২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইন্দোনেশিয়ার সেই নারকীয় গণহত্যা

  • অনুবাদ : এনামুল হক

ইন্দোনেশিয়ায় গণহত্যা শুরুর ৫০তম বার্ষিকী অতিক্রান্ত হলো। সে সময় আমেরিকার সমর্থনপুষ্ট ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনী ও তাদের অসামরিক ঘাতক স্কোয়াডগুলো ৫ লাখেরও বেশি লোককে হত্যা করেছিল। কমপক্ষে আরও সাড়ে ৭ লাখ লোকের ওপর নির্যাতন চালিয়ে বন্দীশিবিরে পাঠানো হয়। অনেকে কয়েক দশক ধরে ধুঁকেছিল বন্দীশিবিরে।

নিহত ও নিগৃহীত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ওরা ‘কমিউনিস্ট’। এই কমিউনিস্ট ছত্রছায়ার মধ্যে আইনানুগভাবে নিবন্ধিত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরাই শুধু যে ছিল তা নয়, উপরন্তু ট্রেড ইউনিয়ন সদস্য ও নারী অধিকার কর্মী থেকে শুরু করে শিক্ষক ও চীনা জাতিসত্তা পর্যন্ত সুহার্তোর নয়া শাসকগোষ্ঠীর সম্ভাব্য সকল বিরোধীকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। জার্মানি, রুয়ান্ডা কিংবা কম্বোডিয়ার বেলায় যা হয়েছিল, এখানে তা হয়নি। গণহত্যার কোন বিচার হয়নি, কোন সত্য ও সমঝোতা কমিশন গঠিত হয়নি, নিহতদের স্মৃতিরক্ষার কোন ব্যবস্থাও হয়নি।

বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম জনবহুল দেশ ইন্দোনেশিয়া। দেশটি নিজেকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে দাবি করে। তবে প্রকৃতই গণতান্ত্রিক দেশ হতে হলে এই হত্যাযঞ্জের দায়মুক্তির অবশ্যই অবসান ঘটতে হবে। গণহত্যার এই পঞ্চাশতম বার্ষিকী যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটা সুযোগ হিসেবে উপস্থিত হয়েছে, যেখানে দেশটি ১৯৬৫ সালের গণহত্যার ঘটনাটিকে স্বীকার করে নিয়ে সত্য, সমঝোতা ও ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করে ইন্দোনেশিয়ার গণতান্ত্রিক উত্তরণে সমর্থন জোগাতে পারে।

১৯৬৫ সালের ১ অক্টোবর জাকার্তায় সেনাবাহিনীর ৬ জন জেনারেল একদল বিক্ষুব্ধ জুনিয়র অফিসারের হাতে নিহত হন। মেজর জেনারেল সুহার্তো সশস্ত্রবাহিনীর কমান্ড গ্রহণ করে এই হত্যাকা-ের দায় বমপন্থীদের ওপর চাপিয়ে দেন এবং ব্যাপক হত্যাযঞ্জের সূত্রপাত ঘটান। বামধারার সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুক্ত লাখ লাখ লোককে টার্গেট করা হয় এবং দেশটি এক ভয়াবহ সন্ত্রাসের অমানিশায় তলিয়ে যায়। মাছেরা নদীতে নিক্ষিপ্ত লাশগুলো কুরে কুরে খেয়েছে, এই ভীতি থেকে লোকজন মাছ খাওয়াও বন্ধ করে দেয়। সুহার্তো প্রেসিডেন্ট সুকর্নোর কর্তৃত্বকে জবরদখল করে ১৯৬৬ সালের মার্চ মাসের মধ্যে নিজেকে দেশের প্রেসিডেন্ট কার্যত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। শুরু থেকেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন লাভ করেছিলেন।

গণহত্যার এই ভয়াবহ ইতিহাসের তথ্যানুসন্ধানের পেছনে আমি ১২টি বছর সময় ব্যয় করে দুটো প্রামাণ্য ছায়াছবি নির্মাণ করেছি। একটি হলো ‘দি এ্যাক্ট অব কিলিং’, মুক্তি পেয়েছিল ২০১৩ সালে। অন্যটি এ বছরের প্রথমদিকে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দি লুক অব সাইলেন্স’। আমি শুরু করেছিলাম ২০০৩ সালে। গণহত্যার হাত থেকে বেঁচে যাওয়া একটি পরিবারের সঙ্গে কাজ করেছিলাম। আমরা দেখাতে চেয়েছিলাম যে, আপনার প্রিয়জনদের হত্যাকারী ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে বাস করতে কেমন লাগে।

পরিবারটি প্রাণে বেঁচে যাওয়া অন্যান্য লোকদেরও জড়ো করেছিল, যাতে করে তারা তাদের কাহিনী প্রকাশ করে। কিন্তু সেনাবাহিনীর তরফ থেকে তাদের এ ধরনের কোন কর্মকা-ে অংশ না নেয়ার জন্য সাবধান করে দেয়া হয়েছিল। প্রাণে বেঁচে যাওয়াদের অনেকে আমাকে হাল ছেড়ে না দিতে অনুরোধ জানায় এবং খুনীদের নিয়ে এমন ছায়াছবি বানানোর পরামর্শ দেয়, যার মাধ্যমে তারা এই হত্যাযজ্ঞের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করবে।

খুনীদের কাছে এমন ধরনের অনুরোধ জানানো নিরাপদ হবে কি না, আমি জানতাম না। কিন্তু যখন জানলাম, দেখলাম ওরা মুখ খুলছে। খোলাখুলি কথা বলছে। তারা সগর্বে সেই নারকীয় হত্যাযঞ্জের বিবরণ দিল। দেয়ার সময় প্রায়ই তাদের মুখে হাসি লেগে ছিল। নিজেদের নাতি-নাতনিদের সামনেও এই বিবরণ দিতে কুণ্ঠিত হয়নি। মনে হলো ইহুদী নিধনযজ্ঞের ৪০ বছর পর জার্মানিতে বিচরণ করে আমি কেবল এটাই দেখতে পেলাম যে, নাৎসীরা এখনো ক্ষমতায় রয়ে গেছে।

আজ এ যুগের রাজবন্দীরা এখনও বৈষম্য ও হুমকির শিকার। প্রাণে বেঁচে যাওয়া বর্ষীয়ান ব্যক্তিদের সমাবেশে নিয়মিতই হামলা চালায় সামরিক বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট গু-ারা। স্কুলের ছেলেমেয়েদের এখনো শেখানো হয় যে, কমিউনিস্ট নিধন ছিল এক বীরত্বপূর্ণ কাজ। বলা হয় যে, আনুগত্যহীনতার জন্য নিহতদের পরিবার পরিজনের ওপর নজরদারি করতে হবে। এই সরকারী ইতিহাসের মাধ্যমে গোটা সমাজের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে কার্যত বৈধতা দেয়া হয়েছে।

এ ধরনের হুমকি-ধমকির উদ্দেশ্য হলো, ভয়ভীতির এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে দুর্নীত ও লুটপাট বিনা বাধায় চলতে পারে। অনিবার্যরূপেই এমন এক পরিস্থিতিতে মানবাধিকার ১৯৬৫ সাল থেকেই লঙ্ঘিত হয়ে চলেছে। তার মধ্যে আছে ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত পূর্ব তিমুরের ওপর দখলদারি, যেখানে চাপিয়ে দেয়া বুভুক্ষুর কারণে জনগোষ্ঠীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে। এছাড়া আজ পশ্চিম পাপুয়ায় যে নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- চলছে, তাও উল্লেখ করার দাবি রাখে।

১৯৯৮ সালে ইন্দোনেশিয়ায় সামরিক শাসনের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটলেও সেনাবাহিনী এখনও আইনের উর্ধেই রয়ে গেছে। কোন জেনারেল যদি গোটা গ্রামের সমস্ত মানুষকে মেরে ফেলার নির্দেশ দেয়, তারপরও বেসামরিক আদালতে তার বিচার হতে পারে না। সেনাবাহিনী নিজে যদি সামরিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে কিংবা পার্লামেন্ট যদি বিশেষ মানবাধিকার আদালত প্রতিষ্ঠা করে, কেবল তখনই তাঁকে ন্যায়বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো যেতে পারে। অথচ এমন কিছু কখনই সুষ্ঠুভাবে ও কার্যকর উপায়ে করা হয়নি।

আইনের অধীন না হওয়ায় এই সামরিক বাহিনীকে ঘিরে আধাসামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি ছায়া রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে। এই ছায়া রাষ্ট্র ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি-ধমকির আশ্রয় নিয়ে জনসাধারণের কণ্ঠ স্তব্ধ করে চলেছে এবং একই সঙ্গে তার ব্যবসায় অংশীদারদের সঙ্গে একত্রে জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

ইন্দোনেশিয়ায় নিয়মিত ব্যবধানে নির্বাচন হতে পারে। কিন্তু আইন যদি সমাজের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের বেলায় প্রয়োজ্য না হয়, তাহলে আইনের শাসন এবং সত্যিকারের গণতন্ত্র বলতে কিছু থাকে না। দেশটা কখনই প্রকৃত গণতান্ত্রিক দেশ হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না হত্যাকারীদের দায়মুক্তির অবসান ঘটানোর পদক্ষেপ গুরুত্ব সহকারে নেয়া হচ্ছে। অপরিহার্যরূপেই এ ক্ষেত্রে উচিত সত্য, সমঝোতা ও ন্যয়বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করা।

এ কাজটা এখনও সম্ভব হতে পারে। ইন্দোনেশিয়ার মিডিয়া গণহত্যার প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা এতদিন এড়িয়ে গেলেও, এখন এই হত্যাযজ্ঞকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলে উল্লেখ করছে। এ ব্যাপারে তৃণমূল পর্যায়ে তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো উল্লেখ করেছেন যে তিনি ১৯৬৫ সালের গণহত্যার ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবেন। অথচ তিনি সত্য কমিশন গঠন করেননি, জাতীয় পর্যায়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেননি এবং এ ব্যাপারে সামরিক বাহিনীর দায়মুক্তি অবসানেরও কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।

তবে সেই গণহত্যায় মার্কিন ভূমিকা কতদূর ব্যাপ্ত ছিল, তা আজও গোপনীয়তার প্রাচীরের আড়ালে রয়ে গেছে। সিআইএর দলিল এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা এ্যাটাশের নথিগুলো ক্লাসিফাইড অবস্থায় রয়েছে। তথ্যের স্বাধীনতা আইনের অধীনে এসব দলিল বা নথি প্রকাশ করার অসংখ্য অনুরোধ বা আহ্বান অগ্রাহ্য করা হয়েছে। নিউ মেক্সিকোর ডেমোক্র্যাট দলীয় সিনেটর টম উদাল শীঘ্রই সিনেটে একটি প্রস্তাব পুনরুত্থাপন করবেন, যা গৃহীত হলে ইন্দোনেশিয়ার সেই নারকীয় ঘটনায় মার্কিন ভূমিকা স্বীকার করে নেয়া হবে, মার্কিন সরকারকে প্রাসঙ্গিক সব দলিল বা নথি অবমুক্ত করতে বলা হবে এবং গণহত্যার ঘটনাটিকে স্বীকার করে একটি সত্য কমিশন গঠন করতে ইন্দোনেশিয়া সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হবে। মার্কিন সরকার গণহত্যার ঘটনাটি প্রকাশ্যে মেনে নিলে, এই ঘৃণ্য অপরাধে নিজের ভূমিকা স্বীকার করলে এবং এই সংক্রান্ত যাবতীয় দলিল বা নথি প্রকাশ করলে, ইন্দোনেশিয়া সরকারও তা করতে উৎসাহিত হবে।