্দেহে অনেক বাড়বে। সে তুলনায় আমেরিকা সিরীয় বিদ্রোহীদের মধ্য থেকে প্রশিক্ষিত যোদ্ধা গড়ে তোলার টার্গেট মোটেও পূরণ করতে পারবে না। সুতরাং আইসিসবিরোধী যুদ্ধে আমেরিকার আয়োজনের চিত্রটা বড়ই বেহাল। এমন নাজুক অবস্থা থেকে পেন্টাগন নিজেকে বের করে আনার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।

সূত্র : টাইম

নির্বাচিত সংবাদ